Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

তালিবানের হাতে নিহত হচ্ছে এলিট আফগান সৈন্যরা

পতন ঘটতে চলেছে একটি নিরাপদ জেলার-২

দি নিউইয়র্ক টাইমস | প্রকাশের সময় : ১৫ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

(গত সংখ্যার পর)


তিনি বলেন, তারা সবাই আমাদের প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু এ প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমরা কি করব? আমার পরিবারের বিশজন মারা গেছে। জাঘোরি জেলার গভর্নর জাফর শরিফ বলেন, বুধবার কমান্ডোরা এসে পৌঁছনোর আগে এখানে কোনো সৈন্যরাও ছিল না। এখানে মাত্র ২৫০ জন পুলিশ ও বেসরকারি কিছু মিলিশিয়া গ্রুপ ছিল। প্রায় ১ হাজার তালিবান হামলা হালায়। সরকারি ভবনের আঙিনায় যখন আফগান কমান্ডোদের লাশ সারি দিয়ে রাখা হচ্ছিল তখন উপরতলায় গভর্নর শরিফ কাবুল থেকে প্রেসিডেন্ট গণির পাঠানো প্রতিনিধি দলের সাথে কথা বলছিলেন। কাচে ঢাকা সিঁড়ির উপর থেকে তিনি নিচে সারি দিয়ে শুইয়ে রাখা লাশগুলো দেখতে পাচ্ছিলেন স্পষ্টভাবেই। তার চোখ পানিতে ভরে উঠল, ভেঙে পড়লেন অদম্য কান্নায়।
কাঁদতে কাঁদতেই তিনি বললেন, কাফেররাও এমনটা করত না। এ আরেক কারবালা। ১৫ সদস্যের প্রেসিডেন্সিয়াল প্রতিনিধিদল কাবুলে ফোন করার চেষ্টা চালাতে থাকলেন। বিদ্রোহীরা দুটি কোম্পানির সেলফোন টাওয়ার উড়িয়ে দিয়েছে। তৃতীয় একটি টাওয়ার থেমে থেমে কাজ করছে।
প্রতিনিধিদলের সদস্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কায়েস সারগান্দ অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, জাঘোরি জেলা পর্যাপ্ত সম্পদ পায়নি বলে যা বলা হচ্ছে তা রাজনৈতিক কারণের জন্য অতিশয়োক্তি। তিনি বলেন, স্থানীয় নেতাদের ইচ্ছা যে সরকার হাজার হাজার মিলিশিয়াকে অস্ত্রসজ্জিত করুক। এটা করলে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের আধীনে নিয়মিত সেনাবাহিনি পাওয়ার চেষ্টা ব্যাহত হবে। সারগান্দ বলেন, আমরা যদি এখানে এটা করি তাহলে তারা বাদগিস, কান্দাহার, নানগারহার ও সারাদেশেই এরূপ করতে চাইবে।
সারগান্দ মৃত কমান্ডোদের কথা মনে করে আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, আমি যখন তাদের লাশগুলো দেখি তখন তাদের মুখগুলো মনে পড়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের প্রত্যেকের সাথে আমার সাক্ষাত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের স্থানীয় রাজনীতিকরা বলেন, কমান্ডোরা লড়াই করতে পারে না। আমাদের কমান্ডোরা বলে, তারা তালিবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় মিলিশিয়াদের কাছ থেকে কোনো সাহায্য পায় না।
সাগান্দ বলেন, কমান্ডোদের প্রেরণ যে কত বড় ত্যাগ তা স্থানীয় কর্মকর্তারা স্বীকার করে না। শুধু হটকোলেই কমপক্ষে ৩০ জন কমান্ডো নিহত হয়েছে। আফগান সেনাবাহিনির এই সেরা যোদ্ধাদের সংখ্যা মাত্র ২০ হাজার। তারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এ বছর গজনির আজরিস্তান জেলায় জেলা সদর দফতর রক্ষার জন্য প্রেরিত কমান্ডোদের একটা পুরো কোম্পানি নির্মূল হয়ে গিয়েছে।
সাং-এ-মাশার সর্বত্র লোকজন কাবুল থেকে আসা সামরিক হেলিকপ্টারের জন্য অপেক্ষা করছিল। দুটি হাসপাতাল থেকে গুরুতর আহত সৈন্যদের জরুরি অপসারণ করা প্রয়োজন।
শুহাদা হাসপাতালে গুলিতে আহত আজিজি রহমান নামে এক কমান্ডোর অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণের জন্য রক্ত দেয়া হচ্ছিল। হাসপাতালের ডা. রমজান হাশিমি জানান, তাকে কাবুলে নেয়া দরকার। আমরা অপারেশন করতে পারি, কিন্তু তা হবে বিপজ্জনক।
কয়েক ঘন্টা পর ডা. হাশিমি অপারেশন করে কমান্ডোর প্লীহা ও কিডনি অপসারণ করছিলেন। হেলিকপ্টার আসেনি। মোহাম্মদ বাশি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তার পরিবারের জীবিত ৩২ জন সদস্যের সবাইকে উদ্ধার করার জন্য তিনি একটি হেলিকপ্টার পাঠাচ্ছেন। কারণ, তালিবান জেলা দখল করলে পরিবারের সদস্যরা সবার জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে।
এক সাথে দু বা তিনটি করে লাশ যখন আসছিল সে সময় প্রেসিডেন্সিয়াল প্রতিনিধিদদলের কর্মকর্তারা সতর্ক করে দেন যে যাতে আতঙ্ক সৃষ্টি না হয় সে জন্য লাশগুলো সবার দৃষ্টির আড়ালে রাখতে হবে। প্রতিনিধিদলের প্রধান, আফগান প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আসাদুল্লাহ ফালাহ একটি সাক্ষাতকার দেয়ার জন্য সভা ত্যাগ করেন। সেখানে তিনি সঙ্কটকে খাটো করে দেখান। তিনি বলেন, আমাদের কিছু প্রাণহানি হয়েছে, তবে তাদের সংখ্যা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
কক্ষের জানালার বাইরে আঙিনায় শায়িত ২০ জন কমান্ডোর লাশের ব্যাপারে তিনি বলেন, বহু পুলিশ অফিসার ও মিলিশিয়াও নিহত হয়েছেন। তারা কাঁধে সবাই উর্দি পরিহিত ও কাঁধে কমান্ডোর পরিচিতি চিহ্ন বহন করছিল।
ফালা হেলিকপ্টার সংক্রান্ত একটি ফোন কলের জবাব দেন। ৪টি হেলিকপ্টার আসছে। সুতরাং তার ১৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলকে নিয়ে কাবুল ফিরতে পারবেন। তিনি ফোনকারীকে বললেন, হেলিকপ্টারগুলোর একটিকে জেলা গভর্নরের কম্পাউন্ডে অবতরণ করতে বল যাতে মানুষজন তাদের লাশ দেখতে না পায়। এ লাশ দেখলে জনগণ মনোবল হারিয়ে ফেলতে পারে। এসময় নিউইয়র্ক টাইমসের সংবাদদাতা সেখানে ছিলেন।
কমান্ডার হোসেন আধা ডজন যোদ্ধাকে নিয়ে একটি গাড়িতে উঠে চলে যান। তিনি বলেন,যদি হটকলের পতন হয় তাহলে গোটা জাঘোরির পতন হবে।
রোববার রাতে খবর পাওয়া যায় যে হটকল এখন প্রতিরোধহীন । তালিবানরা সাং-এ-মাশা থেকে মাত্র এক ঘন্টার দূরত্বে আছে বলে গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর সেখান থেকে ও পাশ্বর্বর্তী আরেকটি শহর থেকে লোকজন পালিয়ে যাচ্ছে। গভর্নর শরিফও পালিয়েছেন। আমরাও পাহাড়ি পথ ধরে পালাই যা অন্ধকারে দেখা যাচ্ছিল না বললেই চলে। গোটা পথেই ছিল একমুখী জনস্রোত। অধিবাসীরা সবাই গাড়ি বা ট্রাকে করে আফগানিস্তানের সর্বশেষ বিপর্যয় থেকে পালাচ্ছিল। (সমাপ্ত)
*প্রতিবেদক রেড নরডল্যান্ড নিউইয়র্ক টাইমসে কর্মরত।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর