Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৫ পৌষ ১৪২৫, ১১ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন স্থগিত

মিয়ানমারের পরিস্থিতি অনুকূল নয়: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

কূটনৈতিক সংবাদদাতা | প্রকাশের সময় : ১৭ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০৬ এএম

মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইনে ফিরে না যাওয়ার দাবিতে কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে বিক্ষোভ করেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের এই বিক্ষোভের পর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তাসংস্থা রয়টার্স বলছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়েছে।
গত অক্টোবরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী, প্রথম দফায় দুই হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে রাখাইনে প্রত্যাবাসন শুরুর কথা ছিল গতকাল বৃহস্পতিবার। কিন্তু তখন থেকেই এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার শুরু হওয়া নিয়ে ব্যাপক সন্দেহ দেখা দেয়।
জাতিসংঘের পাশাপাশি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিরোধীতা করে বলছে, সেখানে রোহিঙ্গাদের জন্য এখনো নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা হয়নি। বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি রাখাইনে ব্যাপক সহিংসতার শিকার রোহিঙ্গারাও মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার বিরোধীতা করে আসছে।
এদিকে, ঢাকার মার্কিন দূতাবাস গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা, শরণার্থী ও অভিবাসন (পিআরএম) বিষয়ক উপ সহকারী মন্ত্রী রিচার্ড অলব্রাইট গত ১০ থেকে ১৫ নভেম্বর বাংলাদেশ সফর করেন। রিচার্ড অলব্রাইট ১১ থেকে ১৩ নভেম্বর কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির ও স্থানীয় কমিউনিটি পরিদর্শন করেন। বিদ্যমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং স্থানীয় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলাই ছিল তার এ সফরের লক্ষ্য। কক্সবাজার সফরের সময় উপ সহকারী মন্ত্রী অলব্রাইট কুনাপাড়া বর্ডার ক্রসিং, ইউএনএইচসিআর ট্রানজিট সেন্টারসহ কয়েকটি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির এবং চিকিৎসাসেবা, খাদ্য বিতরণ ও পুষ্টিসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া কয়েকটি কেন্দ্র ঘুরে দেখেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ডব্লিউএফপি, ইউনিসেফ, রেডক্রস এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থাসহ (আইওএম) যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সহযোগী সংস্থা এগুলো বাস্তবায়ন করেছে। মন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন ইউএসএআইডি মিশন পরিচালক ডেরিক ব্রাউন। যুক্তরাষ্ট্রের মানবিক সহায়তা কর্মসূচি দেখাশোনা এবং সরকার, জাতিসংঘ এবং এনজিওগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে সাক্ষাত করতে পিআরএম এর কর্মকর্তারা যে নিয়মিত সফর করেন, রিচার্ড অলব্রাইটের সফরটি ছিল তারই অংশ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১৭ সালের আগস্ট মাসে চলমান সংকট শুরু হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয় দেওয়া স্থানীয় বাংলাদেশিদের সহায়তা করতে ৩৪ কোটি ৫০ লাখ ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। এ ছাড়াও জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান ২০১৮-তে এ পর্যন্ত জমা পড়া মোট অর্থের ৪০ শতাংশ অনুদান যুক্তরাষ্ট্র দিয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের উদারতার প্রশংসা করে যুক্তরাষ্ট্র। দুর্গত রোহিঙ্গাদের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ যে অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র তারও প্রশংসা করে।
এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ১৫ নভেম্বর থেকে হাজার দুয়েক রোহিঙ্গা শরণার্থীর প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ পরিকল্পনার ওপর ঘনিষ্ঠভাবে নজর রাখছে। আমরা ইউএনএইচসিআর এর এ মূল্যায়নের সঙ্গে একমত যে, মিয়ানমারের পরিস্থিতি এখনো শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তনের জন্য পুরো অনুকূল নয়। মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিস্থিতি ভালোভাবে বোঝা এবং শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত লোকদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য দেশটিতে অবাধ প্রবেশাধিকার প্রয়োজন। বুঝে শুনে, নিরাপদে, স্বেচ্ছায় এবং মর্যাদাপূর্ণভাবে প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের অব্যাহত অঙ্গীকার এবং ইউএনএইচসিআর কে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে রাখাকে আমরা স্বাগত জানাই।
মিয়ানমার সীমান্তের কাছে কক্সবাজারের উঁচিপ্রাং শরণার্থী শিবিরে গতকাল বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ করেছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা। এসময় 'না, না, আমরা ফেরত যাবো না' বলে স্লোগান দিতেও দেখা যায় তাদের। অনেকের হাতে প্ল্যাকার্ডে দেখা যায়, আমরা ন্যায়বিচার চাই, নাগরিত্ব ছাড়া আমরা কখনোই মিয়ানমারে ফিরে যাবো না।
গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের উত্তরাঞ্চলের রাখাইনে দেশটির রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। রক্তাক্ত ওই অভিযানের মুখে প্রায় সাত লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা প্রতিবেশি বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা সেখানে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নৃশংস অভিযানের অভিযোগ করেছেন।
তবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে বলে দাবি করে আসছে। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আনা সব ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। #

রোহিঙ্গাদের জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী বলেছেন, কোনো একজন রোহিঙ্গাকে জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। সেখানে যারা যাবেন, তারা স্বেচ্ছায় যাবেন। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
রোহিঙ্গা পরিস্থিতি ও জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়ে ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ব্রিফিংয়ে ঢাকার কূটনৈতিক মিশনগুলোর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
ব্রিফিং শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, কোনো রোহিঙ্গাকেই জোর করে ফেরত পাঠানো হবে না। কেউ কেউ বলতে চাইছেন, আমরা জোর করে ফেরত পাঠাতে চাইছি। এটা মোটেও ঠিক নয়। তিনি বলেন, আমরা জোর করে ফেরত পাঠাতে চাইলে তাদের আশ্রয়ই তো দিতাম না। তবে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। মানবতা দেখিয়েছি। তাই জোর করে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নই ওঠে না।
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, রোহিঙ্গা কমিউনিটির নেতা যাদের মাঝি বলা হয়, তারা রাখাইনে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে আসবে। ব্রিফিংকালে এ বিষয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন কূটনীতিকরা। আমরা তাদের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছি। তারা গিয়ে দেখুক পরিস্থিতি কেমন। তারপর ফিরে এসে সিদ্ধান্ত নিক। এটি একটি ভালো প্রস্তাব।
মাহমুদ আলী বলেন, কূটনীতিকদের জাতীয় নির্বাচনের বিষয়েও অবহিত করা হয়েছে। নির্বাচন পেছানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেসব বিষয়ে তাদের জানানো হয়েছে।
ব্রিফিং থেকে বেরিয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার হর্ষ বর্ধন শ্রিংলা বলেন, রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও রোহিঙ্গা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা চাইছি রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ