Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৩ পৌষ ১৪২৫, ৯ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

অরিত্রির আত্মহত্যা

| প্রকাশের সময় : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম | আপডেট : ১২:২২ এএম, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮

রাজধানীর নামী-দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নুন স্কুলের নবম শ্রেনীর শিক্ষার্থী অরিত্রি অধিকারীর আত্মহত্যা সমাজে বহুমাত্রিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের বিক্ষোভে শিক্ষাঙ্গণগুলোতে বহুদিনে জমে ওঠা অনিয়ম-অনাচার ও শিক্ষাবাণিজ্যের স্বরূপ বেরিয়ে এসেছে। রাজধানীর নামী-দামী স্কুলগুলোর মধ্যে ভিকারুননিসা নুন অন্যতম। অর্ধশতাব্দীর বেশী সময় ধরে বালিকাদের জন্য সুশৃঙ্খল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ভিকারুননিসা নুন স্কুলের সুনাম অক্ষুন্ন ছিল। কিন্ত গত এক দশকে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির একশ্রেনীর শিক্ষক বেশ কয়েকটি ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়ে বিদ্যালয়ের সুনাম ও ঐতিহ্যকে কলুৃষিত করেছে। রাজনৈতিক প্রভাবে শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য অনেক নিকৃষ্ট ঘটনার জন্ম দিয়েছে। ভিকারুননিসায় পরিমল জয়ধর নামের এক শিক্ষকের ছাত্রীর শ্লীলতাহানীর ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল ২০১১ সালে। এ ধরনের কুলাঙ্গার শিক্ষকদের কারণে সারাদেশের শিক্ষক সমাজকে অবনত, লজ্জিত হতে হয়। সেই পরিমল জয়ধরের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয়নি। অনিয়ম-দুর্নীতির নানাবিধ অভিযোগ এবং সরকারী প্রভাব খাটিয়ে অনিয়মতান্ত্রিক কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে শিক্ষক-অভিভাবকদের বিক্ষোভে অস্থিতিশীল অবস্থাও দেখা গেছে ভিকারুননিসায়। এবার ছাত্রীর আত্মাহত্যার ঘটনার সাথে শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের প্ররোচনার জোরালো অভিযোগ উঠেছে। 

অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনায় তার সহপাঠী ও বন্ধুরা মঙ্গলবার দিনভর ভিকারুননিসা নুন স্কুলের মূল ফটকের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেছে। অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ অভিযুক্ত শিক্ষকদের স্থায়ীভাবে চাকুরিচ্যুতি এবং সুষ্ঠু বিচারের নিশ্চয়তা না পেলে তারা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। তাদের সাথে অভিভাবক ও অনেক সাধারণ মানুষকেও একাত্মতা প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ভিকারুননিসার ছাত্রীদের বিক্ষোভের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে এবং ব্যাপক মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে বিদ্যালয়, ঢাকা শিক্ষাবোর্ড ও শিক্ষামন্ত্রনালয়ের তরফে আলাদা আলাদা ৩টি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে হাইকোর্টও একটি ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। নিহত শিক্ষার্থীর বাবা অধ্যক্ষ ও দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধে পল্টন থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা গভর্নিং বডি বাতিল, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের স্থায়ী অপসারণ দাবী করছে। ভিকারুননিসায় শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার প্রেক্ষাপটে দেশের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে একটি অমানবিক, অসুস্থ্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনের দাবী উঠেছে। এ ধরনের ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সারাদেশে এমন ঘটনা ঘটে চলেছে বলে মন্তব্য করে হাইকোর্ট তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা প্রতিরোধে নীতিমালা প্রণয়নে সংশ্লিষ্টদের কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, মর্মে একটি রুল জারি করেছেন।
স্কুলের নীতিমালা অমান্য করে স্কুলে মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিল অরিত্রি। পরীক্ষায় নকলের অভিযোগও ছিল। এ কারণে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীকে কঠোর শাসন করেছে , তার অভিভাবকদের ডেকে এনে অপমান করেছে। এখানেই শেষ নয়, অপমানিত হওয়ার পরও অরিত্রির পিতা ক্ষমা প্রার্থনা করে মেয়েকে স্কুল থেকে টিসি না দেয়ার জন্য আকুতি মিনতি করেন বলে জানা যায়। কোমলমতি শিক্ষার্থী এই ঘটনায় মর্মাহত হয়ে বাসায় গিয়ে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে বসে। বিষয়টি একজন কোমলমতি শিক্ষার্থীর মনোবেদনার অত্যধিক আবেগি প্রতিক্রিয়া বলে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে এর পেছনে রয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যমান অনৈতিক প্রতিযোগিতা, ভর্তিবাণিজ্য, কোচিংবাণিজ্য, নিয়োগবাণিজ্য ইত্যাদি। পরিমল জয়ধরের অপকর্মের ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর শিক্ষক নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানাবিধ অনিয়মের ঘটনা উঠে এসেছিল। ইতিপূর্বেও ছাত্রী নির্যাতনের অভিযোগে উত্তরা মডেল স্কুল থেকে বহিস্কৃত হওয়ার পর সেই শিক্ষককে ভিকারুননিসায় নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। বর্তমান অধ্যক্ষসহ বেশ কিছু শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক দলবাজির অভিযোগ রয়েছে। র্শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক নিয়োগ বাণিজ্য সারাদেশেই ঘটে চলেছে। একই সাথে শিক্ষকদের কোচিং, প্রাইভেট টিউশনী এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের ঘটনাও অহরহ ঘটছে। এসবই ঘটছে শিক্ষা কারিকুলামের সমন্বয়হীনতা, নিয়ন্ত্রণহীণ শিক্ষাবাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাবও নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে। অরিত্রির আত্মহত্যার ঘটনা মর্মান্তিক, দু:খজনক। আর কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যেন না ঘটে সে দিকে সংশ্লিষ্ট সকলকে নজর দিতে হবে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের সাথে কেমন আচরণ করতে হবে, শিক্ষকদের তা অবশ্যই জানতে হবে। নিয়োগ বাণিজ্য বন্ধ এবং গভর্নিং বডি গঠনের ক্ষেত্রে সমাজের শিক্ষিত-সজ্জনদের সুযোগ দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর