Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬, ২২ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

প্রাণিসম্পদ খাতে সম্ভাবনাকে আরো ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে

শিশির রেজা | প্রকাশের সময় : ২০ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০৪ এএম

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছে। গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, মুরগি, হাঁসের সংখ্যা প্রতিবছর বৃদ্ধিতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, সীমিত ভূখন্ড, অত্যাধিক জনসংখ্যা, দ্রুত বিকাশমান শিল্পখাত আর ব্যাপক নগরায়ণ সত্তে¡ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন যে গুরুত্বর্পূণ অবদান রাখতে পারে, দেশের জনগণ সে বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে। প্রাণিসম্পদ তথা পশুপালন মানবসভ্যতার আদিমতম পেশা হিসেবে বিবেচিত। আদিম মানুষ হিংস্র নেকড়ে ও কুকুরকে হাতিয়ার হিসেবে কাজে লাগিয়ে পশুপাখি শিকার করত। শিকার করা পশুপাখিই ছিল তাদের খাদ্য। উদ্বৃত্ত পশুপাখি খাদ্য হিসেবে প্রতিপালন করে মানুষ একসময় প্রাণিসম্পদকে বিনিময়ের কাজে ব্যবহার করে, যা মানবসভ্যতাকে নিমিষেই নতুন এক স্তরে পৌঁছে দেয়। আমাদের অঞ্চলেও কৃষি ও অকৃষি কাজে প্রাণিসম্পদের ব্যবহার হয়ে আসছে। উর্বর সমতল ভূমির বাংলাদেশ অঞ্চল স্বভাবতই হাজার হাজার বছর আগে থেকেই কৃষিনির্ভর। এর পেছনে পশুসম্পদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে প্রাণিসম্পদ শুধু কৃষিকাজেই নয় জ্বালানি, জৈবসার ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এ দেশেও প্রাণিসম্পদ লালনপালন করা হচ্ছে পুরোপুরি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে। বিশ্বের দেশে দেশে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যায় প্রাণিসম্পদ অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশাল ভূমিকা রাখলেও মানবশরীরের প্রোটিন সরবরাহের অন্যতম উৎস হিসেবেও জায়গা করে নিয়েছে। ডিম, দুধ, মাংসের চাহিদা পূরণ করে বর্তমানে প্রাণিসম্পদ বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশে দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির অন্যতম পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আর এ কারণেই মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে ভিশন-২০২১-এ বাংলাদেশের ৮৫ শতাংশ লোকের জন্য পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবারের নিশ্চয়তার লক্ষ্য নির্ধারিত রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে মাথাপিছু ২৫০ গ্রাম দুধ, ১২০ গ্রাম মাংস এবং সপ্তাহে ২টি করে ডিমের চাহিদা নিশ্চিত করা হবে।
নদীবিধৌত বাংলাদেশের জলবায়ু পশুপাখি প্রজননের জন্য অনুকূল। প্রাণিসম্পদের উন্নয়নে স্বাধীনতাপররবর্তী সময় থেকে সরকারি পর্যায়ে সমন্বিত কর্মসূচির মাধ্যমে প্রাণিরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, চিকিৎসা, জাত উন্নয়ন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হলেও জনগণ ও বেসরকারি পর্যায়ে আরও কার্যক্রম গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রাণিসম্পদে বিনিয়োগ যে লাভজনক, তা হাঁস-মুরগি খামার শিল্পে অভূতপূর্ব উন্নয়নই প্রমাণ করে। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে গত পাঁচ বছরে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন যথাক্রমে ৩৪ দশমিক ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে ৭২ দশমিক ৭৫ লক্ষ মেট্রিক টন, ২৩ দশমিক ৩০ লক্ষ মেট্রিক টন থেকে ৬১ দশমিক ৫২ লক্ষ মেট্রিক টন এবং ৭৩০ দশমিক ৩৮ কোটি থেকে ১ হাজার ১৯১ দশমিক ২৪ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে ২০১৬ সালে দেশে কোরবানী যোগ্য গরু-মহিষের সংখ্যা ছিল ৪৪ লক্ষ ২০ হাজার এবং ছাগল ও ভেড়া ৭০ লক্ষ ৫০ হাজার, যা বাংলাদেশের জনগণের পশু কোরবানীর চাহিদা শতভাগ পূরণে সক্ষম হয়েছে। রোগবালাই নিয়ন্ত্রণে দ্রæত পদক্ষেপের কারণে পোল্ট্রি শিল্পে বাংলাদেশ বিপ্লব সাধন করেছে। বর্তমানে এই খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ হাজার কোটি টাকা। তৈরি পোশাক বা গার্মেন্টস শিল্পের পর পোল্ট্রি শিল্প কর্মসংস্থানের দিক দিয়ে দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত, যেখানে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৬০ লক্ষ লোক নিয়োজিত (সূত্র: বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৫-২০১৬, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর)।
অত্যন্ত অনুকূল জলবায়ু ও পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজ করলেও বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ডিম ও দুধ উৎপাদন প্রতিবছর অনেকটা জ্যামিতিক হারে বেড়ে চললেও বর্তমানের চাহিদার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার তথ্যমতে, ডিম ও দুধের আনুমানিক ঘাটতি যথাক্রমে ৫৭ ও ৩৩ শতাংশ। গবাদিপশুর গড় ওজন যথেষ্ট কম−গাভি ও ষাঁড় যথাক্রমে ১০০ ও ১৫০ কেজি, যা ভারতীয় গবাদিপশুর তুলনায় ২৫-৩০ শতাংশ কম।
এ তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় এ খাতের উন্নয়নে আরো বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রাণিসম্পদের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালে জাতীয় প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করেছে, যেখানে এই খাতের উন্নয়নে কয়েকটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। যথা: ১। দুগ্ধ উন্নয়ন ও মাংস উৎপাদন; ২। হাঁসসহ পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়ন; ৩। পশুচিকিৎসা ও পশুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন; ৪। পশুখাদ্য ও ফডার ব্যবস্থাপনা; ৫। জাত উন্নয়ন; ৬। পশুর চামড়া ও ত্বক; ৭। প্রাণিসম্পদ পণ্যের বাজারজাতকরণ; ৮। আন্তর্জাতিক বাজার বা রপ্তানি ব্যবস্থাপনা; ৯। প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাংক ঋণ বৃদ্ধি ও প্রাপ্তি সহজকরণ।
বাংলাদেশ ২০১৪ সালে Least Developed Country--এর তালিকা থেকে বেরিয়ে এসেছে। বর্তমানে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬৬ ডলার, ব্যাংক রিজার্ভ ৩২ বিলিয়ন, জিডিপি ৭.১১%। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এ ক্ষেত্রে প্রাণিসম্পদের ভ‚মিকা অনেক। জাতীয় পুষ্টিচাহিদা পূরণ, খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দারিদ্র্য হ্রাসকরণের মাধ্যমে প্রাণিসম্পদ দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১.৬৬%। প্রবৃদ্ধির হার ৩.২১ শতাংশ। মোট কৃষিজ জিডিপিতে প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান প্রায় ১৪.২১ ভাগ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতে জিডিপির আকার ছিল ৩২.৯১০ কোটি টাকা যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের তুলনায় ৩.২৩ কোটি টাকা বেশি।
‌'Survery on Private Sector Gross Fixed Capital Formation in Cultivated Biological Resources'শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জিডিপি ক্যালকুলেশনের ভিত্তিবছর পরিবর্তিত হলে প্রাণিসম্পদ খাতের জিডিপিতে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হবে। তখন প্রাণিসম্পদের জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৪২ হাজার কোটি টাকা। দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনে প্রাণিসম্পদের অবদানের পরিমাণ উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। বেড়ে চলেছে উৎপাদন।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অধীন খামারসমূহে ২২ লক্ষ ৪৪ হাজার ৩৪০টি হাঁস-মুরগির বাচ্চা, ৫০০টি বাছুর ১ হাজার ১৯৫টি ছাগীর বাচ্চা ও ৬১টি মহিষ শাবক উৎপাদিত হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালনায় ১১ লক্ষ ১৮ হাজার ৬৯৯ ডোজ তরল ও ২৩ লক্ষ ৩৬ হাজার ১২১ ডোজ গভীর হিমায়িত সিমেন দ্বারা কৃত্রিম প্রজনন সম্পন্ন হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর দেশের ১২ লক্ষ ৬৫ হাজার ৯৮৪ জন যুবক, যুব ও দুস্থ মহিলা, ভ‚মিহীন ও প্রান্তিক কৃষকের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে বেকারত্ব দূর করেছে। রোগ প্রতিরোধ টিকাবীজ বিক্রয়, কৃত্রিম প্রজনন ফি, ফার্ম ও কোম্পানিসমূহের নিবন্ধন ফি, চিড়িয়াখানা, সরকারি খামার এবং টেন্ডারসহ অন্যান্য খাত থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোট ৩৭ কোটি ৭৯ লক্ষ ২০ হাজার টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। জাতীয় রপ্তানিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাণিসম্পদ খাতের অর্জন ৪৪০৪২২ কোটি টাকা। কোরবানির ঈদ উপলক্ষে শুধু গরুকে ঘিরেই ৭০-৮০ হাজার কোটি টাকা বাণিজ্যের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
ভিশন ২০২১ এবং ২০৪১ কে সামনে রেখে ডিম, দুধ ও মাংসের চাহিদা ও সরবরাহের অনুপাত সামঞ্জস্যপূর্ণ করা প্রয়োজন। এ জন্য বর্তমানে ডিম দুধ ও মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা আছে যেমন স্থানীয় পর্যায়ে দুগ্ধখামারি ও কৃষকের অভাব, পশুপাখির খাবারে ভেজাল, প্রাণিসম্পদের সুষম খাদ্যের অভাব, পশুপাখির সঠিক ব্যবস্থাপনের অভাব, বর্জ্য অপসারণে অব্যবস্থাপনা, ঔষধের উচ্চমূল্য, উপযুক্ত বাজারজাতকরণের অভাবের মতো সমস্যাগুলো দূর করতে হবে। গ্রামীণ ক্ষুদ্র খামারি ও কৃষককে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে উদ্ধুদ্ধ করা প্রয়োজন। আর্থিক সেবায় খামারিদের অভিগম্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। খসড়া জাতীয় প্রাণিসম্পদ নীতিমালা ২০০৭ এবং খসড়া জাতীয় প্রাণিসম্পদ নীতিমালা ২০১৩ চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। দেশের প্রাণিসম্পদের খাদ্যচাহিদা পূরণের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। গরু, মহিষ, ছাগল ও হাঁস মুরগির জন্য কমিউনিটিভিত্তিক খাদ্য উৎপাদন, ফডার চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে কার্যক্রম চালু করতে হবে। পদ্মার চরসহ উপকূলীয় সব অঞ্চলে উচ্চ ফলনশীল অধিক আমিষযুক্ত ভুট্টা, সয়াবিন ও নেপিয়ার ঘাস উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো তথা এ শিল্পের ওপর মনোনিবেশ করাই হবে প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন তথা অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভ‚মিকা রাখা। বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ে যেসব কৃষক, বেকার যুবক গবাদি ও পশুপালনের সাথে সম্পৃক্ত তাদের পশুর রোগবালাই, সুষম খাবার, টিকাবীজ এবং প্রাণিসম্পদ থেকে প্রাপ্ত দ্রব্যাদি বাজারজাতকরণ বিষয়ে বিস্তারিত ধারনা প্রদান করতে হবে। খামারিদের জন্য গবাদিপশুর অস্বাভাবিক মৃত্যুজনিত ঝুঁকি নিরসনে বিমা সুবিধার ব্যবস্থা রাখাও একান্ত জরুরি। স্থানীয় পর্যায়ে পশুসংক্রান্ত ল্যাবরেটরি সুবিধা থাকা প্রয়োজন। তথ্যপ্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করতে যেমন ভয়েস মেসেজ সার্ভিস চালু করলে সাক্ষরতা জ্ঞানসম্পন্ন ও নিরক্ষর উভয় ধরনের খামারি উপকৃত হবেন।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: প্রাণিসম্পদ


আরও
আরও পড়ুন