Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ২০ মে ২০১৯, ০৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৪ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

প্রতিবেশীর অধিকার : ইসলামী দৃষ্টিকোণ

মুহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাসুম | প্রকাশের সময় : ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০৩ এএম

মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন: এবং আল্লাহ্র বন্দেগী করো এবং তাঁর শরীক কাউকেও দাঁড় করাবে না এবং মাতা-পিতার সাথে সদ্ব্যবহার করো এবং আত্মীয়-স্বজনগণ, এতিমগণ, অভাবগ্রস্থগণ, নিকট প্রতিবেশীগণ, দূর প্রতিবেশীগণ, নিকটের সঙ্গী, পথচারী এবং আপন দাস-দাসীদের সাথেও। নিশ্চয়ই আল্লাহ্র পছন্দ হয় না কোন দাম্ভিক, আত্ম-গৌরবকারীকে। - সূরা: নিসা, আয়াত: ৩৬ এই আয়াতের আলোকে তাফসীরে আহমদিয়াতে বর্ণিত রয়েছে: নিকটতম প্রতিবেশী দ্বারা তারাই উদ্দেশ্য, যাদের ঘর নিজের ঘরের সাথে লাগানো এবং দূরবর্তী প্রতিবেশী দ্বারা তারাই উদ্দেশ্য, যারা একই মহল্লার অধিবাসী কিন্তু তাদের ঘর নিজের ঘরের সাথে লাগানো নয়। অথবা যারা প্রতিবেশীও এবং আত্মীয়ও তারাই হলো নিকটতম প্রতিবেশী। আর যারা শুধুমাত্র প্রতিবেশী, আত্মীয় নয় তারা দূরবর্তী প্রতিবেশী অথবা যারা প্রতিবেশীও হবে এবং মুসলমানও হবে তারাই হলো নিকটতম প্রতিবেশী আর যারা শুধুমাত্র প্রতিবেশী হবে মুসলমান নয়, তারাই হলো দূরবর্তী প্রতিবেশী। -তাফসীরে আহমদিয়া, আন্ নিসা, ৩৬নং আয়াতের অধীনে, ২৭৫ পৃ:
ইসলাম কতই না উত্তম ধর্ম, যা শুধুমাত্র আমাদেরকে পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনদের সাথে উত্তম আচরণের শিক্ষা দেয় বরং এও শিখায় যে, আমাদের নিকটতম ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর সাথে কি ধরণের আচরণ করা উচিত। কুরআন ও সুন্নাহর একাধিক স্থানে প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণ করা এবং তাদের হক সমূহ আদায় করার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: “তোমাদের জানা আছে, প্রতিবেশীর হক কি?” (অতঃপর নিজেই ইরশাদ করেন) যখন তারা তোমাদের কাছ থেকে সাহায্য চায়, তখন সাহায্য করবে এবং যখন কর্জ চায় তখন কর্জ দিবে। আর যখন মুখাপেক্ষী হয়, তখন তাকে দান করবে। যখন অসুস্থ হয়, তখন সেবা করবে। যখন সফলতা লাভ করে, তখন ধন্যবাদ দাও। যখন বিপদগ্রস্থ হয়, তখন তার প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করো। মৃত্যুবরণ করলে তার জানাযার সাথে যাও। অনুমতি ছাড়া নিজের উচ্চ দালান নিমার্ণ করিও না, যাতে তার বাতাস বন্ধ হয়ে যায় এবং সক্ষম হলে তোমার ডেকসি হতে তাকে কিছু দাও, নতুবা তা দ্বারা তাকে কষ্ট দিবে না। আর যখন কোন ফল লাভ করো, তখন তার কাছেও হাদীয়া পাঠিয়ে দাও। আর যদি হাদীয়া না দাও, তখন লুকিয়ে ঘরের মধ্যে নাও এবং তোমার সন্তানেরা যেন তা নিয়ে বাহিরে না যায়, যার কারণে প্রতিবেশীর সন্তানেরা কষ্ট পায়। তোমাদের জানা আছে যে, প্রতিবেশীর হক কী? ঐ সত্তার শপথ! যার কুদরতের হাতে আমার প্রাণ রয়েছে! পরিপূর্ণভাবে প্রতিবেশীর হক আদায়কারীর সংখ্যা কম। তারাই (আদায় করে), যাদের উপর আল্লাহ্ তায়ালার দয়া রয়েছে।” হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবেশীদের সম্পর্কে ধারাবাহিকভাবে উপদেশ দিচ্ছিলেন, এমনকি লোকেরা মনে করেছিলো যে, প্রতিবেশীদেরকে উত্তরাধিকারী বানিয়ে দিবেন। অতঃপর রহমতে আলম হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন: “প্রতিবেশী তিন প্রকার; কারও হক তিনটি, কারও হক দুইটি এবং কারও হক একটি। যে সকল প্রতিবেশী মুসলমান এবং আত্মীয়, তাদের হক তিনটি; প্রতিবেশীর হক, ইসলামের হক এবং আত্মীয়তার হক। মুসলমান প্রতিবেশীর হক দুইটি; প্রতিবেশীর হক এবং ইসলামের হক। আর অমুসলিম প্রতিবেশীর শুধুমাত্র একটি হক আর তা হলো প্রতিবেশীর হক।”-শুয়াবুল ঈমান,বাবুন ফি ইকরামিল জার,৭/৮৩-৮৪, হাদীস নং: ৯৫৬০
হাদীস শরীফের বর্ণনামতে, প্রত্যেক মুসলমানের পার্শ্ববর্তী চল্লিশ ঘরে বসবাসকারীগণ তার প্রতিবেশী বলে গণ্য হবে। নবীজির দরবারে এক ব্যক্তি আরয করলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি অমুক গোত্রের মহল্লার মধ্যে বসবাস করি, কিন্তু তাদের মধ্য হতে যে আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, সে আমার সবচেয়ে নিকটতম প্রতিবেশী। তখন রাহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবু বকর সিদ্দিক, হযরত ওমর ফারুক এবং হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমকে প্রেরণ করলেন, তাঁরা মসজিদের দরজার উপর দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করলেন, নিশ্চয়ই ৪০টি ঘর পর্যন্ত প্রতিবেশীর মধ্যে অন্তভর্‚ক্ত এবং যাদের ক্ষতি দ্বারা তার প্রতিবেশী ভীত হবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। - মু’ জামে কবীর,১৯/৭৩
তাই হযরত আবদুল্লাহ্ বিন আবু বকর রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রতিবেশীর ঘর সমূহের মধ্যে ডানে-বামে এবং সামনে-পিছনে ৪০টি করে ঘরের লোকদের জন্য খরচ করতেন। ঈদের সময় তাদের জন্য কুরবানীর মাংস ও কাপড় পাঠাতেন এবং প্রত্যেক ঈদে ১০০টি গোলাম আজাদ (মুক্ত) করতেন।- আল মুস্তাতরফ,১/২৭৬
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন: “অনেক প্রতিবেশী কিয়ামতের দিন তাদের প্রতিবেশীদের আঁচল সমূহ ধরবে! অত্যচারিত প্রতিবেশী আরয করবে: হে আল্লাহ্! এই ব্যক্তির কাছে জিজ্ঞাসা করো! সে আমার উপর তার দরজা সমূহ বন্ধ করে রেখেছিলো এবং নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বস্তু আমার কাছ থেকে বেঁধে রেখেছিলো।” -কানযুল উম্মাল,৫/২৩ হাদীস নং : ২৪৮৯৮
এক ব্যক্তি আরয করলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! অমুক মহিলার আলোচনা, তার নামায, সদকা এবং রোযার আধিক্যের কারণে করা হয়। কিন্তু সে তার মুখ দ্বারা প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয়। তখন হুযূর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: “সে জাহান্নামী!”। লোকটি আবার আরয করলো: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! অমুক মহিলার নামায এবং রোযার স্বল্পতা রয়েছে এবং পনিরের টুকরো সদকা করার কারণে চেনা যায় এবং নিজেদের প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয় না। তখন তাজেদারে মদীনা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: “সে জান্নাতী।”- মুসনদে আহমদ, ৩/৪৪১, হাদীস নং: ৯৬৮১
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মদ গাযালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: মনে রাখবেন! প্রতিবেশীর হক শুধুমাত্র এটা নয় যে, প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকা, বরং প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে পাওয়া কষ্ট সমূহ সহ্য করাও প্রতিবেশীর হকের মধ্যে অন্তভর্‚ক্ত। কেননা, এমনও হয়ে থাকে যে, এক ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না এবং সেও এর বিনিময়ে তাকে কষ্ট দেয় না। অথচ সেইভাবে প্রতিবেশীর হক আদায় হয় না। সেজন্য শুধুমাত্র কষ্ট সহ্য করার উপর যথেষ্ট মনে করবে না, বরং প্রয়োজন বশত: তার সাথে নম্র এবং উত্তম আচরণ করবে। - ইহ্ইয়াউল উলুম, ২/২৬৭
প্রতিবেশীর হক আদায় করা, তাদের দেখাশুনা করা, অভাব পূরণ করা, তাদের অন্তর খুশী করা, তাদের সাথে উত্তম আচরণ করা, তাদেরকে খুশী রাখা এবং তাদেরকে কষ্ট না দেয়ার ব্যাপারে ইসলামের যে মর্যাদাময় শিক্ষা রয়েছে, যদি বর্তমান মুসলমানগণ সঠিকভাবে এই সৌন্দর্য্যমন্ডিত শিক্ষাকে নিজের জীবনের অংশ বানিয়ে নেয় এবং সেগুলো অনুযায়ী আমল করে, তবে সেই দিন দূরে নয় যে, আমাদের সমাজে বাস্তবিক পক্ষে আমূল পরিবর্তন আসবে, আর সমাজ নিরাপত্তার দূর্গ হয়ে যাবে। কিন্তু আফসোস! আমরা নূরনবীর শিক্ষা হতে দূরে সরে যাচ্ছি, অন্যান্য বিষয়াবলির সাথে সাথে এখন প্রতিবেশীর হক আদায় করার বিষয়েও হীনতার গভীর গর্তে পতিত হচ্ছি। একই গলি, মহল্লার মধ্যে বছরের পর বছর অতিবাহিত করার পর নিজের প্রতিবেশীদের পরিচয়, তাদের উপস্থিতি এবং প্রতিবেশীর হক হতে উদাসীনতার অবস্থা এরূপ যে, যদি কোন ব্যক্তি তার কোন প্রিয় জনের সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য আসে আর আমাদের কাছে সেই গলি ও মহল্লার মধ্যে বসবাসকারী তার কোন প্রিয়জনের পরিচয় জানতে চায়, তখন আমরা বগল দিয়ে দেখি এবং মাথা চুলকাই। আমাদের একেবারে খবর থাকে না যে, আমাদের প্রতিবেশীর মধ্যে কারা থাকে। তাদের নাম কি, কি কাজ করে। যখন প্রতিবেশীর মধ্যে কোন মানুষ মারা যায় কিংবা কেউ অসুস্থ হয় অথবা কেউ পেরেশানির সম্মুখীন হয়, তখন আমরা সমবেদনা এবং সেবা করা অথবা তাকে সান্তনা দেয়ারও সামর্থ্য রাখিনা। হ্যাঁ! ধনী লোক, বড় ব্যবসায়ী, অফিসার, মন্ত্রীগণ, উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা, বিশেষ বন্ধুগণ, ভ্রাতাগণ অথবা এমন প্রতিবেশী যাদের দ্বারা আমরা নিজেদের কাজ করাই, আমাদের কাছে তো তারা খুশী এবং পেরেশানি উভয় অবস্থায় আসে অথবা তারা আমাদেরকে তাদের অনুষ্ঠানের মধ্যে দাওয়াত দিয়ে থাকে। কিন্তু গরীব প্রতিবেশীর কল্যাণ কামনা করা অথবা তাদের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা আমরা নিজেদের সম্মানের পরিপন্থী মনে করি। কতিপয় মূর্খ তো এমন অনুভ‚তিহীন হয়ে থাকে যে, ঘরের মধ্যে উপস্থিত ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত, রোগী অথবা বিপদগ্রস্থ ভাই-বোন, এমনকি পিতা-মাতাকেও পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করে না। তাহলে তারা ঘরের বাহিরের প্রতিবেশীদের কি খবর রাখবে এবং তাদের কি হক আদায় করবে? বুযুর্গগণ শুধুমাত্র প্রতিবেশীদের হক আদায় করেননি, বরং অন্যান্য লোকদেরও সেটার প্রতি উৎসাহিত করেছেন। হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম মুহাম্মদ গাযালী রহমাতুল্লাহি আলাইহি প্রতিবেশীদের হক সমূহ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন: প্রতিবেশীকে প্রথমে সালাম দিবে, তাদের সাথে দীর্ঘক্ষণ কথাবার্তা বলবে না, তাদের অবস্থা সমূহ সম্পর্কে অতিরিক্ত প্রশ্ন করবে না, যখন তারা অসুস্থ হয়, তখন তাদের সেবা করবে, বিপদের সময় তাদের পেরেশানী দূর করবে, কঠিন মূহুর্তে তাদের সঙ্গ দিবে, তাদের খুশীর মধ্যে অংশগ্রহণ করবে, তাদের ভুল সমূহ ক্ষমা করবে, নিজের ঘরের ছাদ হতে তাদের ঘরের মধ্যে উকি মেরে দেখবে না, তাদের দেয়ালের উপর কড়িকাঠ রেখে তাদের ছোট ড্রেনে পানি নিক্ষেপ করে এবং তাদের আঙ্গিনায় মাটি ইত্যাদি নিক্ষেপ করে তাদেরকে কষ্ট দিবে না, তাদের ঘরের রাস্তাকে সংকীর্ণ করবে না, তারা যা কিছু তাদের ঘরে নিয়ে যায় সেই দিকে দৃষ্টিপাত করবে না, যদি তাদের কোন ঘটনা ঘটে তখন তাড়াতাড়ি তাদেরকে সাহায্য করবে, প্রতিবেশীদের অনুপস্থিতিতে তাদের ঘর রক্ষণাবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে উদাসীনতা প্রকাশ করবে না, তাদের বিরুদ্ধে কোন কথা শুনবে না, তাদের (স্ত্রীগণের) সামনে দৃষ্টি নত রাখবে, তাদের সন্তানদের সাথে নম্রভাবে কথা বলবে, ধর্মীয় এবং দুনিয়াবী যে কোন বিষয়ে যখন তাদের পথ প্রদর্শনের প্রয়োজন হবে (তখন) সেই ক্ষেত্রে তাদেরকে পথ প্রদর্শন করবে।- ইহ্ইয়াউল উলুম, ২/৭৭২
হযরত সায়্যিদুনা মালিক বিন দিনার রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন, সেই বাড়ির সাথে একেবারে লাগানো একজন অমুসলিমের বাড়ি ছিলো। সে ঘৃণা এবং হিংসায় ছোট নালার মাধ্যমে দূর্গন্ধযুক্ত পানি এবং ময়লা তার ঘরের মধ্যে নিক্ষেপ করতে থাকে, কিন্তু তিনি নিরব ছিলেন। অবশেষে একদিন সেই লোকটি নিজেই এসে আরয করলো: জনাব! আমার ছোট নালা দিয়ে যাওয়া অপবিত্রতার কারণে আপনার তো কোন অভিযোগ নেই? তিনি অত্যন্ত নম্রভাবে বললেন: ছোট নালা দিয়ে যেই দূর্গন্ধযুক্ত ময়লা পতিত হয়, তা ঝাড়– দিয়ে আমি ধূয়ে ফেলি। সে বললো: আপনার এতো কষ্ট হওয়া সত্তে¡ কোন রাগ আসে না? তিনি বললেন: আসে, তবে তা হজম করে নিই। কেননা, আল্লাহ্ তায়ালা ইরশাদ করেন: এবং ক্রোধ সংবরণকারীরা, মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শনকারীরা এবং সৎ ব্যক্তিবর্গ আল্লাহ্র প্রিয়। সূরা: আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪ উত্তর শুনে সে অমুসলিম মুসলমান হয়ে গেলো। - তাজকিরাতুল আউলিয়া, ৫১ পৃ:

হযরত বায়েজিদ বোস্তামী রহমাতুল্লাহি আলাইহির একজন অমুসলিম প্রতিবেশী সফরে গিয়েছিলো। তার সন্তানগণ ঘরের মধ্যে ছিলো। রাতের বেলায় তার সন্তানগণ কান্না করতো, তিনি (তার স্ত্রীর নিকট) জিজ্ঞাসা করলো: বাচ্চারা কেন কান্না করছে? সে বললো: ঘরের মধ্যে বাতি নেই। বাচ্চারা অন্ধকারের মধ্যে ভয় পাচ্ছে। সেই দিন
থেকে তিনি দৈনিক চেরাগের মধ্যে বেশি করে তেল ভর্তি করে চেরাগ জালাতেন এবং তার ঘরে পাঠিয়ে দিতেন। যখন সেই অমুসলিম সফর থেকে ফিরে আসলো, তখন তার স্ত্রী এই ঘটনা তাকে শুনালো, সেই অমুসলিম বললো: যেই ঘরের মধ্যে বায়েজিদ বোস্তামির চেরাগের (বাতির) আলো এসেছে, সেখানে অন্ধকার কেন থাকবে। তারা সকলে মুসলমান হয়ে গেলো।- মিরআতুল মানাজীহ, ৬/৫৭৩

খাজা গরীবে নেওয়াজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি তাঁর প্রতিবেশীদের প্রতি অনেক খেয়াল রাখতেন এবং তাদের দেখাশোনা করতেন। যদি কোন প্রতিবেশীর ইন্তেকাল হয়ে যেতো, তখন তার জানাযার সাথে অবশ্যই তাশরীফ নিয়ে যেতেন। তার দাফনের পর যখন লোকেরা ফিরে আসে, তখন তিনি একাকী তাঁর কাছে তাশরীফ নিয়ে যেতেন এবং তার জন্য ক্ষমা ও নাজাতের দোয়া করতেন। আর তার পরিবারের লোকদেরকে ধৈর্যের শিক্ষা দিতেন এবং তাদেরকে সান্তনা দিতেন । মুঈনুল আরওয়াহ, ১৮৮ প্র: হযরত আবদুল্লাহ্ বিন রজাআ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: কুফায় ইমাম আযম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহির প্রতিবেশীর মধ্যে একজন মুচী থাকতো। যে সারা দিন পরিশ্রম করতো এবং রাতে ঘরের মধ্যে মাছ অথবা (কোন প্রাণীর) মাংস নিয়ে আসতো, অতঃপর সেগুলো বুনে খেতো। এর পর মদ পান করতো। যখন মদের নেশায় মাতাল হয়ে যেতো, তখন খুব চিৎকার করতো। এভাবে গভীর রাত পর্যন্ত এ ধারাবাহিকতা বজায় থাকতো, এমন কি তার ঘুম চলে আসতো। ইমাম আযম আবু হানীফা রহমাতুল্লাহি আলাইহি সেই চিৎকারের কারণে সীমাহীন কষ্ট অনুভব করতেন। কিন্তু তিনি সারারাত নামাযের মধ্যে ব্যস্ত থাকতেন। এক রাতে সেই প্রতিবেশী মুচীর আওয়াজ শুনেন নাই, সকাল বেলা তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তাঁকে বলা হলো; রাতে সিপাহীরা তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে আর সে জেলখানায়। ইমাম আযম রহমাতুল্লাহি আলাইহি ফজরের নামায আদায় করলেন এবং তাঁর বাহনের উপর আরোহণ করে খলীফার কাছে গেলেন, আর নিজের আসার খবরটা খলীফার কাছে পাঠালেন। খলীফা হুকুম দিলেন, তাঁর বাহনের লাগাম ধরে অত্যন্ত সম্মানের সাথে শাহী গালিচা পর্যন্ত নিয়ে আসো এবং তাঁকে বাহন হতে অবতরণ করতে দিবে না। সিপাহীরা সেভাবেই করলো। খলীফা জিজ্ঞাসা করলো: কি হুকুম? তিনি বললেন: আমার একজন প্রতিবেশী মুচী ছিলো, যাকে গত রাতে সিপাহীরা গ্রেফতার করে নিয়ে এসেছে, তার মুক্তির হুকুম দিন। খলীফা আদেশ জারী করলো যে, ঐ মুচীকে তাড়াতাড়ি মুক্ত করে দাও এবং ঐসব কয়েদীদেরকেও মুক্ত করে দাও যাদেরকে আজকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে। অতএব সকলকে মুক্ত করে দেয়া হলো। অতঃপর ইমাম আযম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বাহনের উপর আরোহণ করে পথ চলা শুরু করলেন। সেই প্রতিবেশী তাঁর পিছনে পিছনে চলতে লাগলো, তখন ইমাম আযম রহমাতুল্লাহি আলাইহি জিজ্ঞাসা করলেন: হে যুবক! আমি কি তোমাকে কোন কষ্ট দিয়েছি? সে আরয করলো: না বরং আপনি আমাকে সাহায্য করেছেন এবং আমার জন্য সুপারিশ করেছেন। আল্লাহ্ তায়ালা আপনাকে এর উত্তম প্রতিদান দান করুক। কেননা, আপনি প্রতিবেশীর সম্মান এবং অধিকারকে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর পরে সেই ব্যক্তি তাওবা করে নিলো এবং গুনাহ থেকে ফিরে আসলো।- মানাকিবে ইমাম আযম, ২২৪,২২৫ পৃ:
আফসোস! বর্তমানে প্রত্যেক লোক নিজেদের হকের ব্যাপারে আওয়াজ উঁচু করে। কিন্তু নিজেদের প্রতিবেশীদের হকের প্রতি একেবারে খেয়াল করে না। আমরা তো নিজেরা অনেক নেয়ামত দ্বারা সম্পদশালী হই এবং সুস্বাদু খাবার দ্বারা ক্ষুধা নিবারণ করি। কিন্তু আমাদের প্রতিবেশী কোন অবস্থায় সময় অতিবাহিত করছে আমাদের সেই ব্যাপারে কোন সহযোগীতা নেই। যদি আমাদের অভাবী প্রতিবেশী আমাদের কাছে কোন কিছু চায়, তখন তাদের অভাব পূরণ করার ক্ষমতা থাকা সত্তে¡ও আমরা কৃপণতা করি। অনেক সময় তো অত্যন্ত অপছন্দনীয় আচরণ করে থাকে। অনুরূপভাবে কতিপয় অজ্ঞগণের এই অবস্থা হয় যে, তারা তাদের ময়লা উদাহরণ স্বরূপ ফল এবং সবজির চামড়া, কোরবানীর প্রাণীর রক্ত এবং লেজ অথবা পঁচা মাংস ইত্যাদি নিক্ষেপ করে, দূর্গন্ধযুক্ত পানি ছেড়ে দেয়া, অনুমতি ছাড়া তাদের ঘরে উঁকি দেয়া, বিবাহ অথবা অন্যান্য অনুষ্ঠানে গান-বাজনা, বাজি ফুটানো অথবা আতশবাজি করা, তাদের ঘর অথবা দোকানের সামনে কোন কারণ ছাড়া বাধা দেয়া, তাদের ঘরের ঘন্টা বাজানো, তাদেও সন্তানদেরকে ধমক দেয়া, তাদের সত্ত্বা ও এর সাথে সম্পৃক্ত বস্তু সমূহ উদাহরণ স্বরূপ- কোরবানীর জন্তু, বাড়ি, দোকান অথবা গাড়ি ইত্যাদির মধ্যে দোষ বের করা, তাদের দেয়াল সমূহ পানের ফিক দ্বারা ময়লাযুক্ত করে দেয়া ইত্যাদি বিষয় দ্বারা নিজেদের প্রতিবেশীদেরকে উত্যক্ত করে এবং তাদের আরাম ও শান্তি বিনষ্ট করে নিজেদের কবর ও পরকালকে ধ্বংস করে দেয় । এই ধরণের লোকদের উচিত, তারা প্রতিবেশীদের হক নষ্ট করা এবং তাদেরকে বিরক্ত করা থেকে ভয় করা।
কেননা, প্রতিবেশীদেরকে বিরক্ত করার কারণে যদি আল্লাহ্ তায়ালা ও তাঁর প্রিয় হাবীব অসন্তুষ্ট হয়ে যায়, তখন মনে রাখবেন! নামায, রোযা এবং দান-সদকার আধিক্যও জাহান্নামের থেকে বাঁচাতে পারবে না। রাসূলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : “যে তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দিলো, নিশ্চয়ই সে আমাকে কষ্ট দিলো। আর যে আমাকে কষ্ট দিলো, সে আল্লাহ্ তায়ালাকে কষ্ট দিলো। যে তার প্রতিবেশীর সাথে ঝগড়া করলো, সে আমার সাথে ঝগড়া করলো। আর যে আমার সাথে ঝগড়া করলো, নিশ্চয়ই সে আল্লাহ্ তায়ালার সাথে ঝগড়া করলো।” অতএব প্রতিবেশীর পক্ষ থেকে যদি কোন কষ্ট পৌঁছে যায়, তখন আবেগের বশবর্তী হয়ে তার সাথে ঝগড়া এবং মারামারি, তার বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযান কিংবা তার কোন প্রকারের ক্ষতি করার স্থলে ধৈর্যধারণ করা উচিত। কেননা, প্রতিবেশীর কষ্টের উপর ধৈর্যধারণ করার বরকতে মানুষ আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয় বান্দা হয়ে যায়। হুযুর পুরনূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: “ আল্লাহ্ তায়ালার প্রিয় বান্দাদের মধ্যে ঐ সকল ব্যক্তিও অন্তভর্‚ক্ত, যার মন্দ প্রতিবেশী তাকে দেয়া কষ্টের উপর মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত ধৈর্যধারণ করে।”
খাইর খাওয়াহ হাম ভী পড়–িস কে বনি, ইয়ে করম ইয়া মুস্তফা! ফরমায়িয়ে।
নেয়ামতে আখলাক কর দিজিয়ে আতা, ইয়ে করম ইয়া মুস্তফা! ফরমায়িয়ে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম


আরও
আরও পড়ুন