Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১ হিজরী
শিরোনাম

আউলিয়া জগতের সম্রাট-হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাহ:)

গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির | প্রকাশের সময় : ১০ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

হযরত আব্দুল কাদের জিলানী (রাহ:) এর ওফাত বার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ গুরুত্বের সাথে “ফাতিহায়ে ইয়াজদাহম”পালিত হয়। গাউছে পাক (রাহ:) সময় কালে ইসলাম ও মুসলিম বিশ্বে বাহ্যিক ভাবে ইসলামী সাম্রাজ্য সুদূর স্পেন থেকে ভারত বর্ষ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সাম্রাজ্যের ভেতরের অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। তখন মুসলমানদের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও চারিত্রিক সহ সর্বক্ষেত্রে ছিল এক নৈরাজ্যকর অবস্থা। এমনি এক যুগ সন্ধিক্ষনে হযরত বড়পীর (রাহ:) আল্লাহ প্রদত্ত রুহানী ও ইলমী শক্তি বলে ইসলামের জটিল ও কঠিন ইসলামী তথ্য ও তাত্ত্বিক সমাধান কল্পে সর্বদা নিজেকে নিয়োজিত করেন। পবিত্র কোরআন-হাদীসের অমূল্য বানীর সঠিক ব্যাখ্যা জনসম্মুখে তুলে ধরেন। তার অপরিসীম জ্ঞানের পরিধি, অকাট্য যুক্তি, ভাষার লালিত্য, বাগ্মিতা, গতিময় বাচন ভঙ্গির মাধ্যমে অধ:পতিত মানব সমাজকে তিনি ইসলামের আদর্শে আলোকিত করেন। আবদুল কাদের জিলানী (রাহ:) তাঁর জীবনব্যাপী কঠোর ইবাদত বন্দেগীর মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করেন। তিনি প্রত্যেক রাতে দু’শ রাকাত নফল নামাজ আদায় করতেন,প্রতি রাকাতে সুরা রহমান বা মোজাম্মেল কখনো সুরা এখলাস পড়তেন অথবা সারারাত কোরআন পাঠে অতিবাহিত করতেন। সর্বক্ষন অজু অবস্থায় থাকতেন। নীরব থাকতেই তিনি অধিক পছন্দ করতেন। পার্থিব ধন সম্পদের প্রতি তার কোন লোভ ছিল না। স্ত্রী-পুত্র,পরিজন ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করতে পারেনি। আবু ছালেহ মুছা জংগীর ঔরসে ও মাতা ফাতেমা উম্মূল খায়ের বিনতে আব্দুল্লাহর গর্ভে হযরত বড়পীর (রাহ:) ’র জন্ম। তাঁর জন্ম ও সাল তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে, হযরত শেখ আবদুল ফজল আহমদ ইবনে সাহেল জিলানী হাম্বলী (রহ:) এর মতে তিনি ৪৭১ হিজরী পারস্যের জিলান প্রদেশে জন্ম গ্রহন করেন। হযরত শাহ আবদুল মাআলী ”তোফায়ে কাদেরীতে” তার জন্ম ৪৭০ হিজরী উল্লেখ্য করেন। অনুরূপ ভাবে তার জন্ম তারিখ কারো মতে ২৯ শাবান আবার কারো মতে ১ রমজান। আধ্যাত্মিক জগতের সম্রাট আব্দুল কাদের জিলানী (রাহ:) এর জীবনাদর্শ অন্যান্য খোদা প্রেমিকদের রূহানী সাধনার ক্ষেত্রে আদর্শ। অপর দিকে তিনি পিতা-মাতা উভয় দিক দিয়ে প্রিয় নবী (স:) এর বংশধর। হযরত এর অনেক উপাধী রয়েছে। যেমন- মহিউদ্দিন (দ্বীনকে পুণঃ জীবন দানকারী), গাউছুল আজম (বড় সাহায্যকারী) বাংলাদেশ সহ গোটা পাক ভারত উপমহাদেশে “গাউছুল আজম” ও হযরত বড় পীর” হিসাবেই বেশি পরিচিত। বাল্যকাল থেকেই তিনি ছিলেন গম্ভীর, সংযত ও ভাবুক প্রকৃতির।
মাতৃ গর্ভেই তিনি পবিত্র কোরআনের ১৮ পারা হেফ্্জ করেন। তিনি জীবনের কোন সময়ে কোন কারণে কোন বিষয়ে কোন ভাবেই মিথ্যার আশ্রয় নেননি। মাত্র ৫ বছর বয়সে তিনি পূর্ণ কোরআন শরীফ হেফ্জ করেন। প্রাথমিক বই পুস্তকগুলো তিনি গ্রাম্য মক্তবেই সমাপ্ত করেন। পরবর্তীতে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য তাঁর মায়ের অনুমতি ক্রমে তৎকালীন জ্ঞান বিজ্ঞানের সর্বশ্রেষ্ঠ স্থান বাগদাদ গমন করেন। পথিমধ্যে ডাকাত দলের আক্রমনে তার কাফেলা লুণ্ঠিত হলে শুধুমাত্র তারই সত্যবাদীতার গুনে সকলেই ডাকাতের কবল থেকে মুক্তি পান। শুধু কি তাই! সে চল্লিশ জন ডাকাতকে সঠিক পথের সন্ধান দেন। ফলে ডাকাতরা তওবা করে গাউছে পাক (রাহঃ) এর নিকট বায়াত গ্রহণ করে। গাউছে পাক একদিন স্বপ্নে দেখেন, একজন নূরানী ব্যক্তি বললেন, “হে মহিউদ্দিন! তুমি সতর্ক হও; ঘুম ও আরাম উপভোগ তোমার জন্য নয়। তোমার জন্য পৃথিবীতে অনেক কাজ রয়েছে। যা সম্পাদনের জন্য আল্লাহ পাক তোমাকে পাঠিয়েছেন। এরপর থেকে তিনি রাতের বেলায় আল্লাহ তায়ালার এবাদতে মশগুল থাকতেন এবং এশার অজু দিয়ে ফজরের নামাজ আদায় করতেন। তিনি বাগদাদে গিয়ে তৎকালীন জ্ঞানী-গুনীদের কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রভুত্ব জ্ঞান লাভ করেন। কোরআন, হাদীস, ফিকহ্, ধর্মতত্ত্ব, আরবী ব্যাকরণ, যুক্তিবিদ্যা, হেকিমী ইত্যাদি বিষয়ে তিনি গভীর পান্ডিত্য লাভ করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন কাজী আবু সাঈদ, মোবারক ইবনে আলী মুকাররমা, আবু ওয়াফা, আলী ইবনে আক্বীল, আবু গালেব আহমদ, আবুল কাশেম আলী, আবু যাকারিয়া, ইয়াহ ইয়া তিবরিজি প্রমুখ।
কঠোর রিয়াজত সাধনা শেষে তিনি ৫২১ হিজরীতে আবার জনসম্মূক্ষে আসেন। তিনি যে মহিউদ্দিন (দ্বীনকে পূর্ণঃ জীবন দানকারী) তা প্রমাণের সুযোগ এল। যখন মুসলমানদের রাজনৈতিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক তথা সকল স্তরেই পদস্থলন শুরু হয়। বিশেষতঃ ইহুদী-খ্রীষ্টানদের চক্রান্তে শিয়া, মু’তাযিলা, রাফিজী ও খারেজী মতবাদ ধর্মের ভিতকে নড়বড়ে করে তুলেছিল সে সময় হযরত গাউছে পাক (রাহঃ) মানুষের চিন্তা চেতনাকে, আল্লাহ ও রাসুল (দঃ) মুখী করার জন্য চেষ্টার পাশাপাশি শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন এবং ওয়াজ মাহফিলের মাধ্যমে মানুষের হেদায়তের কাজ আরম্ভ করেন। কিছু দিনের মধ্যেই তার ছাত্র ও শ্রোতার সংখ্যা এতই বৃদ্ধি পেল তৎকালীন বাগদাদের বড় মসজিদে লোকের সংকুলন না হওয়ায় খোলা মাঠে (ঈদগাহে) তার বক্তৃতার স্থান নির্ধারণ করা হয়। তার তেজোদীপ্ত জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য শুনার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে শিক্ষক, আলেম, সূফীর সমাগম হত। সবাই ছুটে আসতেন হযরত গাউছে পাক (রাহঃ) এর সুললিত ও সারগর্ভ আলোচনা শুনে মুগ্ধ হয়ে হাজার হাজার ইহুদী- খ্রীষ্টান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এভাবে গাউছে পাক (রাহঃ) বিধর্মীদের কে ইসলামের ছায়াতলে এবং মুসলমানদের ঈমানকে মজবুত করতে লাগলেন। এছাড়া গাউছে পাক (রাহঃ) এর অগণিত কারামত রয়েছে।
হযরত গাউছে পাক (রাহঃ) এর বক্তব্য সম্বলিত কয়েকটি মূল্যবান গ্রন্থ আজো মুসলিম সমাজের পাথেয় হিসেবে আলোক বিকিরণ করছে। যেমন- গুনীয়াতুত তালেবীন, ফতহুল গায়ব, ফতহুর রাব্বানী এবং তারই রচিত কাছিদায়ে “গাউছিয়া” এলমে মারেফতের অমূল্য সম্পদ।
গাউছে পাক (রাহঃ) এর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র মুসলমানদের জন্য অনুসরণীয়। তিনি বলেছেন, জীবনে একজন মুমিন ব্যক্তির জন্য তিনটি বিষয় খুবই প্রয়োজন। ১) সর্বাবস্থায় আল্লাহর আদেশ মেনে চলা। ২) আল্লাহর নিষিদ্ধ সকল বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখা। ৩) নিজের কাছে যা আছে তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা। তিনি আরো বলেছেন মৃত্যুর পর তোমার যে জীবন শুরু হবে একে মূলধন মনে কর, আর তোমার জাগতিক জীবনকে সে মূলধনের লাভ মনে কর। গাউছে পাকের পুরো জীবন ইসলামের জন্য উৎসর্গ করে গেছেন। ইহুদী-খ্রিষ্টান, রাফেজী, খারেজী, মুত্বাযিলা সহ সকল বাতিল সম্প্রদায়ের মুখোশ উম্মোচন করে ইসলামকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেন। আলা হযরত আহমদ রেজা খান বেরলভী (রহঃ) বলেন-“ তু হুসাইনূ হাসানী কেউ নাহ্ মহিউদ্দিন হো- আয় খিজরে মাজমা- এ বাহরাঈন চশমা তেরা” অর্থ- যেমনি ভাবে হযরত রাসূলে করীম (দঃ) আম্বিয়া কেরামের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী-তেমনি গাউছুল আজম (রাহঃ) আউলিয়ায়ে কেরামের মধ্যে শীর্ষ স্থানের অধিকারী। তিনি রূহানী জিন্দেগীর যে মৌল যোগসূত্রের সন্ধান দিয়ে গেছেন তা জাতি ধর্ম নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষকে হেদায়তের পথপ্রদর্শন করবে। দীর্ঘকাল ইসলামের খেদমত করে ৫৬১ হিজরী সনের ১১ রবিউস সানী হযরত বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রাহঃ) মাওলার সান্নিধ্য লাভে ইহ জগৎ ত্যাগ করেন। ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮,বুধবার এ মহান অলির ওফাত দিবস। জাগতিক মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ মহান সাধকের কর্ম জীবনের অবসান ঘটলেও তার আদর্শ পৃথিবীর প্রলয় পর্যন্ত অম্লান থাকবে। বাগদাদ শহরে হযরত বড়পীর (রাহঃ) এর মাজার শরীফ অবস্থিত।



 

Show all comments
  • মুহাম্মদ জিল্লুর রহমান ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ৫:৩৫ এএম says : 0
    আল্লাহ গউছে পাক রহঃ এর দরজা অনেক অনেক গুন বুলুন্ধ করে দেন এবং তাঁর রূহানী ফয়েজ সর্বদা আমাদের উপর জারি রাখুন। আমিন।
    Total Reply(0) Reply
  • ইখলাস ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ৯:০৮ পিএম says : 0
    বড়পীর হুজুরের মহান রচনা সিররুল আসরার পাঠ করার জন্য মুসলমান সকলকে সবিনয়ে অনুরোধ করছি।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

১০ অক্টোবর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন