Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৭ মাঘ ১৪২৫, ১৩ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১২ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ২০১৮ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। প্রতিবেদনে বলা হয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের ক্ষেত্রে বিগত বছরগুলোর অগ্রগতির ধারা ২০১৮ সালে অব্যাহত ছিল। তবে মানবাধিকারের আরেকটি সূচক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন ৪৬৬ জন, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। প্রতিবেদনে পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গত বছর ধর্ষণ ও গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৭৩২ জন। হত্যার শিকার হয়েছে ৬৩ জন, ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে ৭ জন। শিশু নির্যাতন হয়েছে ১০১১টি। এছাড়া মতপ্রকাশের অধিকারের ক্ষেত্রেও গত বছরের চিত্র হতাশাজনক ছিল। সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের ব্যাপক সমালোচনার মধ্যেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ পাস হয়। সাংবাদিকদের জন্য বছরটি ছিল নিপীড়নের। গত বছর তিনজন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হন। আসকের পক্ষ থেকে বলা হয়, বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড গত বছর অনেক বেশি হয়েছে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করে ঘটনাগুলো কেন ঘটেছে এবং কারা এর জন্য দায়ী, তা তদন্ত করে খুঁজে বের করতে হবে। এছাড়া গুম বা নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের জরুরি ভিত্তিতে খুঁজে বের করা এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সনদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স-এ বাংলাদেশকে অনুস্বাক্ষর করার তাকিদ সংগঠনটির পক্ষ থেকে তাকিদ দেয়া হয়েছে।
দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে বিগত বছরগুলোতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থা বরাবরই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তবে এক্ষেত্রে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। বরং দিন দিন অবনতি ঘটছে। সার্বিকভাবে মানবাধিকার সূচকের অবনতি একটি দেশের মানুষের নিরাপত্তাহীনতাকেই তুলে ধরে। তারা একটি ভয় ও ভীতিকর পরিবেশে বসবাস করছে, এমন ধারণাই দেয়। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভয়, ভীতি এবং আতঙ্ক নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা যায় না। মানুষ যদি নিরাপদে এবং স্বাধীনভাবে বসবাস করতে না পারে তবে তার কাজের স্পৃহা কমে যায়। এর প্রভাব দেশের উন্নতি এবং অগ্রগতিতে পড়ে। আসক-এর প্রতিবেদনে মানবাধিকার পরিস্থিতির যে নেতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে, তা সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চারিত করবে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। আবার এ চিত্র অস্বীকার বা এড়িয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নাই। কারণ সাধারণ মানুষ এখন যে কোনো ঘটনাই দ্রুত জেনে যায় এবং তা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবেদনের পরিসংখ্যানের বাইরেও যে আরও অনেক খুন-খারাবি, ধর্ষণ, নিপীড়ন-নির্যাতন হয় এবং তা আড়ালে থেকে যায়, তাও অস্বীকার করা যায় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়াও সামাজিক, পারিবারিক এবং ব্যক্তি দ্ব›েদ্বও মানুষ খুনের শিকার হচ্ছে। তবে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক তুলে নিয়ে যাওয়া এবং বিচারবর্হিভূত খুনের ঘটনা ঘটে, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতিটা অনেক বেশি কাজ করে। যে বাহিনীর দায়িত্ব মানুষের নিরাপত্তা বিধান করা, তার হাতে খুন, গুমের শিকার হলে মানুষের আর যাওয়ার কোনো জায়গা থাকে না। এমন ঘটনাও অহরহ ঘটছে যে দুর্বৃত্ত শ্রেণী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নামে মানুষকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। অনেকের লাশ রাস্তার পাশে কিংবা নদীতে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। এসব লাশের পরিচয়ও পাওয়া যায় না। গতকালই একটি দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বুড়িগঙ্গা থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ের দুই তরুণের লাশ পুলিশ উদ্ধার করেছে। কয়েক মাস আগেও বুড়িগঙ্গা থেকে এক ছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়। রূপগঞ্জের রাস্তার পাশ থেকে দুই অজ্ঞাত পরিচয় যুবকের লাশ পাওয়া যায়। মানুষ হত্যা করে যখন নদী ও রাস্তা-ঘাটে ফেলে রাখা হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা কাজ করা স্বাভাবিক। এ ধরনের ঘটনা কোনো দেশের সুষ্ঠু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিংবা নিরাপদ মানবাধিকারের পরিচয় বহন করে না। তার উপর যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কর্তৃক তুলে নিয়ে যাওয়া ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের মতো ঘটনা ঘটে, তবে তা দেশের বিচার ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অপরাধীরাও উৎসাহী হয়ে ওঠে। এ ধরনের ঘটনার প্রভাব পরিবার, সমাজ থেকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন ক্ষেত্রে পড়ে এবং ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা কোনোভাবেই কল্যাণকর রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করে না।
আমরা অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতি নিয়ে গর্ব করছি। এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের কথা বলছি। অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের উন্নতি এবং অচিরেই দক্ষিণ এশিয়ার উন্নত দেশে পরিণত হবো বলে আশা করছি। দেশের অর্থনৈতিক এই উন্নতি এবং সমৃদ্ধি নিঃসন্দেহে গর্বের। তবে দেশের মানবাধিকারের সূচকটি যদি তলানিতে পড়ে থাকে, তাহলে এ উন্নতির কি কোনো মূল্য থাকে? অর্থনৈতিক এই উন্নতি কার জন্য? মানুষই যদি নিরাপদ না থাকে বা নিরাপদবোধ না করে, তবে এ উন্নতি দিয়ে কি হবে? বলা বাহুল্য, পরিবার ও সমাজে নিরাপদ পরিবেশ এবং মানুষের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করতে না পারলে, যত উন্নতিই করা হোক না কেন, তা অর্থহীন হয়ে পড়তে বাধ্য। আমরা বিগত প্রায় এক দশক ধরে দেশে আইনের শাসন, সুশাসন, গণতন্ত্রের ঘাটতির কথা শুনছি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন সংস্থা এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। নাগরিক সমাজও এসব ঘাটতির কথা বলেছে। দুঃখের বিষয়, এ বিষয়গুলোর দিকে সরকার যথাযথ মনোযোগ দিয়েছে বলে প্রতীয়মাণ হচ্ছে না। সরকার অর্থনৈতিক উন্নতি ও অগ্রগতির বিষয়টি বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। এ নিয়ে কারো দ্বিমত নেই। সমস্যা হচ্ছে, এ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিকে টেকসই করতে যে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিটিকেও দৃঢ় করতে হয়, এ দিকটি সরকার খুব একটা আমলে নিচ্ছে না। আমরা আশা করব, নতুন সরকার এ দিকে গভীর মনোযোগ দেবে। দেশের মানবাধিকার, সুশাসন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় অধিক মনোনিবেশ করবে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, মানুষের কল্যাণের জন্যই রাষ্ট্র। মানুষ যদি নিরাপদে জীবনযাপন করতে না পারে কিংবা নিরাপত্তার অভাব বোধ করে, তবে তা কল্যাণকর রাষ্ট্র হিসেবে পরিগণিত হতে পারে না। কাজেই সবার আগে আমাদের মানবাধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। সুশাসন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার অধিক গুরুত্ব দেবে বলে আমরা আশা করি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ