Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২০ জানুয়ারি ২০১৯, ০৭ মাঘ ১৪২৫, ১৩ জামাদিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী

নারী শিক্ষা নিয়ে আল্লামা শফীর নতুন বক্তব্য

তিনি ইসলাম জানেন বলে মনে হচ্ছে না : অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

‘আপনাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে দেবেন না। ---ক্লাস ফোর বা ফাইভ পর্যন্ত পড়াতে পারেন। --- পত্রপত্রিকায় দেখছেন ক্লাস এইট, নাইন টেন, বিএ, এমএ পর্যন্ত পড়ালে মেয়ে আপনার আর থাকবে না, অন্য কেহ নিয়ে যাবে’ হেফাজতের আমীর আল্লামা আহমদ শফীর এই বক্তব্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করছেন বিভিন্ন পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষ। সাড়ে দশ কোটি ভোটারের দেশে অর্ধেক নারী ভোটার; সেখানে তার এই বক্তব্য ব্যপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে।
১৩ দফা দানি নিয়ে শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশ করে দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি পাওয়া আল্লামা শফী এর আগেও মেয়েদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে বিতর্কের ঝড় তুলেছিলেন। ওই সময় তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও নারী নেত্রীদের তোপের মুখে পড়েন। কিন্তু পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগের সঙ্গে দেনা-পাওনার সম্পর্ক গড়ে তোলায় এনজিও’র নারী নেত্রী ও ক্ষমতার সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা তাঁর ব্যারো এতোদিন নীরব থাকেন। এমনকি নির্বাচনে ‘ভোটের হিসেবে’র কারণে নির্বাচনের সময় আল্লামা শফী সম্পর্কে কোনো কটূ মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার জন্য নারী নেত্রী, ক্ষমতাসীন দল ও ১৪ দলীয় জোটের শরীকদের সতর্ক করে দেয়া হয়। নারী শিক্ষা সর্ম্পকে হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর উক্তিতে বিভিন্ন মহলে তীব্র প্রতিবাদ উঠেছে। ইসলাম সর্ম্পকে আল্লামা শফীর অজ্ঞতা রয়েছে বলেও কেউ কেউ দাবী তুলছেন। শুক্রবার চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় এক মাহফিলে তিনি নারীদের ফোর-ফাইভ ক্লাসের বেশি না পড়াতে উপস্থিত মুসল্লিদের ওয়াদা করান। হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীর উপস্থিত মুসল্লীদের ওয়াদা করানোর প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সংখ্যাতিরিক্ত অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেছেন, ‘আল্লামা শফি ইসলাম জানেন বলে মনে হচ্ছে না। কারণ হাদীসে আছে, প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর জন্য জ্ঞান অর্জন ফরজ। হাদীসে বলা আছে, তলাবুল এলমে ফরিদাতুন আলা কুল্লি মুসলেমিন ওয়া মুসলেমাতিন। তিনি বলেন, ‘নবী (সা.) একদিন কিছু সাহাবিদের নিয়ে হাঁটছিলেন। এক সময় দেখলেন একজন ব্যক্তি নামাজে মশগুল। আরেক পর্যায়ে দেখলেন এক ব্যক্তি কিছু শিশুদেরকে পড়াচ্ছেন। এ দু’টি দৃশ্য দেখার পর নবী (সা.) সাহাবিদেরকে প্রশ্ন করলেন, কোন ব্যক্তি আল্লাহর কাছে প্রিয়। সাহাবিরা উত্তর দিলেন- যিনি নামাজ পড়ছেন, তিনি আল্লাহর কাছে প্রিয়। কিন্তু নবীজী উত্তর দিলেন, নামাজী মানুষ আল্লাহার কাছে প্রিয়, তবে প্রিয়তর সে ব্যক্তি যে জ্ঞান শিক্ষা দেয়।
হাদিসে আছে, নবীজী বলেছেন, জ্ঞান শিক্ষার জন্য সুদূর চীন দেশেও যেতে হবে। চীনে ইসলাম শিক্ষা দেয়া হতো না তখন, চীনে ধর্ম-সংস্কৃতি শিখানো হতো; কিন্তু নবীজী তা-ও শিখতে বলেছিলেন। অর্থাৎ ইসলাম মুসলমানদেরকে বিশে^র তাবৎ জ্ঞান রাজ্যে বিচরণের নির্দেশ দিয়েছে। বলা বাহুল্য, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা উচ্চতর না হলে জ্ঞানরাজ্যে বিচরণ করা যায় না। সুতরাং জ্ঞানের অন্বেষণের জন্য তাগিদ দেয়া হচ্ছে শুধু পুরুষদেরকে নয় বরং নারীদেরকেও। ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, সংক্ষিপ্ত পরিসরে যা বলা হলো- তা দেখে মনে হয়, আল্লামা শফি ইসলামের অক্ষর অর্জন করেছেন কিন্তু ইসলামের চেতনা ধারণ করতে পারেননি। তিনি বলেন, ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞাত নারী বিদ্বেষী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ব্যক্তিকে আস্কারা দিয়ে সরকার এ পর্যন্ত এনেছে। আল্লামা শফি অন্ধকারের দিশারী আলোর দিক নির্দেশক নন। তার হাতে ইসলাম ও মানুষ বিপন্ন।
এছাড়া আল্লামা শাহ আহমদ শফীর নারী শিক্ষা সর্ম্পকে বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুর রশীদ বলেছেন, আল্লামা শফির দেয়া বক্তব্য সম্পূর্ণভাবে ইসলাম বিরুদ্ধ কথা। ইসলাম সকল নারী পুরুষের ওপর জ্ঞান শিক্ষা ফরজ করেছে। সেখানে বলেনি যে কাউকে ফোর পর্যন্ত বা কাউকে সিক্স পর্যন্ত পড়তে হবে। আল্লামা শফির বক্তব্য কোনভাবেই ঠিক নয়। তিনি বলেন, পরিবেশের জন্য যদি কোন ছেলে মেয়ের জীবন, চরিত্র নষ্ট হয়, সেগুলো হলো পরিবেশের কারণে। নারী শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কিন্তু নারীরা শিক্ষা করতে পারবে না এ কথাটা সম্পূর্ণ ইসলাম বিরুদ্ধ কথা। ইসলামতো প্রত্যেক নারী পুরুষকে জ্ঞান শিক্ষা ফরজ করেছে, যেটি নবীজী (সা.) বলেছেন। কুরআনের প্রথম বাণীই ছিল ‘পড়’। তিনি আরো বলেন, পরিবেশের কারণে আমরা নারীদের শিক্ষা বন্ধ করে দিতে পারিনা। কারণ মাথা ব্যাথা হলে আমরা মাথাটাকে কেটে ফেলতে পারি না, মাথায় ব্যাথার ঔষধ দিতে হয়।
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি এক বিবৃতিতে আহমেদ শফীর বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেন, তেঁতুল হুজুরের নারী শিক্ষা বিরোধী বক্তব্য সংবিধান বিরোধী, মৌলিক অধিকার বিরোধী, মানবাধিকার বিরোধী, নারী অধিকার বিরোধী, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধী এমনকি ইসলাম বিরোধী। ইসলামে কোথায়ও নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে কোনো কথা নেই। তেঁতুল হুজুর ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মন গড়া ফতোয়া দিয়ে দেশ ও সমাজকে আলো থেকে অন্ধকারে নিতে চায়। জাসদ নেতৃদ্বয় বলেন, মাদরাসা শিক্ষার প্রতি সরকার জোড় দেয়ায় এটাকে সরকারের দুর্বলতা ভেবে তেঁতুল হুজুররা বাড়াবাড়ি করলে তার ফলাফল তেঁতুল হুজুরদের ভোগ করতে হবে।
জাতীয় নারী জোটের আহ্বায়ক আফরোজা হক রীনা এক বিবৃতিতে আহমেদ শফীর নারী শিক্ষা বিরোধী বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছেন। তিনি বলেন, ইসলামে কোথাও নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে কোনো কথা নেই। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রওশন আরা রুশো ও সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু এক যুক্ত বিবৃতিতে সংবিধান পরিপন্থী নারী বিদ্বেষী বক্তব্য দানকারী শফী হুজুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, শফী হুজুরের এই বক্তব্য নারী অধিকার পরিপন্থী একই সাথে সংবিধান পরিপন্থী। সংবিধানের ২৮(২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।’ ২৮ (৩) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোন নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।’



 

Show all comments
  • সাদেকুল্লাহ ১৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:৪৫ এএম says : 0
    ওনি বলেছেন নারির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে তাদের উচ্চ শিক্ষা দিন,খণ্ডিত বক্তব্য প্রচার করছে নাস্ততিক্যবাদি ও ধর্মনিরপেক্ষবাদি মিডিয়াগুলো।শিয়াল চায় মুরগির স্বাধীনতা
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

এ সংক্রান্ত আরও খবর
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ