Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ৭ আশ্বিন ১৪২৫, ১১ মুহাররাম ১৪৪০ হিজরী‌

অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করুন

প্রকাশের সময় : ২৭ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

সৈয়দ মোহাম্মদ ইব্রাহীম রওনক : নুনের মতো খুন সস্তা হয়ে ওঠা আইনশৃঙ্খলার জন্য যেমন বিসংবাদ সৃষ্টি করে তেমনি জননিরাপত্তার জন্যও তা হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। নারায়ণগঞ্জে দুই শিশু এবং নারীসহ একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা শীতলক্ষ্যা পাড়ের এই জনপদে মানুষের জীবনের নিরাপত্তা বলে আদৌ কিছু আছে কিনা সে প্রশ্নটি নতুনভাবে উঠে এসেছে। মহানগরীর বাবুরাইলের একটি বাসগৃহ থেকে গত ১৬ জানুয়ারি শনিবার রাতে উদ্ধার করা হয়েছে এক পরিবারের পাঁচ সদস্যের লাশ। পুলিশ বলেছে, বিকেলের কোনো এক সময় হতভাগ্যরা হত্যাকা-ের শিকার হয়েছে। নৃশংসভাবে তাদের পিটিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করলেও ধারেকাছের কেউ তা টেরও পায়নি। নিহতদের স্বজনরা মোবাইল ফোনে তাদের সাড়া না পেয়ে বাড়িওয়ালা ও পুলিশকে বিষয়টি জানায় এবং পরে ভাড়াটিয়ারা ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে পাঁচজনের লাশ দেখতে পায়।
নারায়ণগঞ্জে ২১ মাস আগে পৌর কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকা-ের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো কোনো বিপথগামী সদস্য জড়িত বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়। এ ঘটনা সারা দেশে নারায়ণগঞ্জের ভাবমূর্তিতে যে ভয়াল ছাপ রাখে তা জনমনে এখনো স্পষ্ট। ওই ঘটনার জের না কাটতেই গত বছরের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জের পুরিন্দা বাজারে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হয় আটজন। সর্বশেষ একই পরিবারের পাঁচজনকে জবাই করে হত্যার ঘটনা জননিরাপত্তার সংকটকে প্রকট করে তুলেছে।
নারায়ণগঞ্জে একই পরিবারের পাঁচ সদস্য হত্যার সঙ্গে জড়িত অপরাধী তার অপরাধ স্বীকার করেছে বলে জানা গেছে। তার উপযুক্ত শাস্তির মাধ্যমে সমাজে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। নুনের মতো খুনও সস্তা হয়ে ওঠার অকাম্য পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে অপরাধীর প্রাপ্য শাস্তি নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর কর্তব্য।
কেন এমন হচ্ছে? সমাজের মনস্তত্ত্ব, ব্যক্তি মানুষের চিন্তাভাবনা কেন সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যাচ্ছে? এই অধঃপতনের গতি কি কোনোভাবেই রোধ করা সম্ভব নয়?
কোনো সমাজ বা দেশে যখন নৈতিকতা, মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখনই সেখানে বেআইনি কর্মকা- ও হত্যা-খুন-ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধগুলো বেড়ে যায়। ধারণা করা যায়, একই কারণে বাংলাদেশেও একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। খুনের প্রায় প্রতিটি ঘটনায়ই মামলা হয়। সাধারণত দেখা যায়, সঠিক তদন্তের অভাবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা আড়ালে থেকে যায়। তারপর বছরের পর বছর ধরে চলে মামলা। প্রমাণ, সাক্ষী-সাবুদের অভাবে সেখানেও অনেক অপরাধী পার পেয়ে যায়। ফলে অপরাধীরা নতুন করে অপরাধ সংঘটনে উৎসাহিত হয়। আর এভাবেই সমাজ ক্রমে এক নারকীয় অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হলে যেকোনো মূল্যেই হোক আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে পৈশাচিক নির্যাতনের মাধ্যমে শিশুহত্যার ঘটনা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। সে ক্ষেত্রে আমাদের বিচার বিভাগ দুটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আর তা হলো, সিলেটের শিশু রাজন হত্যা ও খুলনার শিশু রাকিব হত্যার বিচারকাজ দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন করা হয়েছে। অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির রায় হয়েছে; যদিও এ ব্যাপারে কোনো গবেষণালব্ধ পরিসংখ্যান নেই। তবু সাধারণভাবে বলা যায়, এর ফলও পাওয়া গেছে। এর পর থেকে পৈশাচিক নির্যাতনের মাধ্যমে শিশুহত্যার ঘটনা ঘটেনি বললেই চলে। অপরাধবিজ্ঞানী, এমনকি সমাজের সচেতন মানুষেরও বিশ্বাস, চাঞ্চল্যকর হত্যাকা-গুলোতে এমন দ্রুত বিচারের নজির স্থাপন করা গেলে এসব ঘটনা দ্রুত কমে আসবে। একই সঙ্গে জরুরি, তদন্তে গাফিলতির জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির স্থাপন করা।
পতন খুব দ্রুত হয় এবং খুব সহজেই ঘটে যায়; কিন্তু সেখান থেকে উঠে আসার কাজটি তত সহজ হয় না। আমাদের সমাজে মূল্যবোধ ও নৈতিকতার যে পতন ঘটছে, তা রোধ করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে পতন যত গভীর হবে সেখান থেকে উঠে আসা ততটাই অসাধ্য হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে রাষ্ট্রের কর্ণধার ও নীতিনির্ধারকদের দ্রুত এগিয়ে আসা প্রয়োজন। আমরা চাই, নারায়ণগঞ্জের পাঁচ খুনের ঘটনায়ও সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে আরো একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হোক। অপরাধীদের কাছে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের একটি কঠোর বার্তা পৌঁছে দেয়া হোক।
ষ লেখক : কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।