Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৩ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী
শিরোনাম

পিতৃশোক ও দীর্ঘশ্বাসের গল্প

গল্প

বাসার তাসাউফ | প্রকাশের সময় : ৩০ নভেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

বিকেল। সূর্যের আলোর তেমন তেজ নেই। নিভে গেছে কমলা রঙের রোদগুলো। এখন পশ্চিম দিগন্তের বিশাল ক্যানভাসজুড়ে রক্তাভ এক ছবি ফুটে আছে। চারপাশে র্ঝিঝির্ েমৃদু বাতাস বইছে। মাথার ওপর দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি ওড়ে যাচ্ছে যার যার নীড়ে। মেহগনিগাছের মগডালে বসে কর্কশ স্বরে ডাকছে একটি দাড় কাক। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি সেদিকে তাকিয়ে আছি। বুক আমার বিদীর্ণ, চোখ আমার বিশীর্ণ। মরমে শূন্যতার হাহাকার। কিছুক্ষণ আগে আমি আমার আব্বার কবর জিয়ারত করে এসেছি। এখন কেবল আব্বার কথা মনে পড়ছে, থেকে থেকে মনে পড়ছে, বার বার মনে পড়ছে। আর আব্বার কথা মনে পড়তেই আমার বুকের ব্যথাটা- যা আব্বার মৃত্যুর পর থেকেই মৃদু মৃদু অনুভূত হচ্ছিল, সেটা এখন অসহনীয় পর্যায়ে উপনিত হয়েছে।
আমার আব্বার দুই চোখ ছিল দিঘির মতো, শিশুর সারল্যমাখা ছিল মুখ আর পদ্ম ফুলের পরাগশোভিত ছিল মুখের হাসি। এই হাসির কারণেই তিনি পাঁচ-দশ গ্রামজুড়ে প্রায় সকলেরই প্রিয়ভাজন ছিলেন। শুধু প্রিয়ভাজন বললে এখন তার প্রতি অসম্মান দেখানো হয়। প্রিয় ব্যক্তিত্ব বা প্রিয়মুখ শব্দ দু’টি যোগ করলেও যথাযথ হয়ে ওঠে না। সেদিন আমাদের মাদরাসা মাঠে আব্বার জানাজায় হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি আমাকে বার বার একটি কথা মনে করিয়ে দিয়েছে, আব্বা বেঁচে থাকতে মানুষের কত প্রিয় ছিলেন!
মোটা সুতার লুঙ্গি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি সমেত সাদা রুমাল, চোখে শুরমার প্রলেপ, মাথায় গোল টুপি আর স্পঞ্জের সাধারণ জুতো পায়ে আব্বা যখন হাঁটতেন এমনভাবে মাটিতে পা ফেলতেন যেন পায়ের আঘাতে মাটি ব্যথা না পায়। শুধু মাটি নয়, কোনো মানুষকেও জীবনে কখনও আঘাত দেননি। তার আচরণে কখনও কেউ আঘাত পেয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ নিজেই ভীষণ কঠিন এক আঘাত পেয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন। একজন সুস্থ-সবল মানুষ বেরিয়ে গেলেন বাসা থেকে। আমার ছোট মামার ছেলের সুন্নাতে খৎনা অনুষ্ঠানে নেমন্তন্ন ছিল। আব্বা সেখানেই যাচ্ছিলেন। সাথে ছিলেন আম্মাও। তারা বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার দশ মিনিটি পর খবর পাই নানাবাড়ির কাছাকাছি কাঁচা রাস্তাটি পার হতে গিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি মাইক্রোবাসের ধাক্কায় আব্বা মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। আমি দ্রæত ছুটে যাই সেখানে। গিয়ে দেখি আব্বার পা দুটো ভেঙ্গে গেছে, মাথা থেতলে আছে, রক্তে লাল হয়ে আছে পুরো দেহ। তাড়াহুড়ো করে এ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকার পথে ছুটে চলি। তিন ঘণ্টা পর পঙ্গু হাসপাতালে পৌঁছাই। মাথায় আঘাত থাকার কারণে জরুরী বিভাগের চিকিৎসক আব্বার মাথায় সিটি স্ক্যান করতে পাঠায় সায়েন্স নিয়োরলোজিতে। সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল হলেজ হয়ে আবার পঙ্গু হাসপাতালে ফিরে আসি। পঙ্গু হাসাপাতলে এসে জরুরী অপারশেনের ব্যবস্থা হয়। কিন্তু প্রচুর রক্তক্ষরণের কারণে আব্বার দেহ রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। তাই অপারশেন করার আগে কয়েক ব্যাগ এ পজেটিভ রক্ত দরকার হয়। আমার এ পজেটিভ রক্ত হওয়ায় আমি এক ব্যাগ রক্ত দিতে পারি। আমার ফুফাত ভাই মহসীনের শরীরেও এ পজেটিভ রক্ত ছিল। সেও এক ব্যাগ রক্ত দেয়। ডাক্তার জানায়, আরও চার ব্যাগ রক্ত লাগবে। কিন্তু এত রাতে রক্ত পাওয়া সম্ভব ছিল না। ব্যডব্যাঙ্ক থেকে কেনা যায়। কিন্তু এসব রক্তে আমার আস্থা ছিল না। আমি ডিজিটাল সুবিধা গ্রহণ করি। রক্ত চেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিই। গভীর রাতে অচেনা কয়েকজন ছেলে এসে স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে যায় বিনে পয়সায়। পরদিন আব্বার পায়ের অপারেশন হয়। কিন্তু বুকের অপারশেন করা যায় না। রক্তশূন্যতা ও বয়স্ক মানুষ হওয়ার কারণে একসঙ্গে দু’টি অপারেশন করা সম্ভব হয় না।
পাঁজরের তিনটি হার ভেঙ্গে যাওয়ায় আব্বার শ্বাস-প্রশ্বাসের কষ্ট হচ্ছিল। এমনিতে তিনি অনেক দিন ধরে শ্বাসসকষ্টে ভোগছিলেন। আব্বার শ্বাস-প্রশ্বাসের অস্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল দেখে পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসক আব্বাকে আবারও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে এসে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি করতে হয়। এখানে কিছুদিন চিকিৎসার পর অর্থপেডিক বিভাগে স্থানান্তর করি। কিন্তু পনের দিনেও আব্বার দেহের কোনো উন্নতি হয় নি। দিনে দিনে অবনতি হচ্ছিল দেখে ডাক্তাররা বোর্ডমিটিং বসে। মিটিং শেষে কর্তব্যরত ডাক্তার আই.সি.ও’তে নেওয়ার পরামর্শ দেয়। কিন্তু আই.সি.ও’তে নিতে আম্মা আপত্তি জানায়। অগত্যা হাসপাতাল থেকে আব্বাকে বাড়ি নিয়ে আসতে হয়। বাড়িতে আসার পর আমাদের গ্রাম ছাড়াও আশপাশের পাঁচ-দশ গ্রাম থেকে কয়েক হাজার মানুষ আব্বাকে দেখতে আসে। আব্বার প্রতি মানুষের কী রকম ভালোবাসা ছিল, শ্রদ্ধা ছিল তখন তা দেখেছিলাম। আব্বাকে এই দুরবস্থা থেকে মুক্তি দিতে সবাই আল্লার কাছে প্রার্থনা করে। কিন্তু আল্লাহ আমার আব্বাকে মুক্তি দেয় নি। নিজের কাছে নিয়ে গেছে...।
সহজ ভাষায় এই কথাগুলো লিখতে পারলেও তখন আব্বার মৃত্যুটা সহজভাবে মেনে নেওয়ার মতো প্রস্তুত ছিলাম না আমি অথবা আমাদের পরিবারের কেউ। আব্বাকে কবরে সমাহিত করে বাসায় আসার পর আমার কেবল মনে হত, আগামীকাল যখন আমি কর্মস্থল থেকে ঘরে ফিরব, তখন সবাইকে দেখব, ঘরে অনেক মানুষ থাকবে। আমার কাকারা, কাকিরা, ভাইবোনেরা, এমনকি আমার আম্মাও থাকবে। থাকবে না শুধু আব্বা। সাধারণত আমি ঘরে ফিরলে আব্বাকে দেখতাম মাগরিব নামায শেষে খাটের ওপর বসে তসবিহ্ জপছেন। আমাকে দেখে বলতেন, ‘বাসার, আইলি?’ ‘হ, আব্বা আমি এসেছি।’
আব্বা একচিলতে হাসতেন। আমিও হেসে নিজের ঘরে চলে যেতাম। সাধারণত আব্বা বাড়ি ছেড়ে কোথাও যেতেন না, কদাচিৎ গেলেও কখনও একটি রাতও বাড়ি ছেড়ে থাকেন নি। আমি কখনও বাড়ির বাইরে গেলে শত টেনশনে অস্থির থাকতেন। আজ কত দিন হল আব্বা বাড়ি ছেড়ে আছেন, বাড়ির পাশেই তো মাটির ছোট্ট একটি ঘরে শুয়ে আছেন; অথচ কত দিন হয়ে গেল তিনি বাড়ি ফিরে আসেন না। আর কখনও বাড়ি ফিরে আসবেনও নাÑ এ কথাটি ভাবতেই চোখের জল আমার মনের বাঁধ ভেঙ্গে বুকের ওপর এসে পড়ে। আমি কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করি অথবা চিৎকার করে করে কাঁদি। তখন কেউ কেউ এসে আমাকে শান্ত¡না দেয়, ‘তুমি বাপের শিক্ষিত ছেলে, তুমি এভাবে ভেঙ্গে পড়লে চলবে? তোমাকে শক্ত হতে হবে, সংসারের হালটা যে এবার তোমাকেই ধরতে হবে।’
কেউ বলে, ‘দেখো তুমি যদি এভাবে ভেঙ্গে পড়ো, পরিবারের কেউ আর দাঁড়িয়ে থাকবে না। তোমার বড়বোন জেসমিন কাঁদতে কাঁদতে অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। তাকে স্যালাইন দেওয়া হয়েছে। তোমার বড়ভাই জহিরুল অজ্ঞান হয়ে আছে। কলসি কলসি পানি ঢেলেও হুশ আসছে না।’
আবার কেউ এসে বলে, ‘তোমার এভাবে কান্না বন্ধ করতে হবে। তোমাকে শক্ত হতে হবে। মনে রেখো, কারও বাবাই চিরদিন বেঁচে থাকে না। তোমাকে আল্লার ওপর ভরসা করতে হবে।’
আল্লার ওপর ভরসা করেই তো আমি বেঁচে আছি। তা না হলে মরে যেতাম, সত্যি মরে যেতাম। হ্যাঁ, কারও বাবাই চিরদিন বেঁচে থাকে না, সেটা আমি জানি। তারা এসে যখন আমাকে কান্না না করতে বলে, ভেঙ্গে না পড়তে বলে এবং মন শক্ত করতে বলে আমার মাথায় হাত বুলায়-তখনই আমার বোধ হয়, আমি এখন এতিম। আমার আব্বা আর এই পৃথিবীতে নেই, আমি আর আব্বার কথা কিংবা হাসির শব্দ শুনতে পাব না। এমনকি আব্বাকে আর কখনও দেখতেও পাব না- এ কথাটি ভেবে কষ্টে আমার বুকের ভেতরে হৃৎপিন্ডটা ফালি ফালি করে কাটা লাল তরমুজের মতো হয়ে যায়।
সন্ধ্যা হচ্ছে এখন। ফুরিয়ে যাওয়া দিন আর সূচিত রাতের এ সময়টাকে বলে গোধূলিকাল। আজ প্রায় সারা দিনই আমি আমার ঘরে ছিলাম। ভোরে ফযর নামায পড়তে মসজিদে আর তারপর আছর নামাযের শেষে জিয়ারত করতে আব্বার কবরের পাশে গিয়েছিলাম, সেই সময়টা বাদে। দিনের আলো কমে গেছে। আমি ঘরে আলো জে¦লে দিয়েছি এবার। বৈদ্যুতিক আলোয় দেখছি একটা টিকটিকি, খুব চঞ্চল পায়ে দৌড়াদৌড়ি করছে দেয়ালের ওপরে। এককোণে একটা মাকড়সা, কী নিপুন এক দক্ষ কারিগরের মতো জাল বুনে চলেছে, তাও দেখছি আর ভাবছি-আমি এখন এতিম।
এতিম শব্দটি উচ্চারণ করার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘ, এত দীর্ঘ যে পৃথিবীর দৈর্ঘ্যকেও ছাড়িয়ে যাবে- একটি শ্বাস-প্রশ্বাসের বেরিয়ে আসে। দীর্ঘ এই শ্বাসটি বেরিয়ে আসার পর আমার বুকের ভেতরটা একটু হাল্কা হয়, তাও সামান্য সময়ের জন্য। মানুষ এজন্যই বুঝি কষ্ট পেলে, দুঃখ পেলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে?



 

Show all comments

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর