Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৩ পৌষ ১৪২৫, ৯ রবিউস সানী ১৪৪০ হিজরী

রওজা চোর ও হারামাইন গ্রাসে উদ্যত গোস্তাখ ক্রুসেডারদের ধ্বংস কাহিনী-২

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

ইসলামের বিরুদ্ধে ‘আর্নাথ এর ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা’ :
‘আর্নাথ’ ছিল ইরাকের ‘কাখ’ রাজ্যের ফরাসি শাসক। তার পূর্ণ নাম রিনোদী শায়তুন। কার্ক অবস্থিত ‘মৃত সাগর’ হতে দক্ষিণ পূর্বদিকে। মুসলমানদের হাতে দীর্ঘ দিন বন্দি থাকার পর ক্রুসেডার ‘আর্নাথ’ কার্ক দুর্গ হতে সে লোহিত সাগরে ধ্বংসাত্মক হামলা আরম্ভ করে। তখন মুসলমানদের নেতৃত্বে ছিলেন সালাহউদ্দীন।
তিনি ক্রুসেডারদের মোকাবেলায় আত্মনিয়োগ করে ছিলেন। লোহিত সাগরে তখন মুসলমানদের কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত ছিল। তাই ইসলামী ইতিহাসে লোহিত সাগর বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী ছিল। কেননা একটি সড়কপথ হেজাজের দিকে গিয়েছিল। সেখান থেকে ‘হারামাইন শরীফাইন’ (মক্কা ও মদীনা) খুব দূরে ছিল না, মাত্র একদিনের দূরত্বে। মুসলমানগণ লোহিত সাগরকে ইসলামী সাগর মনে করতেন। তারা পূর্ণভাবে আগ্রহী ছিলেন যে, কোন বিদেশি- ভারতীয় কিংবা চীনা, অথবা ইটালীয় বা অপর কোন নৌযানকে এ সাগরের ওপর দিয়ে চলাচল করতে দেয়া হবে না, কেননা এর ওপারে রয়েছে এডেন সীমান্ত। আর এ নৌপথ দিয়ে ব্যবসা- বাণিজ্য মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেখানে আর কারও আধিপত্য ছিল না।
ঐতিহাসিক বর্ণনানুযায়ী ক্রুসেডারেরা ইজাব হতে হেজাজের তীরবর্তী লোহিত সাগর অতিক্রম করে। তারা ‘ইয়াম্ব’ এর নিকটবর্তী ‘আল হোবা’ নামক তীরবর্তী স্থানে অবতরণ করে এবং হাজীদের কাফেলাগুলোর ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে এবং মদীনা মোনাওয়ারা হতে এক দিনের দূরত্বে অবস্থিত এ স্থানে অবস্থান করে, এমনকি তারা মদীনাতুর রাসূলে প্রবেশে উদ্যত হয়।
উদ্দেশ্য রাসূলুল্লাহ (সা:)-এর কবর খনন করে তার পবিত্র দেহ সেখান থেকে সরিয়ে ফেলবে, কিংবা গুম করে ফেলবে অথবা তাদের দেশে নিয়ে যাবে এবং সেখানে দাফন করবে। এর ফলে মুসলমানগণ তার কবর জিয়ারতের সুযোগ হতে বঞ্চিত হবে। এ সম্পর্কে কাজী আবদুর রহীম ইবনে আলী আল বিসানী তার এক সাহিত্যক আরবী ‘রেসালায়’ যে ব্যাখ্যা করেছেন তার মর্ম এই;
ক্রুসেডারেরা লোহিত সাগরে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল, উদ্দেশ্য হজ গমণেচ্ছুদের গতিপথ রোধ করা, মদীনা আক্রমণের মাধ্যমে মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত হানা এবং মুসলমানদের কেবলা সম্পর্কে তাদের তা’না তিরস্কার এবং ইয়েমেনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত ও পর্বতমালা অধিকার করা। অর্থাৎ ক্রুসেডারেরা চেয়েছিল দক্ষিণে এডেনে তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং উত্তরে ইলা-এ তাদের শাসন ব্যবস্থা কায়েম করা, যাতে লোহিত সাগরে তাদের পূর্ণ সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং তা কুক্ষিত করা সম্ভব হয়। ফলে ভারত মহাসাগর ও পূর্ব প্রাচ্যের একচ্ছত্র বাণিজ্য তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
সিরিয়ায় অবস্থানকারী গাজী সালাহউদ্দীনের নিকট এসব খবর পৌঁছে যায়। তিনি মিসরে নিয়োজিত তার নায়েব সাইফুদ্দীনের নামে প্রেরিত পত্রে এই মর্মে নির্দেশ প্রদান করেন যে, লোহিত সাগরে নিয়োজিত ক্রুসেড শত্রুদের বিরুদ্ধে মিসরের হোসামুদ্দীন লুলুর নেতৃত্বে একটি নৌবহর প্রস্তুত করা হোক। বৃহদাকারের নৌযানগুলোর সমন্বয়ে নৌবহর প্রস্তুত সম্পন্ন হয় এবং সেগুলো বিক্ষিপ্তভাবে বহু উটের পীঠে উঠিয়ে সুয়েজ নদীতে প্রেরণ করা হয় এবং নৌবহর আকারে লোকবলের মাধ্যমে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয় এবং এসব ইসলামী নৌযান লোহিত সাগরে অবতরণ করে। নৌ অভিযানের প্রথম পর্ব এভাবে সচল ও সক্রিয় উঠে।
অতঃপর মুসলিম সেনাপতি হোসামুদ্দীন ইলা অবরোধ করেন এবং নৌ ক্রুসেডারদের ওপর জয়লাভ করেন এবং সবাইকে বন্দি করেন এবং এরপর তিনি ক্রুসেডারদের নৌকাগুলোকে ধাওয়া করতে থাকেন। এমনকি তারা ইজাবের নিকট অবস্থান নেয়, যা হোরা তীরের হেজাজের তীরবর্তী এলাকা এবং ক্রুসেডারদের কেউ কেউ নৌকায় আশ্রয় নেয় এবং কেউ কেউ পর্বত মালায়। মুসলমানগণ বন্দি মুসলিম ব্যবসায়ীদের মুক্ত করেন।
অতঃপর হোসামুদ্দীন লুলু ও তার লোকজন হেজাজের স্থল ভাগ ধরে পরাজিতদের ধাওয়া করেন এবং ক্রুসেডারদের পর্বত মালায় বিতাড়িত করেন। তখন তারা মদীনা মোনওয়া থেকে এক দিনের দূরত্বে অবস্থান করছিল এবং তাদের সকলকে বন্দি করেন। তখন হজের মওসুম নিকটবর্তী ছিল। হোসামুদ্দীন লুলু দুই জন ক্রুসেড বন্দিকে মিনায় প্রেরণ করেন। সেখানে তাদেরকে কোরবানির জন্য কাবায় প্রেরিত পশুদের ন্যায় জবাই করা হয় এবং বাকি কয়েদিদের নিয়ে তারা মিসরে প্রত্যাবর্তন করে। ওই দুইজনের নাম জানা যায়নি।



 

Show all comments
  • Ameen Munshi ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১:২২ এএম says : 0
    মৃত্যুর সময় সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে এক টুকরো স্বর্ণ ও চল্লিশ টুকরো রূপা ছিল। তিনি তার অধিকাংশ গরিব প্রজাদের দান করে যান।দামেস্কের উমাইয়া মসজিদের বাইরে তাকে দাফন করা হয়। যদিও সালাহঊদ্দীন বহুকাল পূর্বেই ইন্তেকাল করেছেন ,কিন্তু মুসলিমদের হৃদয়ে তিনি আজও জীবিত ক্রুসেডের হৃদয়ে তিনি আতংক, আর মুসলিমদের হৃদয়ে তিনি খোদার আবর্তিত রহমত। আল্লাহ এই মহাবীরকে উত্তম প্রতিদান করুন।
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammad Mosharraf ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১:২৩ এএম says : 0
    “আপনি যদি একটি জাতিকে কোনরকম যুদ্ধ ছাড়াই ধ্বংস করে দিতে চান, তাহলে তাদের তরুণ প্রজন্মের মাঝে অশ্লীলতা আর ব্যাভিচারের প্রচলনের ব্যবস্থা করে দিন।” “নেতারা যে জনগনের নেতৃত্বে থাকে, সেই মানুষদের চেয়ে যখন নিজেদেরকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়, তারা সেই পদের জন্য তখন আর যোগ্য থাকে না।” — সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী
    Total Reply(0) Reply
  • গাজী ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১:২৩ এএম says : 0
    ১১৭৪ সালে নূরউদ্দিনের মৃত্যুর অল্পকাল পরে সালাহউদ্দীন সিরিয়া বিজয়ে ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্ব দেন। দামেস্কের শাসকের অনুরোধে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে শহরে প্রবেশ করেন। ১১৭৫ সালের মধ্যভাগে তিনি হামা ও হিমস জয় করেন। জেনগি নেতারা তার বিরোধী হয়ে পড়ে। সরকারিভাবে তারা সিরিয়ার শাসক ছিল। এরপর শীঘ্রই তিনি জেনগি সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন এবং আব্বাসীয় খলিফা আল মুসতাদি কর্তৃক মিশর ও সিরিয়ার সুলতান ঘোষিত হন।
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammad Shah Alam ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১:২৫ এএম says : 0
    সুলতান আইয়ুবী কর্তৃক বাইতুল মুকাদ্দাস নিয়ন্ত্রণে নেবার প্রায় ৮০০ বছর পর এবং ইসলামী খিলাফাত ধ্বংসের ৪৩ বছর পর মুসলমানরা প্রত্যক্ষ করল এক বেদনাদায়ক ও দুঃখজনক ঘটনা। মুসলিম বিশ্বের পারস্পরিক অনৈক্য ও দুর্বলতার ফলে পবিত্র বাইতুল মুকাদ্দাস আর মসজিদুল আকসা আবার চলে গেল বিধর্মীদের হতে। খ্রিস্টানদের মদদে সেখানে কর্তৃত্ব নিল অভিশপ্ত ইহুদী জাতি। ৮০০ বছর আগের ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটল সেই পবিত্র মাটিতে। মুসলমানদের রক্তে নতুন করে ভিজতে শুরু করল ফিলিস্তিনের মাটি। যা এখনো বিরাজমান।আজ শুধু ফিলিস্তিন নয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম মানবাত্মা ক্রন্দন করছে একজন সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর জন্য।
    Total Reply(0) Reply
  • আতিকুর রহমান ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১:২৭ এএম says : 0
    সভ্যতার পালা বদলে দীর্ঘ আটশত বছর পরে মুসলমানদের ভেতর পারস্পারিক অনৈক্যের কবলে পড়ে পবিত্র আল আকসায় আবার উড়ল ইহুদীদের পতাকা। সেই একই কৌশল। অনৈতিকতার বিষাক্ত ছোবল গ্রাস করে নিল মুসলিম সভ্যতা, সংস্কৃতি। মুসলমানদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে অট্টউল্লাসে নৃত্য করছে বাতিল শক্তি। শুধু ফিলিস্তিন নয় একের পর এক দখল করছে ইসলামী রাষ্ট্রগুলো। চালানো হচ্ছে মানবিকতার উপর এক ভয়াল নির্যাতন। পারলে মুসলমানদের কলিজা চিবিয়ে আনন্দ করছে বর্বর হায়েনারা। এই পরাশক্তিগুলো দমনে আজ প্রয়োজন এক “গ্রেট সালাহউদ্দিনের”, যার দুঃসাহসিকতা দেখে বৈরী হাওয়া মুছে দিবে সব নীচতা, হীনতা আর অমানবিকতার সব আস্ফালন। প্রস্ফুটিত হবে এক নতুন
    Total Reply(0) Reply
  • Monir ৬ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১:২৯ এএম says : 0
    হে আল্লাহ, মুসলিম জাতির এই মহা ক্রান্তিলগ্নে আজ তুমি আমাদের মাঝে আরেকজন আইয়ুবী দান কর, যে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করে সকল বাতিল রুখে দেবে।
    Total Reply(0) Reply
  • সাইয়েদ আনিস ৮ ডিসেম্বর, ২০১৮, ৫:১৮ পিএম says : 0
    আফসোস, যদি আমি সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর উত্তরসূরি হতে পারতাম ৷ আমি নিজেকে মহান মালিকের কাছে সমর্পণ করছি ৷
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর