Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১ হিজরী

করলা খেয়ে ওজন কমান

| প্রকাশের সময় : ১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম


উচ্ছে খান, সুগার কমান। দ্রুত সুগার কমায় করলা/ উচ্ছেতে থাকা উদ্ভিজ্জ ইনসুলিন পলিপেপটাইড পি। এটি ইনসুলিনের মতো এক জাতের প্রোটিন। এই প্রোটিনটি অগ্ন্যাশয় এবং অগ্ন্যাশয়ের বাইরের কোষসমূহে ক্রিয়া করে সুগার কমাতে সাহায্য করে। ওয়াশিংটনের গারভান ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল রিসার্চ এবং সাংহাই ইনস্টিটিউট অফ মেডিকার গবেষকরা কদিন আগে জানিয়েছেন করলার মধ্যে এমন চারটি যৌগ থাকে, যেগুলো এএমপিকে নামধারী প্রোটিন উৎসেচককে সক্রিয় করে শরীরের কোষকলার সুগার বহন ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। সুগারকে এনার্জি তথা জ্বালানিতে পরিণত করে পেশিতে পেশিতে পৌঁছে দেয়। এএমপিকে প্রোটিন কার্যত মধ্যস্থের ভূমিকা পালন করে দ্রুত সুগার আত্মীকরণ করিয়ে চটজলদি সুগার কমায়। গবেষক ডা.জিমিং ইয়ে এবং ডা. নিগেল টার্নার জানাচ্ছেন, ডায়াবেটিকের চিকিৎসার জন্য যেসব ওষুধ ব্যবহার করা হয়, সেইসব ওষুধেও এএমপিকে উৎসেচককে সক্রিয় করার উপাদান থাকে। কিছু ওষুধের কিছু না কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তথা ক্ষতিকর দিক থাকে, করলায় সেই ক্ষতির সামান্যতম আশঙ্কাও নেই। উল্লেখ্য, করলায় কোনোরকম ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হয় না, তা ষোড়শ শতক শুরু হওয়ার আগেই জানিয়ে প্রাণোচ্ছলতা তৈরি করে। দেহের মধ্যেকার বিষবর্জ্যকে সাফসুতরো করে।
গারভান ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল রিসার্চের ডায়াবেটিস এবং স্থূলত্ব রোধ বিভাগের অধিকর্তা প্রফেসর ডেভিড জেমস জানিয়েছেন, ‘আণবিক স্তরে যোগ্যতা যাচাই করে এটা এখন নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে, ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য করলা মহৌষধ। এখন দেখতে হবে করলা কোষের মধ্যে কীভাবে কাজ করে।’
১৯৯২ সালে বাংলাদেশে ইনসুলিন নির্ভর নন এমন ১০০ জন ডায়াবেটিক রোগীর উপর করলা খাওয়ার পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল, সুগার কমে। ভারতের অহল্যা ইউনিভার্সিটিতে ২০০৪ সালে করলার পাশাপাশি ডায়বেটিসে ওষুধ অর্ধেক মাত্রায় খাইয়ে দেখা গিয়েছিল ওষুধের মতোই করলাও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে। হাফ ডোজ ওষুধের সক্রিয়তা ফুল ডোজ করে দিচ্ছে। এই পরীক্ষা করা হয়েছিল ৫২ থেকে ৬৫ বছর বয়সিদের উপর। মেটাফরমিন বা গ্লিবেনক্ল্যামাইড খাওয়ানোর পাশাপাশি খাওয়ানো হয়েছিল করলার নির্যাস। কাউকে কাউকে খাওয়ানো হয়েছিল মেটাফরমিন এবং গ্লিবেনক্ল্যামাইড দুই-ই। সঙ্গে করলার নির্যাস। আয়ুর্বেদে ডায়াবেটিকদের নিয়মিত করলার রস দিতে বলা থাকলেও এতদিন আবছা একটা ধারণা থেকে করলা খেতে বলা হতো ডায়াবেটিক রোগীদের। এবার সেই অস্বচ্ছতা দূর হল।
টাইপ টু ডায়াবেটিসে ভুগছেন যাঁরা, তাঁদের জন্যত বটেই, টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিকদের জন্যও উপকারী করলা/ করলার রস। ফিলিপিনসের স্বাস্থ্য দফতর ডায়াবেটিকদের করলা খাওয়ার সুপারিশ করেছে। বলা হয়েছে, করলা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করে ত্রিধারায়। করলায় থাকা ইনসুলিন সম পলিপেপটাইড পি এবং অ্যালকালয়েড তথা ক্ষারীয় উপাদান ব্লাড সুগার কমায়। করলায় থাকে অলিয়ানোলিক অ্যাসিড গ্লাইকোসাইড। এটি টাইপ টু ডায়াবেটিকদের মধ্যে অন্ত্র তথা নাড়িভুঁড়ি থেকে সুগার শোষণে বাধা দিয়ে গ্লুকোজ (সুগার) সংবহনী তৎপরতা এবং ধারণ ক্ষমতা বাড়ায়। করলা অগ্ন্যাশয়ে বিটা সেলের সংখ্যাদিক্য ঘটিয়ে ইনসুলিন হরমোন উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। করলায় থাকে চারনতিন নামে বিভিন্ন স্টেরয়েডের সংমিশ্রণে তৈরি হওয়া একটা যৌগ বা উপাদান, যেটি ব্লাড সুগার কমানোর ওষুধ টোলবুটামাইডের চেয়ে বেশি কার্যকর/শক্তিধর। ফিলিপিনসে এখন সবাই জানে, করলার রস/ করলা খেলে সুগার নিয়ন্ত্রণ থাকে দারুণভাবে। করলা এইচআইভি আক্রান্তদের জন্যও উপকারী। এটি এইডসের মারণ ভাইরাসকে দ্রুতহারে বৃদ্ধি পেতে দেয় না। ওষুধের পাশাপাশি তাই করলা/ করলার রস খেতে বলা হয়। করলা পাচক রসের পরিমাণ বাড়িয়ে তুলে হজমশক্তি বাড়ায়। পিত্ত রস বাড়িয়ে দিয়ে চর্বির বিপাক্রিয়া তন্দুরস্ত করে। গ্যাসট্রিকের সমস্যায় করলা উপকারী। বদহজম এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের শুশ্রষায় করলা উপকরী। করলা অন্ত্র তথা নাড়িভুঁড়ি শোষণ ক্ষমতা বাড়ায়। আয়ুর্বেদে আছে করলা/ উচ্ছে পতার রস খেলে মদ্যাসক্তি কমে, অর্শে উপকার পাওয়া যায়। কলেরার সময়ও উপকার মেলে। ঋতুস্রাবের কষ্ট লাঘব করে। করলায় প্রচুর পটাসিয়াম থাকে। তাই বলার অপেক্ষা রাখে না, করলা হাইপারটেনশন তথা হাই ব্লাড প্রেসার নিয়ন্ত্রণ রাখতে সাহায্য করে।
আমার পরিচিত একজন ডায়াবেটিক রোগী করলা খান, ভেতরের সাদা অংশ বাদ দিয়ে নুন পানিতে ভিজিয়ে তুলে নিয়ে দুটো ডিমের সঙ্গে মিশিয়ে রসুন দিয়ে ভিজিয়ে। নুনে ভেজালে তেতোভাব কমে। মাংসের কিমার সঙ্গে করলা সেদ্ধ মিশিয়ে নিয়ে সস/ কেচআপ দিয়ে খান অনেকে। থাইল্যান্ডে এভাবে খাওয়া হয়। করলা রুচি বাড়ায়। খিদে বাড়ায়। ভোজ খাওয়ার আগে করলা খান, শরীর গরম হবে না। করলা কৃমির উৎপাত থেকে বাঁচায়। পেট পরিষ্কার করে। করলা তথা রক্ত দূষিতজনিত যে কোনো রোগে পথ্য করলা। ছত্রাক সংক্রমণ, সোরায়াসিসের মতো চর্মরোগ, খোসপাঁচড়া দমন করে করলা। করলার ইংরেজি নাম বিটার মেলন বা বিটার গার্ড। বিদেশের বাজারে বিটার মেলন প্লাস নামে করলা থেকে তৈরি একটি ওষুধ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। প্রস্তুতকারকদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিটার মেলন প্লাস খাওয়ার দু-ঘন্টা পর থেকেই সুগার কমা শুরু হয়। তিনদিনের মাথায় অনেকটা কমে যায়। জি এস টেকনোলজি ইনকর্পোরেটেড তাদের তৈরি বিটার মেলন প্লাসের উপকারিতা জানাতে যেসব বিজ্ঞাপন দেয়, তাতে রোগীদের নাম দিয়ে আগে কার কত সুগার ছিল, বিটার মেলন খাওয়ার পর কতটা কমেছে তা তুলে ধরে। যেসব দেশে হাত বাড়লেই করলা/উচ্ছে মেলে, সে সব দেশে ওষুধ খেতে মিছেই বলা।

আফতাব চৌধুরী
সাংবাদিক-কলামিস্ট।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: করলা
আরও পড়ুন