Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৯ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৫ জামাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী।

আলেম সমাজের ঐতিহ্যিক রাজনীতি

উবায়দুর রহমান খান নদভী | প্রকাশের সময় : ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

বাংলাদেশ শতকরা ৯২ ভাগ মুসলমানের দেশ। যদিও দীনি শিক্ষার অভাবে এ দেশের নেতৃত্ব ইসলামী ব্যবস্থার সাথে পরিচিত নয়। ইসলামপন্থীরাও সুন্নাহর আসল স্বরূপ নিয়ে অগ্রসর নয়। উলামায়ে কেরাম অনেকেই ইলম থাকা সত্তে¡ও রাষ্ট্র ও সমাজের ব্যাপারে সচেতন নন। যারা সচেতন আছেন, পরিবেশগত কারণে তাদের অনেকেই রাজনীতিতে আসতে চান না।
তা ছাড়া রাজনীতির ধারণাও এ দেশে ভ্রান্তিতে পূর্ণ। দীনি বা নববী সিয়াসত আর প্রচলিত রাজনীতি যেহেতু এক নয়, সুতরাং অসংখ্য উলামায়ে কেরাম রাজনীতি-সচেতন ও যোগ্য হওয়া সত্তে¡ও প্রচলিত রাজনীতিতে আসেন না। অজ্ঞ লোকেরা তাদের অরাজনৈতিক মনে করলেও আসলে তারা একটি ব্যাপক গভীর ও অর্থবহ রাজনীতিতেই আছেন। এটিই শরীয়তি রাজনীতি। সুতরাং কোনো আহলে ইলম রাজনীতি করেন না, এটা আমি বিশ্বাস করি না।
আপনি যদি কোরআন-সুন্নাহ ও সীরাত মুতালাআ করেন, তা হলে পলিটিক্স খুঁজে পাবেন না। যার অর্থ রাজনীতি। আপনি পাবেন কালেমার দাওয়াত, কিতাবুল্লাহর তিলাওয়াত, তালীম, তাযকিয়া, তরবিয়ত ও জিহাদ। এসব কি রাজনীতি নয়? নাগরিক তৈরি, পরিবার ও সমাজ গঠন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আমিরকে মানা, সংগঠিত থাকা, এ সবই তো সফল রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। মানুষের চিন্তা-চেতনা, ইবাদত-বন্দেগী, আর্থ-সামাজিক লেনদেন ও পারস্পরিক মানবিক নৈতিক সম্পর্ক এবং আত্মশুদ্ধিসহ সমাজ ও রাষ্ট্রের সংস্কার ইত্যাদি সবই ওপরে বর্ণিত কর্মসূচির মধ্যে শতভাগ নিহিত আছে।
নগর-সভ্যতা বা নাগরিক রাষ্ট্র যখন বৃহৎ ভ‚গোল নিয়ে বিশ্বময় একটি কল্যাণ-রাষ্ট্রের রূপ পরিগ্রহ করে ইসলামে তখনো এটিকে দুনিয়াদারী বলে গণ্য করা হয় না। যদিও দুনিয়াদাররা তাদের পরিভাষায় একে পরাশক্তি, সাম্রাজ্য কিংবা বৃহৎ বাদশাহী আখ্যায়িত করে। যুগে যুগে যেসব মামলাকাত, সালতানাত, হুকুমাত ইত্যাদি নাম গ্রহণ করে একধরনের রাজকীয় ধারণা নির্মাণ করেছে।
কিন্তু আসলে ‘খিলাফত আলা মিনহাজিন নবুওয়াহ’ নামের বৈশ্বিক রাষ্ট্রব্যবস্থাটি মসজিদে নববীর সামগ্রিক কর্মসূচিরই একটি ফলিত বাস্তবায়ন মাত্র। শরীয়তে যাকে ইমামতে সুগরা ও ইমমাতে কুবরা বলা হয়। এ খিলাফত-পদ্ধতির রাজনীতি যখন একটি জনপদের সবচেয়ে বড় বুযুর্গ ও আহলে ইলমগণ ইমারতের আওতায় জামাতবদ্ধ হয়ে সুচিন্তিতভাবে পরিচালনা করেন, সাথে শক্তি ও অর্থনীতি যোগ হয়, নানা শ্রেণি ও পেশার সমমনা বিশেষজ্ঞরা এতে সন্নিহিত হন তখন ইমাম বা আমীর একটি মুসলিম জনপদকে দীনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখার ওপর চালানোর উদ্যোগ গ্রহণ করার নামই খিলাফত।
পশ্চিমা ধারণার ফলে, দীর্ঘদিন খেলাফত না থাকার ফলে, জনগণ পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার ফলে, অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য ও অল্প শিক্ষিত আলেমগণ প্রচলিত রাজনীতিতে আসার ফলে মুসলিম সমাজেও দীন, সিয়াসত ও ইমারতের ধারণা ধূলিধূসরিত হয়ে যায়।
দীর্ঘ ১৩শ’ বছর মোটামুটি একটি কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলায় মুসলিম বিশ্ব পরিচালিত হয়। কখনো নিষ্কলুষ খিলাফত (খিলাফতে রাশেদা) কখনো কোনো শাসকবংশ, কখনো কোনো নতুন শাসকগোষ্ঠী কেন্দ্রীয়ভাবে মুসলমানদের পরিচালনা করে। কেন্দ্র দুর্বল হয়ে পড়লে আঞ্চলিকভাবে কেন্দ্রকে স্বীকার করেও অনেক সৎ ও যোগ্য শাসক খেলাফতে রাশেদার আলোকে বিশাল বিশাল রাজ্য পরিচালনা করেন।
কোরআন-সুন্নাহর মূলনীতির ওপর এসব আমীর বা শাসক ব্যক্তিগত রুচি ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে বর্ণিল চরিত্রের থাকলেও তাদের বিচার ও প্রশাসন ছিল শতভাগ ফিকাহ ও ফতোয়ার আলোকে পরিচালিত। শত শত আঞ্চলিক শাসকের নাম মুসলমানের ইতিহাসে এমন পাওয়া যাবে, যাদের প্রত্যেকেরই শাসনব্যবস্থা আধুনিক পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থার সবগুলো থেকে হাজার গুণ সফল ও উত্তম। ন্যায়বিচার, সুশাসন ও নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে এসব শাসক আরও হাজার বছর বিশ্ববাসীর মান্য ও পাঠ্য।



 

Show all comments
  • younus ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:৫৭ এএম says : 0
    জনগণের কল্যাণ ও উন্নয়নের লক্ষ্যে সমাজ থেকে জালেম-ফাসেক শ্রেণীর নেতৃত্বের অবসান ঘটিয়ে আলেমসমাজ ও ইসলামি চেতনাসম্পন্ন সৎ লোকদের এগিয়ে আসতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Didar ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:৫৮ এএম says : 0
    এখনো উলামাসমাজের আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। অথচ নবী সা:-এর উত্তরাধিকারের দায়িত্ব পালন করতে হলে আলেমগণকে সমাজে ইসলামি জ্ঞানের ব্যাপক প্রসার এবং ইসলামের আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের কাজে এগিয়ে আসতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Engr Amirul Islam ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:৫৯ এএম says : 0
    সমাজ ও রাষ্ট্রকে আবার ইসলামের আলোকে পুনর্গঠনের প্রয়াস, সমাজের সর্বস্তরে আলেমগণের কার্যকর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ আজ অপরিহার্য বলে বিবেচিত হচ্ছে। এ ক্ষেতে নবীন আলেমসমাজকে সর্বাধিক ভূমিকা পালনে এগিয়ে আসতে হবে। নবীন আলেমরাই পারেন আজকের বিপদসঙ্কুুল পরিবেশ ও যাবতীয় ষড়যন্ত্র-চক্রান্তকে মোকাবেলা করে ইসলামের পতাকাকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে। তারাই পারেন আজকের বৈরী পরিবেশে জনগণকে নেতৃত্ব প্রদান করতে।
    Total Reply(0) Reply
  • Fazlul Haque ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ৩:০০ এএম says : 0
    সর্বাগ্রে প্রয়োজন আলেমসমাজের মধ্যে জাগরণ। জনগণ ও জাতিকে নেতৃত্ব দেয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। অন্যায়ের মোকাবেলায় রুখে দাঁড়ানোর মতো দৃঢ় মানসিকতা ও সাহসিকতা। সাথে নিজেদের সঙ্ঘবদ্ধ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে সংগ্রাম করে যাওয়া। আজ জাতি সেদিকেই তাকিয়ে আছে।
    Total Reply(0) Reply
  • Md Fahad ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ৩:০২ এএম says : 0
    সমাজ আদর্শিক ও জাগতিক ব্যবস্থাপনার দিক থেকে দিনদিন মন্দের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ অবস্থায় আলেমসমাজের দায়িত্ব হচ্ছে গোটা সমাজকে সত্যের দিকে, কল্যাণের দিকে, সুবিচারের দিকে ফেরাতে এগিয়ে আসা। আর সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব হাতে না নিলে সমাজে সত্য, ন্যায়, সুবিচার, কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। কাজেই সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ও জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি সামাজিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানের বিষয়কে এড়িয়ে যাওয়া নয়; বরং তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। তাহলেই সমাজ ও রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখা দেবে। এ প্রসঙ্গে এটাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বটি সব আলেমই করবেন, এমনটি নয়। আলেমদের মধ্য থেকে যে অংশটি এ কাজের উপযোগী ও যোগ্যতার অধিকারী, তারাই এ কাজে এগিয়ে আসবেন।
    Total Reply(0) Reply
  • সাইফুল ইসলাম ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ১০:২৯ এএম says : 0
    আল্লাহ আমাদের দেশে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে দিক। আমিন
    Total Reply(0) Reply
  • সাইফ ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯, ১০:০১ এএম says : 0
    সবছেয়ে বড় কথা হচ্ছে আমাদের দেশে আলেম সমাজের মধ্যেই বড় শমস্যা তার প্রমান ইসলামের নামে রাজনৈতিক দলে সংক্ষ্যা গননা করলেই বুঝতে পারবেন, আর এদের অধিকাংশ আলেম সমাজের বয়ান শুনলে মনে হয় যেন ইসলাম কেবল তার অনুসৃত মতের মধ্যেই সিমাবদ্ধ। মুলত এখান থেকেই অধিকাংশ ফিত্না ছড়াচ্ছে। আর তা ছাড়া অন্যেরাতো আছেই। উম্মতে মোহাম্মদি (সাঃ) এর এর প্রধান শক্তি ঈমান এর পরে হচ্ছে ঐক্য। যা তৈরি ও ধরে রাখার দায়িত্ব ছিলো আলেম ওলামাদের, তারা ব্যর্থতো হয়েছেনই। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বিবেদের কারনই হচ্ছেন। আল্লাহ্‌ পাক আমাদের সকলকে হিদায়েত নসিব করুন। ইনকিলাব সংশ্লিষ্ট সকলকে এবং লেখক সাহেবকে অনেক ধন্যবাদ এবং আল্লাহ্‌ পাক আপনাদের সকলকে এর উত্তম প্রতিধান প্রধান করুন
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ