Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার ২৪ এপ্রিল ২০১৯, ১১ বৈশাখ ১৪২৬, ১৭ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

রাজনীতির অন্তরাল এবং অন্তরালের রাজনীতি

তৈমূর আলম খন্দকার | প্রকাশের সময় : ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক’, এ শ্লোগান বুকে ধারণ করে গুলিতে নুর হোসেনের প্রাণ গেলেও গণতন্ত্র মুক্তি পেয়েছে কি? দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে কি? গণতন্ত্রে যারা বিশ্বাসী বা বাহ্যিকভাবে হলেও গণতন্ত্রের জন্য লড়াই, সংগ্রাম, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম প্রভৃতি চালিয়ে যাচ্ছেন তারা কি নিজ বলয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সচেষ্ট রয়েছেন? Charity Begins at Home- প্রবাদটি সর্বস্থলে সমাদ্রিত। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলি কি সাংগঠনিক নিয়মে চলছে? সাংগঠনিক নিয়মনীতি শৃঙ্খলা ও কর্মীর মূল্যায়ন জামায়াত ইসলাম ও বাম দলগুলির মধ্যে থাকলেও বড় দলগুলি এর ধারে কাছে নাই। বরং একে অপরকে কীভাবে ল্যাং মারবে, এ ধরনের পরামর্শ তাদের কাছ থেকেই আসে যারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে আছেন এবং দেশব্যাপী নিজস্ব বলয় সৃষ্টিতে সচেষ্ট রয়েছেন।
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বলে আশা করা যাচ্ছে। নির্বাচনে ল্যাভেল প্লেয়িং ফিল্ডের কথা উঠছে, কিন্তু প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে উঠছে আরও অনেক অনেক কথা, যা শুনলে রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করা মুসকিল। বাণিজ্য অর্থাৎ রিমান্ড বাণিজ্য, কমিটি বাণিজ্য, গ্রেফতার বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্যের চেয়ে নমিনেশন বাণিজ্যের কথা রসালোভাবেই গ্রামগঞ্জে, হাটবাজারে আলোচিত হচ্ছে, যা নিয়ে কথা বলা আমার আজকের লেখার উদ্দেশ্য নয়, এ নিয়ে কথা বলতে উৎসাহ বোধও করি না। কারণ এসব বিষয় শুনতে শুনতে গা সওয়া হয়ে গেছে। যারা রাজনীতিতে গুণগতমান উন্নয়নের কথা বলেন তারাও এসব বাণিজ্যের অংশীদার অথবা নির্বোধ-নির্বাক হয়ে পড়েছেন, যা জ্ঞান পাপীর ভ‚মিকার সমতুল্য।
নির্বাচন কমিশনের ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ জাতীয় নির্বাচন দেশের ভাগ্য নির্ধারণ, সরকার গঠন, দেশবাসীকে নিরাপত্তাসহ লালন-পালন, আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে রাষ্ট্রের অবস্থান সঠিক রাখাসহ সার্বিক বিষয় বিবেচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যা হেলাফেলা হিসেবে দেখলে চলবে না। পূর্বের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনীতির মাঠে বিচরণ করা মানুষগুলিই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতো। কারণ তারা জনগণের দাবি-দাওয়া নিয়েই মাঠে থাকে, বৃষ্টিতে ভেজে, রৌদ্রে শুকায় এবং তাদেরকেই নির্বাচন নামক ভোটের মাঠে লড়াই করতে দেখা যেতো। কিন্তু সম্প্রতিকালের দৃশ্য হচ্ছে ভিন্নতর। সরকারি দলে মধু বেশি, অন্যদিকে পুলিশি নির্যাতন নাই, মামলা-হামলার তো প্রশ্নই আসে না। ফলে হালুয়া-রুটির ভাগ বাটোয়ারার জন্য সরকারি দলে নমিনেশন বিক্রির হিড়িক পড়েছে। কিন্তু বিরোধী দলেও নমিনেশন ফর্ম কম বিক্রি হয় নাই। এর কারণ শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনে ভুক্তভোগী নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষের ঢল নেমেছে নমিনেশন ক্রয়ের জন্য, এ বিষয়টি সাধারণ মানুষ একটি উৎসব বলেই মনে করছিল। কিন্তু উচ্চ পর্যায়ে হেভিওয়েট প্রার্থীরা এম.পি হওয়ার জন্য নির্বাচনী মাঠকে যেভাবে কোরবানির হাঠে পরিণত করেছে তা নিতান্তই রঙ্গমঞ্চের তামাশার মতই মনে হচ্ছে। ১/১১ সরকারের একজন খলনায়ক লে. জে. (অব.) মাসুদউদ্দিন বলেছেন যে, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না আসলে পিঠের চামড়া থাকবে না।’ অথচ তিনি দাঁড়িয়েছেন লাঙ্গল মার্কায়। এ সম্পর্কে তিনি বলেছেন যে, যা করছি শেখ হাসিনার নির্দেশেই করছি। জাতীয় নির্বাচন আসলে উপর তলার নটরাজদের রাজনৈতিক চরিত্র কত প্রকার ও কী কী তা সহজেই অনুমান করা যায়। তাদের এ চরিত্রকে কোরবানির গরুর হাটের সাথে তুলনা করে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নিজেকে ছোট করতে না চাইলেও এর চেয়ে ভালো উপমা দেয়া অ্যাপ্রোপ্রিয়েট বলে মনে হচেছ না।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নমিনেশন পাওয়া দলের কর্মীর ন্যায্য অধিকার, দলের দায়িত্ব কর্মীকে নেতায় পরিণত করা। কর্মীর পিছনে জনভিত্তি দাঁড় করানোর দায়িত্ব দলের। কিন্তু রাজনৈতিক দল সে কাজটি না করে দলীয় নেতৃত্বের পকেট ভারী করার খবর বিভিন্নভাবে চাওর হচ্ছে। নমিনেশন একটি স্বীকৃতি। এই স্বীকৃতি কাদের পাওয়া উচিৎ? রাজনীতির মাঠটি দিনে দিনে যেন কোরবানির গরুর হাটে পরিণত হয়েছে। নিয়ম-নীতি ও আদর্শের এখানে কোনো বালাই নাই। গরুর হাট সব সময় জমে না, কোরবানির ঈদের সময় যতটা জমে। কাক্সিক্ষত মূল্যে গাবতলীর হাটে বিক্রি না হলে মিরপুরের হাটে তো হবেই, ফলে পাইকার বা দালালদের আশার অন্ত থাকে না। নিজে যে আদর্শকে বিশ্বাস করে তা বাস্তবায়নের জন্য মানুষ রাজনীতি করে। নীতিবান মানুষের জন্য আদর্শিক রাজনীতি লুটেরাদের জন্য যা ভিন্ন কথা। অর্থনীতিতে Demand and Supply এর একটি সংজ্ঞা রয়েছে। সে সংজ্ঞাতে বলা হয়েছে, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা প্রভৃতি মৌলিক চাহিদা যখন একজন ব্যক্তির পূরণ হয়ে যায় তখন সে নাম/সুনাম ক্রয় করার চেষ্টা করে। অনুরূপ পার্লামেন্ট কি এবং পার্লামেন্টে কথা বলার যোগ্যতা আছে কি নাই তা বিবেচনা না করে যার টাকা আছে সেই কোরবানির হাটের মতো বিভিন্ন হাটে একটি টিকেটের জন্য ঘুরপাক খেতে থাকে। দলগুলিও তাদের লুফে নেয় যাদের টাকা আছে এবং এ অবস্থায় টাকা বৈধ না অবৈধ তা পর্যালোচনার প্রয়োজন মনে করে না, যদিও নেতারা মুখে মুখে আদর্শ ও নীতি বাক্যে আওরাতে কম যায় না।
শর্ষের মধ্যে যদি ভূত থাকে তবে রাজনীতির গুণগতমান বৃদ্ধি হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না। জাতি যাদের দিকে তাকিয়ে থাকে তাদের চরিত্র যদি হয় কলুষিত অর্থাৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বা প্রার্থী বাছাইয়ে গুণগত বিষয় পর্যালোচনা বা বিবেচনা না করে ‘বিত্তমান’ হওয়াটাই বিবেচনার কেন্দ্র বিন্দু হয়ে পড়ে তবে গুণগতমান উন্নতির পরিবর্তে নিম্নদিকেই ধাবিত হবে এবং হচ্ছে। স্বৈরাচার ও দুঃশাসন ঠেকাতে হলে জনগণ লাগবে, জনগণ তখনই নামবে যখন নেতৃত্বের স্বচ্ছতা থাকবে। নেতার বক্তব্য ও ব্যক্তিগত চরিত্রের গুণগত ডিফারেন্স বুঝার বা উপলব্ধি করার ক্ষমতা নিশ্চয় জনগণের রয়েছে। জনগণ এখন ভাবাবেগে চলে না, বরং বাস্তবতায় বিশ্বাসী।
সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে জনগণ কেন মাঠে নামলো না বা গণবিপ্লব বা গণবিস্ফোরণ কেন ঘটলো না, এ নিয়ে জাতীয় নেতৃত্বের নিকট কোনো গবেষণামূলক তথ্য নাই। যদি থাকতো তবে নিশ্চয় তা প্রকাশ পেতো। মূলত এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, একদিকে জাতীয় নেতাদের সারশূণ্য বক্তব্য অন্যদিকে সরকারের মিথ্যাচার, এ দুটাই জাতিকে ভাবিয়ে তুলেছে। একটি জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জনগণের মধ্যে যে আশা আকাক্সক্ষার প্রতিফলন হওয়ার কথা গ্রামে-গঞ্জে তা লক্ষ করা যায় না। সম্প্রতিকালে জনগণ নির্বাচন দেখেছে, যেখানে কেবল আদর্শিক ব্যক্তির চেয়ে দলগুলি ধনবানদেরই প্রাধান্য দিয়েছে, ফলে জনগণ শোষিত হয়েছে বার বার। পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় আদর্শের যেমন কোনো বালাই নাই, ঠিক তেমনি নির্বাচনের উদ্দেশ্য (রাষ্ট্রীয়) শাসন ব্যবস্থায় নিজ, নিজের পরিবারের ও অনুগতদের ভাগ্য পরিবর্তনে নিজেকে অংশীদার করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধান অতিথির ভাষণে ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত মহাসমাবেশে ড. কামাল হোসেন বলেছিলেন, টাকাওয়ালাদের পিছনে ঘুরবেন না, আদর্শিক ব্যক্তি চাই। আদর্শবান ব্যক্তি তারাই যারা জনগণের সাথে সম্পৃক্ত, জনগণের প্রতি যার ত্যাগ ও সার্ভিস রয়েছে। কিন্তু দলীয় মূল্যায়নের বিষয়ে আদর্শবান ব্যক্তিরাই এখন আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। দলছুটেরাই প্রাধান্য পাচ্ছে। এখন এ বিষয়টি ড. কামাল হোসেন কোন বিবেচনায় নেবেন?
দলে যখন বিপর্যয় নেমে আসে তখন আর ধনবানদের খুঁজে পাওয়া যায় না, কিন্তু ক্ষমতায় থাকাবস্থায় তারাই থাকে লুটপাটের প্রথমাংশে। রাজনীতিকে রাজনীতির পরিমন্ডলে পরিমাপ করা উচিৎ এবং এর ব্যত্যয় হওয়ায় আজ লুটেরাদের নিকট রাজনীতি বশীভূত হয়ে পড়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে জনগণ। যার জন্য জনগণকে সারা বছরই নাজাহেল হতে হয়। টেম্পোচালক, বেবি ট্যাক্সি চালক, ফুটপাতের হকার, রাস্তার পাড়ের পিঠা বিক্রেতা থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরের লোককেই দুটি ট্যাক্স দিতে হয়। একটি সরকারি ট্যাক্স, অন্যটি সরকারি দলের জন্য ট্যাক্স। সরকার দলীয় ট্যাক্স আদায় হয় দলীয় এম.পিকে কেন্দ্র করে যার ভাগ বাটোয়ারা হয় এম.পি নির্দেশিত পথেই। জনগণ থেকে দলীয় ব্যানারে আদায়কৃত অর্থ এম.পি তহবিলে জমা হতে থাকে পরবর্তী আর একটি নির্বাচনের তহবিল গঠনের জন্য। এ সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলি মুখে মুখে অনেক নীতি কথা বললেও বাস্তবতা তার উল্টো।
রাজনীতির গুণগত মান উন্নয়নের জন্য জাতীয় নেতাদের মুখে মুখে চিড়া ভিজালে হবে না। জাতীয় নেতৃত্বের মনে যদি মোনাফেকি না থাকে তবে তারা নিশ্চয় গুণগত মান উন্নয়নের জন্য দৃশ্যমান কিছু ভ‚মিকা রাখবেন। ভালো ফসল পেতে হলে ভালো বীজ অবশ্যই বপন করতে হবে। যদি মাঠে-ময়দানে যাদের কোনো ভ‚মিকা নাই শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে ম্যানেজ এবং বিত্তবান হওয়ার কারণেই এম.পি পদে মূল্যায়িত হয় তবে দল রাজপথের কর্মীদেরই অবমূল্যায়ন করলো। নিষ্ঠাবান কর্মী যদি মূল্যায়িত না হয় তবে সুবিধাবাদী ও সুবিধা সন্ধানীদের পদচারণায় দলের ক্র্যাকডাউন কেউ ঠেকাতে পারবে না, যেমনটি এখন পারছে না।
সরকারের মূল শক্তি পুলিশ ও বিচার বিভাগ। এর পরিবর্তে বিরোধী দলের শক্তি হতে হবে জনগণভিক্তিক। জনগণকে সাথে নিয়ে যাদের মাঠে থাকার অভিজ্ঞতা রয়েছে তারাই পারবে কেন্দ্র পাহারা দিয়ে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে। দল ভারী আর পকেট ভারী এক কথা নয়। রাজনৈতিক দল হতে হবে কর্মীভিত্তিক এবং নেতৃত্ব উঠে আসতে হবে কর্মী থেকে। যদি তা না হয় তবে বিত্তবানদের কবলে দল বশীভূত হওয়ায় কর্মী আর কর্মচারীর মধ্যে কোনো তফাৎ থাকবে না। ফলে লক্ষ কোটি জনসমর্থিত দলকেও পুলিশের বুটের তলায় দলিত হতে হবে।
নেতৃত্বের প্রতি যখন মানুষের হতাশা নেমে আসে তখন সে নেতৃত্ব অকার্যকর হয়ে যায়। কর্মীরা মাঠে নামে না। আন্দোলন সংগ্রামে বাস্তবমুখী ভ‚মিকার পরিবর্তে নেতাদের মধুবাণী শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। আর সরকারি নির্যাতন থেকে বাঁচার দিনগুণতে থাকতে থাকে, নেতৃত্বের ফাঁকাবুলিতে যখন হতাশা নেমে আসে তখন তাদের পা আর চলে না। এখন পরিবারের একাধিক সদস্যের এম.পি হওয়ার শখ অনেক প্রকটভাবে দেখা দিয়েছে। অথচ ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন নাই।
লেখক: কলামিস্ট ও আইনজীবী



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: রাজনীতি

৩০ মার্চ, ২০১৯
১০ মার্চ, ২০১৯
২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
১ জানুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ