Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ১৮ জুলাই ২০১৯, ০৩ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৪ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

শিশুর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে

’১৮ সালে ধর্ষণের শিকার ৬০০, খুন ৪০০ চলতি বছরের প্রথম ১০ দিনে চার খুন

আবদুল্লাহ আল মামুন | প্রকাশের সময় : ১১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

চার বছরের নুসরাত আর পাঁচ বছরের ছোট্ট দোলা। এ বছরই তাদেরকে স্থানীয় একটি স্কুলে নার্সারিতে ভর্তি করিয়ে দেয় পরিবার। প্রথম দিন যথারীতি স্কুলে যায় তারা। দুপুরে নতুন বই নিয়ে স্কুল থেকে আনন্দে বাড়ি ফিরে আসে শিশু দুটি। সন্তানের এমন আনন্দে আবেগাপ্লুত হয়ে পরে দুই পরিবারসহ স্বজনরা। আর্থিক অবস্থা যতোই খারাপ হোক সন্তানদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে এতটুকু কমতি ছিল না খেটে খাওয়া পরিবার দুটির। তাদের প্রত্যাশা ছিল, একদিন অনেক বড় হবে তাদের সন্তানরা। পড়াশুনা শেষে প্রকৃত মানুষ হয়ে কাজ করবে দেশ ও জাতির কল্যাণে।
কিন্তু হঠাৎ করে পরিবার দুটির স্বপ্নকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে দেয় মস্তিস্কবিকৃত মানুষরূপী দুই অমানুষ। বিকৃত মানসিকতার এই দুই পাষন্ডের যৌন লালসা থেকে মুক্তি মেলেনি এতটুকুন দুটি শিশুর। লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাসায় ডেকে নিয়ে যায় শিশু দুটিকে। পরে যৌন লালসা চরিতার্থ করতে গেলে চিৎকার করে ওঠে অবুঝ শিশু দুটি। তখনই ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে গলা টিপে ধরে ও গলায় গামছা পেচিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে শিশু দুটিকে। গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর ডেমরায় এমন নির্মম বর্বরতার শিকার হয় নুসরাত জাহান (৪) ও ফারিয়া আক্তার দোলা (৫)। কোনাপাড়ার হযরত শাহজালাল রোডের নাসিমা ভিলার নিচতলার একটি কক্ষ থেকে উদ্ধার করা শিশু দুটির নিথর লাশ। ঘটনার পর অভিযুক্ত গোলাম মোস্তফা ও আজিজুলকে পুলিশ গ্রেফতার করলে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় দুই বছররের এক কন্যাশিশুকে ধর্ষণের চেষ্টার পর তিনতল ভবন থেকে ফেলে দিয়ে হত্যা করে নাহিদ (৪৫) নামের এক মাদকসেবী। খিচুরি খাওয়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে নিজের ফ্ল্যাটে নিয়ে শিশুটিকে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত নাহিদের সপ্তম শ্রেণিতে পড়–য়া গত মঙ্গলবার বাবার কুকর্মের বিরুদ্ধে আদালতে স্বাক্ষ্য দেয়।
শিশুর প্রতি নির্যাতন ও ধর্ষণের এটি কোন খন্ড চিত্র নয়। রাজধানীসহ সারাদেশে ভয়ঙ্করভাবে বেড়ে গেছে শিশু নির্যাতন ও শিশুর প্রতি সহিংসতা। চলতি বছর শুরু হওয়ার পর গত ১০ দিনে রাজধানীসহ সারাদেশে শিশুর প্রতি সহিংসতার অন্তত ১০টি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় অন্তুত চারজনকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয়েছে।
মানবাধিকার ও শিশু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানসিক বিকৃতি, নারীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমে যাওয়া, সামাজিক ও নৈতিক অধঃপতন, মাদকাসক্তি ও বিচারহীনতার কারণে শিশুদের প্রতি নির্যাতন ও সহিংসতার ঘটনা দিন দিন বেড়ে চলছে। এছাড়া ক্ষমতার লোভ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, ব্যক্তিগত ও সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ¦ এবং দারিদ্রতার কারণে অসহায় ও গরীব পরিবারের শিশুরা বেশি ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয় ৫৬৩ শিশু। এ সময় গণধর্ষণের শিকার হয় ৯৩, প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষণ ২৬টি, ধর্ষণের চেষ্টা করা হয় ৯২ জনকে। ধর্ষণের পর হত্যা ৫৭, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা ৬। এ সময়ে মোট হত্যার শিকার হয় ৩৯৬ শিশু। কিডন্যাপ করা হয় ১৪৬, কিডন্যাপের পরে উদ্ধার ১৩৫, কিডন্যাপের পরে হত্যা ২৮। নিখোঁজ হয় ২৩৩, নিখোঁজের পর মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় ৫১। পাচারের পর উদ্ধার ৩২, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় ৫৯৬, পানিতে ডুবে মারা যায় ৫৯৯, বজ্রপাতে মৃত্যু ৮০, মারধরের শিকার ১৩২, চিকিৎসা অবহেলায় মৃত্যু ৩০, বাল্য বিয়ের শিকার ৩৮, বাল্য বিবাহ থেকে উদ্ধার ১৩৪। এছাড়া অন্যান্য দুর্ঘটনায় ১৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়।
শিশু অধিকার ফোরামের আরেকটি তথ্যে দেখা যায়, ’১৮ সালের জুলাই থেকে ২০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে ২১৮টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। এ সময়ে ১৯৯ শিশুকে হত্যা করা হয়। এই ৬ মাসে অপহরণের শিকার হয় ৬৭ জন। আর নিখোঁজ হয় ৮৭ শিশু। নিখোঁজের পর মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ২২ জনকে। এছাড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০ ও পিতা-মাতার হাতে ২১ শিশু নির্যাতের শিকার হয়।
একইভাবে ২০১৭ সালে ধর্ষণের শিকার হয় ৫৯৩ শিশু যা ২০১৬ সালে ছিল ৪৪৬। এক বছরের ব্যবধানে শিশু ধর্ষণের হার বেড়ে যায় শতকরা ৩৩ ভাগ। এছাড়া ২০১৬ সালে সারাদেশে হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনের শিকার হয় ৩ হাজার ৫৮৯ শিশু। ২০১৫ সালেছিল ৫ হাজার ২১২টি। এছাড়া ২০১৪ সালে ২ হাজার ৪৫১টি শিশু হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধরণের নির্যাতনের শিকার হয়। নির্যাতনের শিকার হওয়া এসব শিশুদের মধ্যে কন্যাশিশুর সংখ্যা বেশি হলেও ছেলে শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না নির্যাতনকারীদের হাত থেকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ. স. ম আমানুল্লাহ দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, অনেকে শিশু গৃহকর্মীদের মানুষ মনে করতে চায় না। তাদের সঙ্গে দাসের মতো আচরণ করে। শিশুদের মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন, সামাজিক মূল্যবোধের উন্নয়ন ও নির্যাতনকারীদের আইনের আওতায় এনে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অবস্থার উত্তরণ সম্ভব।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আবদুস সহিদ মাহমুদ শিশুদের ওপর নির্যাতনের জন্য সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের মধ্যকার অসুস্থ প্রতিযোগিতাকে দায়ী করেছেন। তিনি দৈনিক ইনকিলাবকে বলেন, আইনের প্রয়োগ, বাবা-মা ও পরিবার এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে শিশু নির্যাতন হ্রাস পাবে। নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত সমন্বয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে বিচারকার্য সম্পন্ন ও অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সম্ভব হবে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মানবাধিকার কর্মী নূর খান বলেন, সমাজিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিশু নির্যাতন বাড়ে। এছাড়া বিচারহীনতার সংস্কৃতি বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশু নির্যাতনসহ সব ধরণের অপরাধ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক তাদেরকে যথাযথভাবে আইনেরে আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে একইভাবে জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে শিশু নির্যাতন কমানো সম্ভব হবে।
পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, সব ধরনের অপরাধ দমনে পুলিশ সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করছে। কোনো অপরাধ সংঘটনের সাথে সাথেই ঘটনার রহস্য উদঘাটনসহ অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শিশু


আরও
আরও পড়ুন