Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০১৯, ০৬ মাঘ ১৪২৫, ১২ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

ডেমরায় দুই শিশু খুন ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে হত্যা

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে দুই শিশুকে বাসায় ডেকে নিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা চালায় গোলাম মোস্তফা (৩০) ও আজিজুল বাওয়ানী (২৮)। ওই সময় শিশু দুটি চিৎকার করলে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে দু’জনকেই গলা টিপে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে তারা। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টায় রাজধানীর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ওয়ারী বিভাগের ডিসি মো. ফরিদ উদ্দিন এসব কথা বলেন। এদিকে হত্যাকান্ডের কথা স্বীকার করে গতকাল আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে মোস্তফা ও বাওয়ানী। পরে তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় আদালত। অন্যদিকে, ডেমরায় দুই শিশু হত্যার ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন।
ফরিদ উদ্দিন বলেন, শিশু দুটি নিখোঁজের পরে অনেক খোঁজখুঁজি করেও না পেয়ে এলাকায় মাইকিং করা হয়। পরে সন্ধ্যার দিকে মোস্তফার স্ত্রী গার্মেন্ট থেকে বাসায় ফিরলে স্বামীর আচরণ ও কথাবার্তায় অসংলগ্নতা পায়। তখন তিনি মেঝেতে শিশু দুটির স্যান্ডেল পড়ে থাকতে দেখেন। এ বিষয়ে মোস্তাফাকে জিজ্ঞাসা করলে তাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে উত্তেজনা শুরু হয়। বিষয়টি টের পেয়ে প্রতিবেশীরা পুলিশে খবর দিলে মোস্তফা পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে রাতে মোস্তফার বাসায় খাটের নিচ থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার পরে ঘাতকরা পালিয়ে গেলে তাদের তাৎক্ষণিক তাদের ধরা সম্ভব হয়নি। পরে মঙ্গলবার রাতে যাত্রাবাড়ীর ভাঙ্গা প্রেস এলাকা থেকে মোস্তফাকে এবং তার দেয়া তথ্যে ডেমরার কাউন্সিল ব্রিজ এলাকা থেকে আজিজুলকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেয়া তথ্যমতে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত গামছা, শিশুদের দুই জোড়া স্যান্ডেল ও লিপিস্টক উদ্ধার করে পুলিশ।
পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, তারা পুলিশের কাছে স্বীকার করে যে- লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নাম করে শিশু দুটিকে প্রথমে বাসায় ডেকে আনা হয়। এরপর ঘরে উচ্চস্বরে ক্যাসেট প্লেয়ার চালু করে শিশু দুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়। এ সময় শিশু দুটি ভয় পেয়ে চিৎকার করলে প্রথমে দোলাকে গলা টিপে হত্যা করে আজিজুল। পরে নুসরাতের গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে মোস্তফা। হত্যার পরপরই আজিজুল পালিয়ে যায় এবং মোস্তফা দুই শিশুর লাশ খাটের নিচে লুকিয়ে রেখে বাসায় অবস্থান করতে থাকে।
হত্যার ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত কিনা এমন প্রশ্নে ফরিদ উদ্দিন বলেন, ঘটনার আগে মোস্তফা মোবাইল ফোনে আজিজুলকে তার বাসায় ডেকে আনে। এ কারণে তাদের পূর্ব পরিকল্পনা থাকার বিষয়টি ধারণা করা যায়। এছাড়া ঘটনার পর তাদের আচরণে মুক্তিপণের জন্য এমন হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল। যদিও সেটির প্রমাণ মেলেনি। মোস্তফা ও আজিজুল মামাতো-ফুফাতো ভাই। তাদের নামে যাত্রাবাড়ী থানায় ডাকাতির মামলাও আছে।
শিশুদের কেন টার্গেট করা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি বিকৃত মানসিকতা থেকে হচ্ছে। তাছাড়া মাদকাসক্তি বড় কারণ। তিনি বলেন, তারা দু’জনে মাদকাসক্ত ছিল। ঘটনার আগে তারা ইয়াবা সেবন করে। এছাড়া যেসব জায়গায় এমন ঘটনা ঘটছে সেখানে অভিভাবকরা একটু কম সচেতন। দারিদ্রতার কারণে পরিবারের সদস্যরা বাইরে কাজে থাকার সুযোগে মানসিক বিকারগ্রস্ত লোকের এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে।
স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি: আদালত সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডেমরা থানার এসআই শাহ আলম আসামিদের ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের আবেদন করেন। পরে মহানগর হাকিম জসিম উদ্দিন আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং তাদেরকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট থানার সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) লিয়াকত আলী এ তথ্য জানান।
মানবাধিকার কমিশনের তদন্ত কমিটি গঠন: ডেমরায় দুই শিশু হত্যার ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। গতকাল এই কমিটি গঠন করা হয়। কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল মাহমুদ সাইদুল কবীরকে প্রধান করে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন উপপরিচালক সুস্মিতা পাইক ও এম রবিউল ইসলাম।
উল্লেখ্য, গত সোমবার দুপুর ২টার দিকে ডেমরার কোনাপাড়া এলাকা থেকে নুসরাত জাহান (৪) ও ফারিয়া আক্তার দোলা (৫) নামে দুই শিশু নিখোঁজ হয়। ওইদিন রাত ৯টার দিকে ডেমরার কোনাপাড়ার হযরত শাহজালাল রোডের নাসিমা ভিলার নিচতলার একটি কক্ষ থেকে শিশু দুটির লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় দোলার বাবা বাদী হয়ে মোস্তফা ও আজিজুলকে আসামী করে ডেমরা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে ওইদিন মধ্য রাতেই তাদের দু’জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
নিহত নুসরাত ঝালকাঠির গজনী থানার ভাউকাঠি গ্রামের মো. পলাশ মিয়ার মেয়ে। আর দোলা পটুয়াখালী জেলার দশমিনা এলাকার আলীপুরা গ্রামের মো. ফরিদুল ইসলামের মেয়ে। শিশু দুটি পরিবারের সাথে শাহ জালাল রোডে টিনশেড ও পাকা ভবনের দুটি পৃথক বাসায় থাকতো।
নিহত শিশু দুটির পরিবার জানায়, চলতি মাসে শিশু দুটিকে কোনাপাড়া আইডিয়াল স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি করানো হয়। ঘটনার দিনই তারা প্রথমবারের মতো নতুন ড্রেস পরে স্কুলে যায়। দুপুরে নতুন বই নিয়ে তারা বাসায় ফিরে এসে অনেক খুশি হয়েছিল। পরে এক সঙ্গে বাসার বাইরে খেলতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ