Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার ২১ জুলাই ২০১৯, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

খেজুর গাছের কচি পাতায় গৃহসজ্জার সামগ্রী

প্রকাশের সময় : ১১ মে, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মিজানুর রহমান তোতা : যশোরের ঐতিহ্যের প্রতীক খেজুর গাছ যা মধুবৃক্ষ হিসেবে চিহ্নিত। আগের মতো সেই যশ ও ঐতিহ্য নেই। দিনে দিনে নানা কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। খেজুর গাছ কেটে একসময় দেদারসে ইটভাটায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অনেক লেখালেখির পর তা অনেকটা কমে গেছে। এখন নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে। সামান্য লাভের আশায় খেজুর গাছের মাজপাতা (কচিপাতা) কেটে নিয়ে তা দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে গৃহসজ্জার সামগ্রী। যা বিদেশে রফতানী হচ্ছে। এর উদ্যোক্তা এনজিও’রা। সস্তা শ্রমে সমাজের অভাবী ও দুঃস্থ মহিলাদের দিয়ে খড় ও খেজুর পাতায় গৃহসজ্জার বিভিন্ন সামগ্রী তৈরী করে বিদেশে রফতানী করা হচ্ছে। এনজিও’রা মহিলাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে খেজুরের পাতা ও খড় দিয়ে গৃহসজ্জার বিভিন্ন জিনিস তৈরী করতে উদ্বুদ্ধ করে কয়েক বছর আগে। খেজুরের পাতা আর খড়ের তৈরী জিনিসে লেখা হয় ‘মেড ইন যশোর’। প্রথমদিকে গভীরভাবে কেউ ভাবেননি। দৃশ্যত অনেকটাই অভাবনীয় মনে হয়েছে সবার কাছে। খেজুর পাতা ও খড়ের তৈরী জিনিস যাচ্ছে বিদেশে, যা এক ঝলক আলো হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু পরবর্তীতে অনুসন্ধানে বের হয়েছে উদ্বেগজনক তথ্য।
লেখক ও যশোর শিক্ষাবোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান গবেষক প্রফেসর আমিরুল আলম খান দৈনিক ইনকিলাবকে জানান, দৃশ্যত খেজুর পাতায় বৈদেশিক মুদ্রা আসছে বলে অনেকে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন ঠিকই কিন্তু কতটা লাভ হচ্ছে, লাভের চেয়ে ক্ষতি হচ্ছে কতটা তা ভাবছেন না। তার কথা, এনজিও’রা সস্তাশ্রমের সুযোগ নিয়ে যশোরের ঐতিহ্য খেজুর গাছের কচিপাতা তুলে জিনিসপত্র তৈরী করছে। এতে কিছুদিনের মধ্যে ওই গাছ শুকিয়ে মারা যাচ্ছে। তার মতে, কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাণিজ্য করার জন্য খেজুর বাগান তৈরী করে সেখান থেকে যা খুশী তাই করুক। অযতœ ও অবহেলায় মাঠে ঘাটে প্রকৃতিগত তৈরী হওয়া খেজুর গাছ ধ্বংস করার অধিকার কারো নেই। এমনিতেই যশোরের যশ খেজুরের রস হারিয়ে যেতে বসেছে। তার উপর গলাটিপে মারা হচ্ছে। খেজুর গাছসহ গাছগাছালি কমে যাওয়ায় পাখি রক্ষা হচ্ছে না। পরিবেশের হচ্ছে মারাত্মক ক্ষতি।
যশোর শহর থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দুরে যশোর-বেনাপোল সড়কের পাশে যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রাম। গ্রামের বড় অংশ জুড়ে একটি পাড়া। সেখানে এনজিও’রা গড়ে তুলেছে একাধিক হ্যান্ডিক্র্যাপট কারাখানা। খেজুরের পাতা ও খড় দিয়ে বিভিন্ন গৃহসজ্জার বিভিন্ন সামগ্রী তৈরী করা হয়। আশেপাশের এলাকার খেজুর ঘাছের কচিপাতা সংগ্রহ করে খড় বিচালি দিয়ে তৈরী করা হয় বাসকেট, গাস ট্রে, ফ্রুট ট্রে, শপিং ব্যাগ, জারসহ বিভিন্ন গৃহসজ্জার সামগ্রী। জানা যায়, দেশের অভ্যন্তরের কোন মার্কেটে সাধারণত এসব আইটেম বিক্রি হয় না। প্রায় সবই দেশের বাইরে রফতানী হয় ঢাকার নামীদামী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। খেজুরের পাতা ও খড়ের তৈরী জিনিস ইটালী, জার্মানী, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, আমেরিকা ও ইংল্যান্ডে রফতানী হয় বেশী। যশোরের শিমুলিয়া থেকে প্রতি মাসে ৩/৪ ট্রাক খেজুরের পাতা ও খড়ে তৈরী জিনিস ঢাকা যায়। সেখান থেকে রফতানী করা হয় বিদেশে।
শিমুলিয়া গ্রামের হস্তশিল্পের সঙ্গে জড়িত রমেশচন্দ্র জানালেন, কাঁচামাল সংগ্রহে আশেপাশের গ্রাম থেকে খেজুরের পাতা ও খড় ক্রয় করা হয়। গড়ে ৫শ’ টাকা মণ দরে খেজুরের পাতা ও খড় ক্রয় করা হয়। তার কথা, খেজুর গাছের কচিপাতার ডাল কেটে পাতা ছুড়িয়ে নেওয়া হয়। তাতে খেজুর গাছ আস্তে আস্তে শুকিয়ে যায় একথা ঠিক কিন্তু টাকার লোভে গাছওয়ালা বিক্রি করে। শ্রমজীবি মহিলারা প্রতিদিন পারিশ্রমিক পান ১শ’ টাকা এবং উর্ধ্বে ২শ’ টাকা। যিনি যত বেশী কাজ করতে পারেন তার পারিশ্রমিক তত বেশী। আগে শীত মৌসুমে খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহের জন্য ডালপাতা পরিস্কার করা হতো গাছের একটি অংশে। তাতে এলাকার রাস্তার ধারে ও মাঠে এলোমেলোভাবে খেজুরের ডালপাতা পড়ে থাকার দৃশ্য দেখা যেত, শুকানোর পর জ্বালানীর জন্য লোকজন নিয়ে যেত। হস্তশিল্প চালু হওয়ার পর এলাকার কোথাও শীত কিংবা গ্রীষ্মে এখন আর খেজুরের ডালপাতা পড়ে থাকতে দেখা যায় না।
এক সময় যশোরের খেজুর গুড় ও পাটালি বিশ্ব জয় করেছিল। ইংল্যান্ডের মিঃ নিউ হাউজ ১৮৬৪ সালে যশোরের চৌগাছার তাহেরপুরে এসে বিশ্বে সর্বপ্রথম খেজুরের গুড় থেকে ব্রাউন সুগার বা বাদামী চিনি উৎপাদন করে বিরাট বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। সেই সময় যশোর থেকে বিদেশে রফতানী হতো ব্রাউন সুগার চিনি এবং খেজুরের গুড় ও পাটালি। আজ যদিও নতুন প্রজন্মের কাছে সেসব কল্পকাহিনী মনে হবে। খেজুর গাছ নেই বললেই চলে। যা আছে তা দিয়ে শীত মৌসুমে রস গুড়ের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। আগের মতো অবশ্য রমরমা নেই। প্রতিবছরই রস ও গুড়ের উৎপাদন কমে আসছে। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ১৮৬৪ সালের দিকে যশোরে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৪শ’ ৭৫ মন খেজুরের চিনি পাওয়া যেত। সেই সময় এ অঞ্চলে যশোরের খালিশপুর, মহেশপুর, কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, গঙ্গানন্দপুর, বোদখানা, ঝিকরগাছা, খাজুরা, রাজারহাট, রূপদিয়া, তালা, বসুন্দিয়া, ফুলতলা, কালীগঞ্জ, নোয়াপাড়া, নাভারণ, ইছাখাদা, কেশবপুর ও ত্রিমোহিনীসহ বিভিন্নস্থানে একরকম ঘরে ঘরে অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিনি কারখানা গড়ে ওঠে প্রাচীন পদ্ধতিতে। অতীতে সারাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খেজুর গাছ জন্মাতো যশোর অঞ্চলে। এখন খেজুর গাছবৃদ্ধিও কোন পরিকল্পনা নেই। বরং যা আছে তা ধ্বংস করা হচ্ছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ