Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ১০ মাঘ ১৪২৫, ১৬ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

আখেরাত না থাকলে পার্থিব জীবনের কোনো মূল্যই থাকে না

উবায়দুর রহমান খান নদভী | প্রকাশের সময় : ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ১২:০২ এএম

কোরআন পাক আখেরাতের অপরিহার্যতার ব্যাপারে অন্য আরেক আঙ্গিকেও আলোকপাত করেছে। তার নিজস্ব ভঙ্গিতে কোরআন পাক মানুষের সুষ্ঠু ও সুস্থ বিবেককে উদ্দেশ্য করে বলেছে, তোমরা দেখতে পাচ্ছ, এ জগতে সৎ ও অসৎ কর্ম রয়েছে। কিন্তু এর প্রতিদান ও শাস্তি যা আল্লাহ তায়ালার ন্যায়পরায়ণতার তাগাদা তা এখানে পাওয়া যায় না।
সেজন্য এ বিষয়টি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায় যে, এই পার্থিব জীবনের পর আরও কোনো জীবন থাকবে, যেখানে সৎকর্মীদেরকে তাদের সৎকর্মের প্রতিদান আর অপরাধীদেরকে তাদের অসৎ কর্মের শাস্তি দেয়া হবে। যদি তা না হয়, তাহলে এ জগতের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার ওপর এক বিরাট অপবাদ আরোপিত হয়ে পড়বে।
বিষয়টিকে আরও কিছুটা বিস্তারিত এভাবে বুঝতে পারেন যে, এ জগতে সবই দেখে, বহু পেশাদার জালেম, দুষ্কৃতকারি জীবনভর বড় বড় পাপ করে, মানুষের জান-মালের ওপর ডাকাতি চালায়, দুর্বলদের ওপর অত্যাচার করে, মানুষের অধিকার হরণ করে, গরিব-দুঃখীদের ওপর উৎপীড়ন চালায়, ঘুষ ও আত্মসাতের পথ অবলম্বন করে অথচ জীবনভর আরাম-আয়েশে কাটায়। বংশধরদের জন্যও বিত্ত-বৈভব ও বিলাস সামগ্রী রেখে এ জগৎ থেকে বিদায় নেয়।
পক্ষান্তরে আল্লাহ তায়ালার অনেক বান্দাকে এমন অবস্থায়ও দেখা যায় যে, তারা অত্যন্ত সততা ও পবিত্রতার জীবন অতিবাহিত করে। কারও প্রতি অত্যাচার করে না, কাউকে ধোঁকা দেয় না, কারও সাথে প্রতারণা করে না, কারও অধিকার হরণ করে না। আল্লাহর ইবাদতও যথারীতি সম্পন্ন করে এবং তার সৃষ্টির সেবাও করে। কিন্তু তা সত্তে¡ও তাদের জীবন অভাব-অনটন ও কষ্টে কাটে। কখনও রোগ-শোক, কখনও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। আর এ বেচারারা এমনি অবস্থায় এক সময় পৃথিবী থেকেও চলে যায়। দেখা যায়, তাদের এসব সততা-পবিত্রতার কোনো প্রতিদানই তারা পেল না।
সুতরাং পার্থিব এ জীবনের পরেও যদি এমন কোনো জীবন না থাকে, যেখানে এসব অসৎকর্মী ও সৎকর্মীরা নিজ নিজ কৃতকর্মের শাস্তি বা প্রতিদান পাবে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই আল্লাহর ওপর অপবাদ আসবে যে, তার রাজ্যে পৃথিবীর বে-ইনসাফ সরকারগুলোর চাইতেও বেশি অনাচার চলেছে। না সৎকর্মশীলদের সৎকর্মের কোনো মূল্য আছে, না অসৎকর্মী জালেমদের অন্যায়-অনাচারের কোনো শাস্তি আছে। বরং সমস্ত সাধু-পরহেজগার এবং চোর-ডাকাতের সাথে অন্ধপুরী তথা নৈরাজ্যময় দেশের মতো এই আচরণ চলে। বলাবাহুল্য, সুস্থ কোনো বিবেক এটাকে গ্রহণ করতে পারে না।
আল্লাহ তায়ালার সত্তা তো অনেক বড়, এ ধরনের আচরণ কোনো সাধারণ ভালো মানুষের পক্ষেও মানানসই হতে পারে না যে, সে শিষ্ট-সম্ভ্রান্ত ও দুষ্ট-অভদ্র এবং সাধু-পরহেজগার ও পেশাদার দুষ্কৃতকারির সাথে একই ধরনের আচরণ করবে। কোরআন এ বিষয়টিকেই নিজের অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, সালঙ্কার ও অনন্য ভাষায় এভাবে ব্যক্ত করেছে, ‘আমি কি অনুগত ও অবাধ্যদেরকে একই সমান করে দেব? (অর্থাৎ, এমনটি কস্মিনকালেও হতে পারে না)।’ (সূরা কলম: আয়াত ৩৫)।
অন্য আরেক জায়গায় এরশাদ হয়েছে, ‘আমি কি সেসব লোককে-যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, সেসমস্ত লোকের সমান করে দেব যারা পৃথিবীতে দাঙ্গা-অনাচার বিস্তার করে বেড়ায়? আমি কি পরহেজগারদের আর দুষ্কৃতকারিদের সাথে একই ধরণের আচরণ করব? (এমনটি কক্ষণও হতে পারে না)।’ (সূরা সোয়াদ: আয়াত ২৮)।
আরও এক জায়গায় ইরশাদ হয়েছে, ‘এসব লোক-যারা অপরাধ ও অসৎকর্ম অবলম্বন করে নিয়েছে তাদের কি ধারণা, আমি এসব অপরাধীকে আমার সৎকর্মশীল মু’মিন বান্দাদের সাথে রাখব, যাতে করে তাদের জীবন ও মৃত্যু একই রকম হবে? তাদের এ সিদ্ধান্ত একান্তই মন্দ এবং তাদের এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।’ (সূরা জাসিয়াহ: আয়াত ২১)।
কোরআন মাজীদের দ্বিতীয় এ যুক্তিটিকে অন্য শব্দে এভাবেও বলা যেতে পারে যে, এ জগতে আমরা দেখি, প্রতিটি বস্তু গঠিত সামগ্রীরও কিছু বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ রয়েছে। যেমন, আগুনের ভেতর উত্তাপ ও দহনের বৈশিষ্ট্য। পানিতে শৈত্য ও নির্বাপনের বৈশিষ্ট্য। ভ‚মি থেকে অঙ্কুরিত প্রতিটি উদ্ভিদে রয়েছে কোনো না কোনো বৈশিষ্ট্য। এমন কি মাটির কীট পতঙ্গেরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।
তেমনিভাবে মানুষের প্রত্যেকটি বস্তুগত ও জৈবিক কর্মেরও লক্ষণ ও পরিণতি থাকে। যেমন, আহার গ্রহণ করলে পেট ভরে, ক্ষুধার উপশম হয়। পানি পান করলে তৃপ্তি লাভ হয়, তৃষ্ণা নিবারিত হয়। দৌড়ঝাঁপ করলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়ে; শরীরে ঘাম বেরোয়। শক্ত বস্তু খেলে পেটে ব্যথা হয়। বিরেচক খেলে দাস্ত হয়। সুতরাং মানুষের ভালো কিংবা মন্দ চারিত্রিক কর্ম (যা বস্তুগত ক্রিয়া-কর্ম থেকে নিশ্চয়ই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদূর প্রসারী), সেগুলোরও কিছু প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি অবশ্যই থাকবে।



 

Show all comments
  • আমিন মুন্সি ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:২৫ এএম says : 0
    সে অনেক খারাপ! তার পরও তো দেখি সে খুব ভালো আছে!’ ‘অমুক তো এমন কোনো মন্দ বা পাপ কাজ নেই- যা সে করে না। এর পরও সে জীবনে বাঁধাহীনভাবে উন্নতি করে যাচ্ছে!’ ‘সে যদি আল্লাহর কাছে অপছন্দের হতো; তবে কি এতো মানুষ তার পক্ষে থাকত, তার সুনাম করত!’ দুনিয়ার বাস্তবতার নিরিখে এ ধরনের কিছু জটিল প্রশ্ন বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, সৎ-অসৎ নির্বিশেষে অনেকের মনেই জেগে থাকে। এ প্রশ্নগুলো যেভাবে একবিংশ শতাব্দীর মানুষের মুখে শোনা যায়; ঠিক সেভাবে আজ থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর পূর্বে সপ্তম শতাব্দীতে, পবিত্র কোরআনে কারিম অবতরণের সময়ও শোনা যেত।
    Total Reply(0) Reply
  • মুস্তাফিজুর রহমান ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:২৭ এএম says : 0
    দুনিয়াতে স্বাস্থ্য, সম্পদ, জনবল, ক্ষমতা ইত্যাদি দেওয়ার জন্য আল্লাহতায়ালা তার আনুগত্য ও অবাধ্যতাকে মূল্যায়ন করবেন না। তিনি তার আনুগত্য ও অবাধ্যতাকে মূল্যায়ন করে মানুষকে বিভক্ত করবেন পরকালে। তাই অবিশ্বাসী ও অবাধ্যদের বৈষয়িক ও পার্থিব সফলতা দেখে ঘাবড়ে যাওয়ার বা সংশয়ী হওয়ার কিছু নেই। তাদের সব সফলতা ও উন্নতি অতি ক্ষণিকের জন্য। এর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। চরম ব্যর্থতা আর আক্ষেপ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বিপরীতে কোনো বিশ্বাসী এবং অনুগত ব্যক্তি যদি পার্থিব জীবনে কষ্টে থাকে, নিজেকে পরাজিত মনে করে; তবুও তার হতাশার কিছুই নেই। পার্থিব জীবনের সকল ক্লেশ ও পরাজয় যে কোনো সময় তাকে চিরবিদায় জানাবে। আর সুনিশ্চিত চিরস্থায়ী সফলতা তাকে অভ্যর্থনা জানাবে।
    Total Reply(0) Reply
  • শেখ ফরিদ ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:২৭ এএম says : 0
    পবিত্র কোরআনের আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, ‘যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা সন্দেহ করে তারা সফল হবে না। দুনিয়াতে জীবন উপভোগ করার পর তারা আমার কাছে ফিরে আসবে। তখন অবিশ্বাসের জন্য তাদের কঠিন শাস্তি দিব।’ -সূরা ইউনুস: ৬৯-৭০
    Total Reply(0) Reply
  • মনির হোসেন মনির ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:২৮ এএম says : 0
    মহান আল্লাহ দুনিয়াকে করেছেন পরীক্ষার হলের মতো। পরীক্ষার হলে সব পরীক্ষার্থীকে উত্তর লেখার স্বাধীনতা দেওয়া হয়। কেউ প্রশ্নের উত্তর ভুল লেখলেও তাকে লিখতে বাঁধা দেওয়া হয় না। তার বসার আসন ফিরিয়ে নেওয়া হয় না। পরীক্ষকরা তার সঙ্গে সদাচারণ করেন। অনুরূপভাবে দুনিয়াতে কেউ আল্লাহকে অবিশ্বাস করলে, আল্লাহর অবাধ্য হলে আল্লাহ দুনিয়ার জীবন তার জন্য সঙ্কীর্ণ করে দেন না। তাকে তার ইচ্ছামতো জীবন-যাপনের অবাধ সুযোগ করে দেন। সুতরাং এটা দেখে ঘাবাড়ানোর কিছু নেই। এসব নিয়ে মনে অবান্তর প্রশ্নের জায়গা দেওয়ারও কিছু। এমন প্রশ্ন মূলতঃ শয়তানের প্ররোচণা থেকে আসে। যা থেকে বেঁচে থাকা প্রতোক মুসলমানের কর্তব্য।
    Total Reply(0) Reply
  • আখতার হাবিব ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:২৮ এএম says : 0
    অবিশ্বাসীদের চাকচিক্যময় ও বিলাসী জীবন যেন মুসলমানদের প্রতারিত না করে এবং দুনিয়ার সম্পদের আশায় তারা যেন ঈমানকে না হারায় সেদিকে কঠোর দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।
    Total Reply(0) Reply
  • আবু সালেহ মোহাম্মাদুল্লাহ ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:৪৭ পিএম says : 0
    আমরা কি এমন সুন্দর একটা জীবন কামনা করতে পারি না। আমরা কি পরকালের সফলতাকে আমাদের জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে পারি না। আসলে সমাজ যেদিকেই যাক, যে যাই বলুক, আমার চেষ্টা থাকবেÑ আমার আখেরাত যেন সুন্দর হয়। আমার আল্লাহ যেন আমার উপর নারায না হন, তিনি যেন আমার উপর সন্তুষ্ট হয়ে যান। তবেই আমাদের জীবন সুন্দর হবে, আমি সফল হব। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে এমন সুন্দর একটি জীবন অর্জন করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
    Total Reply(0) Reply
  • তুষার ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:৪০ পিএম says : 0
    একদম খাটি কথা বলেছেন হুজুর
    Total Reply(0) Reply
  • Kawser Ahammed ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:৫২ পিএম says : 0
    যার জীবনের লক্ষ্য আখেরাতের সফলতা তার জীবন কত সুন্দর! কত ঈর্ষণীয়! কত সাফল্যমণ্ডিত!
    Total Reply(0) Reply
  • Md Rasel ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:৫৩ পিএম says : 0
    লক্ষ্য যার আখেরাত, সে আপন গন্তব্য ও লক্ষ্যপানে ছুটে চলে দুর্বার; সকল প্রতিকুলতা ও লোভ লালসাকে পিছে ঠেলে।
    Total Reply(0) Reply
  • Habib Rahman ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:৫৫ পিএম says : 0
    আল্লাহর কাছে এ জীবনের মূল্য একেবারেই তুচ্ছ। যে মানুষ দুনিয়াতে ভালো কাজ করবে, সে আখেরাতে এর উত্তম প্রতিদান পাবে। আর যে মন্দ কাজ করবে সে তার আমল অনুযায়ী প্রতিদান পেয়ে যাবে। শুধু তা-ই নয়, মুমিন মুসলমান ভালো কাজের মাধ্যমে দুনিয়াতে লাভ করে স্বচ্ছ ও সুন্দর জীবন আর আখেরাতের সফলতা তার জন্য সুনিশ্চিত।
    Total Reply(0) Reply
  • Heron OR Rashid ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮, ২:৫৬ পিএম says : 0
    মানুষের প্রকৃত সফলতা কিন্তু দুনিয়ার কর্মের ভিত্তিতেই নিরূপণ করা হবে। দুনিয়ার কর্মের ভিত্তিতেই যে চূড়ান্ত সফলতা অর্জিত হবে তার নাম জান্নাত আর ব্যর্থতার পরিণাম জাহান্নাম। দুনিয়ার জীবন যেহেতু ক্ষণস্থায়ী, তাই এর সফলতাও ক্ষণস্থায়ী। প্রকৃত সফলতা হচ্ছে আখেরাতের সফলতা।
    Total Reply(0) Reply
  • তুহিন ১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১১:৫৩ পিএম says : 0
    আখেরাতের থাকার পরও নরপশুরা যে ধরনের অপকর্ম করে আর যদি না থাকতো তাহলে তো নিরীহ মানুষের বেচে থাকাই দুর্বিসহ হতো। আল্লাহ তায়ালা যা করেন তাহাই মানুষের মঙ্গলের জন্যে করে।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ