Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১ হিজরী

সুন্দরবনে অগ্নিসংযোগকারীরা কি অপ্রতিরোধ্য?

প্রকাশের সময় : ১ মে, ২০১৬, ১২:০০ এএম

এ.টি.এম. রফিক, খুলনা থেকে : দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল জনগোষ্ঠীকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মায়ের মতো পরম মমতায় আগলে রাখে সুন্দরবন। বিশ্বখ্যাত ম্যানগ্রোভ বনের বিলুপ্তপ্রায় বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব রক্ষায় সুন্দরবনের গুরুত্ব অপরিসীম। নিজের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে সেই সুন্দরবনে যারা অগ্নিসংযোগ করছে তারা সমগ্র প্রাণীকুলের চরম শত্রæ। গত ১৪ বছরের ২২ বার এবং সর্বশেষ চলতি মাসে ৪ বার আগুন দেয়ায় অপ্রতিরোধ্যতার প্রমাণ দিয়েছে তারা। গত ১৩ এপ্রিল ও ১৮ এপ্রিল অগ্নিকাÐকে নাশকতা উল্লেখ করে বন আইনে বাগেরহাটের আদালত ও শরণখোলা থানায় পৃথক দু’টি মামলা করে বনবিভাগ। একটি মামলার প্রধান আসামি শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার ওরফে শাহজাহান শিকারী। মামলা দু’টিতে স্থানীয় ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েক জনকে আসামী করা হয়। বাকিরাও একই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। অবিলম্বে এসব দুষ্কৃতকারীদের স্বমূলে মূলোৎপাটন করতে না পারলে সুন্দরবনের অস্তিত্ব বিলীন হবে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোর মানচিত্র পাল্টে যাবে। তাই বনবিভাগে, লোক দেখানো তদন্ত কমিটি গঠন আর দায়সারাগোচের মামলা নয়; সরকার প্রধানের উচিত সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষায় সরাসরি তদারকি করা।
এক মাসের মধ্যে সুন্দরবনে চতুর্থ দফা আগুন লাগার ঘটনায় বনের চাঁদপাই রেঞ্জে জুড়ে ‘বিশেষ সতর্কতা’ জারি করে বনবিভাগ। গত বৃহস্পতিবার থেকে সুন্দরবনে সব ধরনের পাস (পারমিট) বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মোঃ জহিরউদ্দিন আহমেদ বলেন, বারবার আগুনের ঘটনায় বন বিভাগের পক্ষ থেকে বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল এবং সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকারও সংরক্ষিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ বিশেষ সতর্কতা জারি থাকবে বলেও জানান তিনি।
সূত্রমতে, আগুন প্রতিরোধে ওয়াচ টীমের কার্যক্রম শুরু করেও রোখা যাচ্ছে না সুন্দরবনের অগ্নিকাÐ। গত বুধবার বিকেলে সুন্দরবনের গহীনে ধানসাগর স্টেশনের নাংলী ফরেস্ট ক্যাম্পের টেংলার বিল (তুলাতলা) এলাকায় আবারও অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটেছে। এ নিয়ে গত এক মাসে চারবার এই অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটেছে। বনবিভাগের উদ্যোগে আগুন প্রতিরোধে ৫টি ওয়াচ টীমের কার্যক্রম শুরু করা হয়। এছাড়া গত সোমবার বিকেলে জনপ্রতিনিধি, এনজিও কর্মী, প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহায়তায় গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম শুরু করে বন বিভাগ। কিন্তু এই গণসচেতনতামূলক কার্যক্রমের একদিন পর আবারও অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটে। এরই মধ্যে বনবিভাগ দুই দফায় ১৬ মৎস্য শিকারীকে আসামি করে মামলা করলেও এখনও পর্যন্ত পুলিশ কাউকে আটক করতে পারেনি। এ নিয়ে গত ১৪ বছরে ২২ বার অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় রায়েন্দা ইউপি সদস্য জাকির হোসেন জানান, বুধবার বিকেল ৪টার দিকে সুন্দরবনের টেংলার বিল এলাকা থেকে কুÐলী আকাওে ধোঁয়া বের হতে দেখে বনবিভাগের লোকজনকে খবর দেয়া হয়। খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরা, স্থানীয় বনজীবীরা ও ফায়ার সার্ভিসের একটি টীম ঘটনাস্থলে আগুন নিয়ন্ত্রণের কাজ শুরু করেছে।
চাঁদপাই রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ বেলায়েত হোসেন জানান, চাঁদপাই স্টেশন আওতাধীন আন্দামানিক টহল ফাঁড়ির আওতাধীন টেংড়ার বিল এলাকার বনাঞ্চলে ধোঁয়ার কুÐলী দেখে বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে কাছাকাছি বনবিভাগের অফিসে খবর দেয় স্থানীয় লোকজন। পরে ধানসাগর স্টেশন কর্মকর্তা সুলতান আহম্মেদসহ অন্যান্য বন কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ছয়টার দিকে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। তবে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় আগুন নেভানোর কাজে গতি থাকবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, বনের কত এলাকা জুড়ে আগুন লেগেছে কিংবা ক্ষতির পরিমাণ কত তা, তাৎক্ষণিকভাবে তিনি জানাতে পারেননি।
রায়েন্দা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিলন জানান, বিষয়টি শুনে ওই এলাকার লোকজনকে আগুন নেভাতে বনের মধ্যে যাবার জন্য বলা হয়েছে। অনেকেই ঘটনাস্থলে গেছেন বলে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে জানিয়েছেন।
ডিএফও (পূর্ব) সাইয়েদুর রহমান জানান, নাশকতা হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। যদি এমনটি হয়, তাহলে এবারে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। স¤প্রতি একই এলাকার বনাঞ্চলে পরপর চারবার অগ্নিকাÐের ঘটনার পর কয়েকটি সভা করে এলাকার মানুষকে সজাগ থাকাসহ নাশকতাকারীদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। এছাড়া, বনকর্মীদের নিয়ে পাঁচটি টহল টিম গঠন করে ১০ কি.মি. আগুন প্রবন এলাকায় পাহাড়া দেয়ার ব্যবস্থা করেও রক্ষা করা যাচ্ছে না সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সুন্দরবনের ধানসাগর স্টেশনের নাংলী এলাকার গহীন অরণ্যে চলতি বছরের ২৭ মার্চ সর্বপ্রথম অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটে। এরপর একে একে ৪ বার অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটেছে। এরই মধ্যে পুড়ে গেছে বনের সুন্দরী, শিংরা, নলবোনসহ বিশাল এলাকা।
বনবিভাগ ও স্থানীয়দের দাবি আগুনের ঘটনাটি পরিকল্পিত। স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিক আশ্রয়ে একের পর এক সুন্দরবনে নাশকতা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ১৪ বছরে সুন্দরবনে ২২ বারের আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু প্রথমবারের মত এবারই নাশকতাকারিদের শনাক্ত করে ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে মামলা করেছে বন বিভাগ। এদিকে ১৩ এপ্রিল ও ১৮ এপ্রিল অগ্নিকাÐকে নাশকতা উল্লেখ করে বন আইনে বাগেরহাটের আদালত ও শরণখোলা থানায় পৃথক দু’টি মামলা করে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ। একটি মামলার প্রধান আসামি শরণখোলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি শাহজাহান হাওলাদার ওরফে শাহজাহান শিকারী। মামলা দু’টিতে স্থানীয় ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত কয়েক জনকে আসামী করা হয়। বাকিরাও একই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে। যারা বিভিন্ন সময় বনবিভাগের কর্মকর্তাকে জিম্মি করে এই ধরনের নাশকতা চালিয়ে আসছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সুন্দরবনের তিন দফা অগ্নিকাÐের ঘটনায় সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ধানসাগর স্টেশনের নাংলী টহল ফাঁড়ির ইনচার্জ নাসির উদ্দিন হাওলাদার, বোটম্যান (নৌকা চালক) মোবারক হোসেন ও বোটম্যান (নৌকা চালক) পলাশ মজুমদারকে সাময়িক বরখাস্তও করা হয়েছে। গত ১৪ বছরে সুন্দরবনে ২২ বার এ ধরনের অগ্নিকাÐের ঘটনা ঘটেছে। বনের যে যায়গা গুলোতে একাধিকবার আগুনে পুড়ে সাফ হচ্ছে বর্ষা মৌসুমে সেখান থেকে দেশীয় কৈ, মাগুর, শিংসহ লাখ লাখ টাকার মাছ ধরার অভিযোগ রয়েছে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ