Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ১৮ জুন ২০১৯, ৪ আষাঢ় ১৪২৬, ১৪ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

দীর্ঘ ৯ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি

বিদ্যালয়ে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ

হাসান সোহেল | প্রকাশের সময় : ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

শিশুদের মেধা ও মানসিক বিকাশ নিশ্চিতকরণে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে ও হাসপাতালে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রতিশ্রুতি প্রদানের পর দীর্ঘ ৯ বছর অতিবাহিত হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। দেশের কয়েকটি হাসপাতালে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ দেয়া হলেও কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অপরদিকে একাডেমিক শিক্ষা নিয়ে অনেক মনোবিজ্ঞানী চাকরি ও প্রশিক্ষণের অভাবে অকালে ঝড়ে পড়ছেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের ২ আগষ্ট নবম সংসদ চলাকালীন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেননের এক প্রশ্নোত্তর পর্বে দেশে প্রতিটি বিদ্যালয় ও হাসপাতালে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের বিষয়টি উত্থাপন করেন। ওই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রতিটি বিদ্যালয় ও হাসপাতালে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। কিন্তু দীর্ঘ ৯ বছর অতিবাহিত হলেও সংশ্লিষ্টদের অবহেলায় প্রধানমন্ত্রীর ওই প্রতিশ্রুতি দীর্ঘদিনেও আলোর মুখ দেখেনি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রণীত এক আঞ্চলিক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের শতকরা ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশু মানসিক রোগে ভুগছে। অন্যদিকে জাতীয় পর্যায়ের একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, হতাশা ও উগ্ধিগ্নতায় যথক্রমে আক্রান্ত রয়েছে দেশের ৪ দশমিক ৫ ও ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ।
মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, বিষয়টি ন্যাশনাল স্ট্রাটিজিক প্লানে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের জন্য ‘ন্যাশনাল প্লান ফর মেনটাল হেলথ এ্যান্ড সাইকোলজিক্যাল সোসাল সাপোর্ট’ শীর্ষক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত এ সংক্রন্ত একটি কমিটি ইতিমধ্যে একাধিক সভা করেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় মাঝে কিছুটা সময় কার্যক্রম স্থগীত ছিল। তিনি বলেন, এ কাজ বাস্তবায়ন করতে একাধিক মন্ত্রনালয়ের সমন্বয় প্রয়োজন। তাই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে শিগগিরি মাল্টি মিনিস্ট্রিয়াল সভার আয়োজন করা হবে। পাশাপাশি এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর দেড় থেকে দুই হাজার মনোবিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছে। অথচ পেশায় টিকে থাকছে ৫০ জনের মতো। ব্যবহারিক জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধির ক্ষেত্র না থাকায় ও কর্মক্ষেত্র তৈরি না হওয়ায় লেখা-পড়ার পাঠ চুকিয়ে প্রতিবছর বেশরভাগ মনোবিজ্ঞানী ঝড়ে পড়ছে। বর্তমানে সব বিভাগ মিলে ৩০ হাজারের উপরে মনোবিজ্ঞানী রয়েছে।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞানী সমিতির সভাপতি প্রফেসর মাহমুদুর রহমান বলেন, একাডেমিক শিক্ষা নেয়ার পর প্রাকটিক্যাল জ্ঞানের পরিবেশ না থাকায় এবং চাকরি না পেয়ে প্রতিবছর শতকরা ৯৮ভাগ মনোবিজ্ঞানী ঝড়ে পড়ছে। এদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনতে হলে সমিতির সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করা যেতে পারে। এজন্য বাজেট প্রণয়নও করতে হবে।
অতি সম্প্রতি ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারের মৃত্যুর বিষয়টি বসার নজরে আসে। অরিত্রীকে নকলের দায়ের অভিযুক্ত করা হয়েছে। আর শিক্ষকেরা বাবা-মাকে অপমান করায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় অরিত্রী। এই বিদ্যালয়ে একজন শিশু মনোবিজ্ঞানী থাকলে অরিত্রীকে তাঁর কাছে পাঠানো যেতো। শুধু অরিত্রী অধিকারীই নয়, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত অনেক শিশুই পড়াশুনার চাপে কিংবা খারাপ ফলাফলের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। পরীক্ষার রেজাল্ট খারাপ করায় মায়ের বকুনি খেয়ে গত ২০১৬ সালে কার্তিকপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রী গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে।
প্রফেসর ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, আমরা এমনভাবে এ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছি, যাতে করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। তিনি বলেন, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একজন মনোবিজ্ঞানী একজন শেয়ারিং পার্সন হিসেবে থাকবেন। যাতে করে পারিবারিক বা সামাজিক বা যেকোন সমস্যা নিয়ে শিক্ষার্থী তার সংগে আলোচনা করে সমাধান খুজে পান।
জানা গেছে, ওই প্রতিশ্রুতির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা শিশু হাসপাতাল ছাড়াও দেশের ১৫টি সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র চালু করা হয়। সেখানে একজন শিশু মনোবিজ্ঞানীও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সবগুলো হাসপাতালে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়। অন্যদিকে বিদ্যালয়ে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাভূক্ত হওয়ায় বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে অবহিত করা হয়।
দেশের বিদ্যালয়গুলোতে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাউন্সিল শাখা থেকে জানানো হয়, বিদ্যালয়ে শিশু মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ সংক্রান্ত প্রধানমন্ত্রীর দেয়া প্রতিশ্রুতির কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক (বেসরকারি) বিভাগের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ বলেন, দেশের কোনো বিদ্যালয়ে শিশু মনোবিজ্ঞানী নেই। তবে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: শিশু


আরও
আরও পড়ুন