Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৭ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৩ জামাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী।

শিশুর প্রতি এই সহিংসতা কেন?

আজহার মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৩ এএম


গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর ডেমরায় একটি বাসার খাটের নিচ থেকে দু’টি শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দেওয়ার নাম করে শিশু দু’টিকে বাসায় ডেকে ধর্ষণ করতে চায় কিছু পশু। ব্যর্থ হয়ে শিশু দু’টির একজনকে গলা টিপে এবং আরেকজনকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। একই দিনে রাজধানীর তুরাগ এলাকায় স্কুল থেকে ফেরার পথে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের পর হত্যার চেষ্টা করে এক যুবক। এর একদিন আগে, অর্থাৎ ৬ জানুয়ারি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার গাবতলা গ্রামে আট বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। আরো একটি ঘটনা ঘটেছে ৫ জানুয়ারি। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় দুই বছর ১০ দিনের একটি শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। অর্থাৎ জানুয়ারি মাসের ৫, ৬ এবং ৭ তারিখ, এই তিন দিনে চার শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ভাবতে অবাক লাগে, এতো নিকৃষ্ট কাজ আমাদের দেশে নিয়মিতই হচ্ছে, যার প্রতিরোধ কেউ করছে না।
দিনের পর দিন এভাবে ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুর সাথে অন্যায় চলছে আর চলছে। সমাজের বিবেকমান মানুষেরা এটা দেখে নাক ডেকে ঘুমোতে যায়, বাস্তবে না আছে আমাদের ভেতর দয়া, না আছে ভালোবাসা। যদি থাকতো তাহলে এমন নিষ্ঠুর ঘটনার পরেও আমরা চুপ করে বসে থাকতে পারতাম না। এ বিষয়ে সমাজের এবং রাষ্ট্রের কঠোর ভূমিকা পালন করা উচিত। অথচ এর কিছুই দেখছি না। আমরা পত্রিকায় এবং খবরে যা দেখি তা হয়তো সকলেই জানি, কিন্তু যা খবরের কাগজে উঠে না তা জানতেও পারি না। তার মানে এই যে, পত্রিকায় খবরেই ধর্ষণের ঘটনা সীমাবদ্ধ নয়। রোজ দেশের কোনো না কোনো স্থানে চলছে এ নোংরামি, যা হয়তো আমার আর আপনার অজানা।
বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের ‘স্টেট অব চাইল্ড রাইটস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৭ সালে দেশে ৫৯৩টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর আগে ২০১৬ সালে যৌন নিপীড়ন এবং ধর্ষণের শিকার হয়েছিল ৪৪৬টি শিশু। অর্থাৎ, ওই এক বছরে শিশু ধর্ষণের হার বেড়েছে শতকরা ৩৩ ভাগ। অন্যদিকে শিশুদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাস থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ গত পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে আরও ৬৩৯ শিশু। গত চার বছরে সারাদেশে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৩১ শিশুকে। আর ধর্ষণের পর অপমান সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে ১৯ শিশু। শুধু তাই নয়, গত তিন বছরে সারাদেশে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৩১ শিশু, যার মধ্যে ১১২ প্রতিবন্ধী শিশুও রয়েছে। সংস্থাটির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর মাস পযন্ত সারাদেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৬৩ শিশু, যার মধ্যে ২৬ প্রতিবন্ধী। আর ধর্ষণচেষ্টা ও যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ১৭৯ শিশু। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা ৫৮ শিশুকে এবং ধর্ষণের পরে আত্মহত্যা করেছে ছয় শিশু। এই ১১ মাসে ৯৩ শিশু সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। পরিসংখ্যান দেখে এটা অন্তত বুঝা যায় যে, এই নোংরামি কমবে না। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিরাজ করছে, এ ধরনের ঘটনা বেড়ে যাওয়া সেটিরই প্রতিফলন।
আবহমানকাল থেকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে আসছে। তবে সা¤প্রতিক সময়ে এ ধরনের ঘটনায় নিয়ামকের ভূমিকায় রয়েছে পর্নগ্রাফি। তথ্যপ্রযুক্তি বা ইন্টারনেটসহ মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ল্যাপটপ ইত্যাদিতে পর্নছবি দেখার মাধ্যমে এই মানসিকতা তৈরি হয় অপরাধীর। চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, একজন মানুষ যখন পর্নগ্রাফি দেখে, তখন তার মস্তিষ্ক থেকে হরমোন নিঃসরণ হয়। যার মাধ্যমে উক্তব্যক্তি যৌনাচারে উৎসাহিত হয়। এ ধরনের মানুষ তখন যৌন আচরণ করার জন্য কুকুরের মতো হয়ে ওঠে। শুধু পর্নগ্রাফি নয়, মাদকও আরেক নিয়ামক। এমনও অনেক মাদক রয়েছে যা সেবন করলে সেবীকে তা যৌনতায় প্রবৃত্ত করে। কিছু কিছু নাটক, চলচ্চিত্রসহ বিশ্ব সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদান ধর্ষণে উৎসাহিত করে। এসব উপাদান বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে নষ্ট করছে। মেয়েরা ভোগের বস্তু- এমন ধারণা তাদের মধ্যে প্রোথিত করছে।
জাতীয়ভাবে আমাদের নিজস্ব পারিবারিক, সামাজিক, নৈতিক ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ রয়েছে। আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনধারা অত্যন্ত মজবুত। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব সংস্কৃতির যে সুনামি চলছে, তা আমাদের পারিবারিক-সামাজিক-নৈতিক মূল্যবোধ ভেঙ্গে চুরমার করে দিচ্ছে।
বিশ্ব সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকের আগ্রাসনই ধর্ষণের ঘটনা বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দুর্বল পারিবারিক বন্ধন, দুর্বল সামাজিক কাঠামো, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, দারিদ্র্য, বিচারহীনতা। আরও রয়েছে স্থানীয় ও জাতীয় সংস্কৃতি চর্চার অভাব, সুষ্ঠু ও সুস্থ ধারার বিনোদনের অনুপস্থিতি, কিশোর-কিশোরীদের ক্রীড়া-কর্মকাÐের অভাব ইত্যাদি। এর চাইতে বড় বিষয় হচ্ছে, সমাজে যতসংখ্যক ধর্ষণের ঘটনা আমরা শুনি, ততটার বিচারের খবর আমরা পাই না। গণমাধ্যমে এ ধরনের খবর তেমন একটা দেখা যায় না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষকরা শুধু পারই পায় না, পুরস্কৃতও হয়।
ধর্ষণ তথা যৌন নির্যাতন হ্রাসের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে রাষ্ট্র। যদি ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া যায়, তাহলে এ ঘটনা হ্রাসের পাশাপাশি বন্ধও হতে পারে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি এ ক্ষেত্রে সমাজ এবং পরিবারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সামাজিক ও জাতীয় জীবনে নৈতিক মূল্যবোধ সুগঠিত ও সুসংগঠিত করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার ও অশুভ বিস্তার ঠেকাতে হবে। বিশ্ব সংস্কৃতির নেতিবাচক উপাদানও নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এসবের দায়িত্ব প্রধানত রাষ্ট্রের। আর রাষ্ট্রকে সাহায্য করতে হবে আমাদের। পাশাপাশি আমাদের বহুদিনের ঐতিহ্যের পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য লালন করতে হবে। তাহলেই আমরা এই ভয়াবহতা এবং অমানিবকতা থেকে রক্ষা পেতে পারি।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও ছড়াকার



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন