Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৮ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৪ জামাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী।

ইসলাম : সমাজ থেকে রাষ্ট্রে

উবায়দুর রহমান খান নদভী | প্রকাশের সময় : ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

ইসলামী শাসনের এ ধারাবাহিকতা ধ্বংস করে পশ্চিমা কিছু নাস্তিক্যবাদী ধারণা। যেমন- আব্রাহাম লিঙ্কনের মার্কিন গণতন্ত্র, ইউরোপের ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতি, কার্ল মার্ক্সের সমাজতন্ত্র ইত্যাদি। বিশেষ করে আমাদের উপমহাদেশে ব্রিটিশরা মুসলিম শাসনব্যবস্থা শুধু ভেঙে চুরমার করেনি; বরং শত বছরের কৌশল ও কূটনীতির মাধ্যমে এ অঞ্চলের উলামায়ে কেরামের মন থেকে ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজসেবার রূপরেখাটি পর্যন্ত মুছে দিতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের পর কঠিন ও অচিন্তনীয় নির্মম নৃশংস নির্যাতনের মাধ্যমে উলামায়ে কেরাম ও ইসলামপন্থী বিপ্লবীদের ধ্বংস করে দেয়। মাত্র ছয় মাসের মধ্যে ৫০ হাজার আলেমকে হত্যা করে। যার মধ্যে ১৪ হাজার আলেম, হাফেজ, পীর ও মুজাহিদকে গাছে ফাঁসি দিয়ে মাসের পর মাস ঝুলিয়ে রাখে। উইলিয়াম উইলিয়াম হান্টারের ভাষায়- আরাকান থেকে আফগানিস্তান পর্যন্ত প্রলম্বিত শেরশাহ সূরি সড়কের দুই পাশে এমন কোনো বড় গাছ ছিল না যাতে আমরা ইংরেজরা কোনো না কোনো বিপ্লবীকে ফাঁসি না দিয়েছি।
ইউপির হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি, মাওলানা কাসেম নানুতবী, রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী ও তাদের সাথিরা এ সময় যুদ্ধে পরাজিত হন। রহমতুল্লাহ কিরানভী ও হাজী সাহেব মক্কায় চলে যান। বাংলা, বিহার ও ভারতীয় অন্যান্য রাজ্যে সংগ্রামী আলেমদের হত্যার পাশাপাশি অনেককে দেশান্তরের সাজা দেয়া হয়। আন্দামান, নিকোবরসহ সুদূর মাল্টা পর্যন্ত উলামায়ে কেরামকে কালাপানির সাজা দেয়া হয়। দেওবন্দের প্রথম সন্তান শাইখুল হিন্দ মাহমুদ হাসান, তার শিষ্য হুসাইন আহমদ মাদানি, মাওলানা ফজলে হক খায়রাবাদী- এসবের ভুক্তভোগী। মাওলানা খায়রাবাদী তার ঐতিহাসিক কিতাব আছছাওরাহ আল-হিন্দিয়া ১৮৫৭-তে এর কিছু ইতিহাস সংরক্ষণ করেছেন। মাওলানা জাফর থানেশ্বরী কিছু লিখে গেছেন। মাওলানা মুহাম্মদ মিঁয়া সাহেব তার ঐতিহাসিক কিতাব উলামায়ে হিন্দ কা শান্দার মাযিতে এসবের বর্ণনাই দিয়েছেন। তার কিতাবের শেষ পাতায় তিনি এ ধরনের একটি মূল্যায়ন দিয়েই কিতাবটি শেষ করেছেন- ১৯০ বছরের ইংরেজ শাসক মুসলমানদের এ ভূখন্ডে ইসলামী রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার এত বড় ক্ষতি করে গেছে, যার দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন। সমাজ ও রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দানকারী সুলতান, উজির, সেনাপতি, মুফতি, কাজী ও মুন্সি এবং তাদের তাত্তি¡ক পথপ্রদর্শক উলামায়ে কেরাম এমন মানসিক অবস্থায় পৌঁছে গেছেন যে পূর্ণ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান, যেখানে কুরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক চর্চা হয়, সেখানে আলেমগণ ইচ্ছাকৃতভাবে এ কথাটি লিখে দিয়ে থাকেন যে, এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই অথবা অরাজনৈতিক দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। যে আশাটি ইংরেজরা করেছিল। আজ ইংরেজ বিদায় হওয়ার প্রায় ৭০ বছর পরও তাদের দোসররা উলামায়ে কেরামের কাছে এমন আচরণই প্রত্যাশা করছে। প্রকৃত শিক্ষিত ও বিজ্ঞ আলেমরা যদি দীর্ঘ সিয়াসত পুনরায় জিন্দা করেন, তা হলে দীর্ঘ দিন পরে হলেও এ দেশের নাগরিকদের ভুল ভাঙবে। পশ্চিমা রাজনীতির শয়তানি পদ্ধতি থেকে এ জাতি মুক্তি লাভ করবে। রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থান মূল মালিক আল্লাহ ও রাসূলের খলিফা আমীর বা ইমামের মাধ্যমে কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ইসলামী ব্যবস্থা জারি হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের জন্য নিজস্ব জনপদে এ পদ্ধতির বাইরে থাকার সুযোগ নেই।
এ বাস্তব চিত্রটি চিন্তায় রেখে সবচেয়ে যোগ্য মুহাদ্দিস ও ফকিহগণ, মুফাসসির ও মুফতিগণ, মুফাক্কির ও মুজাহিদগণ যদি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে ৯২ ভাগ মানুষকে সবদিক দিয়ে প্রস্তুত করেন, তা হলেই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনি পরিবেশ ও ব্যবস্থা কায়েম করা সহজ হবে। বিচ্ছিন্ন দলবদ্ধতা, অনৈক্য ও বিক্ষিপ্ত মন-মানসিকতা ধীরে ধীরে আমীর ও জামাত-কেন্দ্রিক হয়ে গড়ে উঠবে। উলামায়ে কেরামের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে তারা যেমন পরীক্ষিত ও সফল- বিশেষ করে ইমামতে সুগরার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে তারা ধীরে ধীরে এক সময় জাতির সর্ববৃহৎ কর্মক্ষেত্র রাষ্ট্র ও আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় ইমামতে কুবরার আসনটিও লাভ করবেন।



 

Show all comments
  • Syed Kishwar Rashid ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:০২ এএম says : 0
    তথ্যবহুল একটা লেখা, পড়ে ভালো লাগল। আসলে মুসলমানদের ইতিহাস জেনে সামনে এগুতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Zulfiqar Ahmed ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:০৩ এএম says : 1
    শুকরিয়া জনাব। জ্ঞানগর্ভ আলোচনার জন্য ধন্যবাদ। পুনরায় ইসলামি শাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে আলেমদের মধ্যে সেই চেতনা ফিরিয়ে আনতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • আমিন মুন্সি ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:০৫ এএম says : 1
    ব্রিটিশরা যে ডিভাইড অ্যান্ড রুলস তথা বিভক্ত কর এবং শাসন কর নীতিতে মুসলমানদের ছিন্নবিচ্ছিন্ন করেছিল সেই একই নীতিতে আজও আলেম সমাজ বিভক্ত। যড়যন্ত্র থেকে এখনও তারা বুরতে পারেনি।
    Total Reply(0) Reply
  • তাসলিমা বেগম ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:০৬ এএম says : 1
    পুনরায় ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম করা জরুরি হয়ে উঠেছে। আবারও আলেম সমাজকে জেগে উঠতে হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • নীল আকাশ ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:০৭ এএম says : 4
    পশ্চিমাদের দেখানো ধোকাবাজ যত তন্ত্র-মন্ত্র থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ইসলাম নির্দেশিত খেলাফত প্রতিষ্ঠায় মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে চেষ্টা চালাতে হবে। তবেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে।
    Total Reply(0) Reply
  • Muhammad Shafiuddin ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২৩ এএম says : 0
    ইসলাম -সমাজ থেকে রাষ্ট্র-রাষ্ট্র থেকে পৃথিবী । ইসলামের বিকল্প নেই
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammed Shah Alam Khan ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১০:০৪ এএম says : 0
    উপের অংশ লিখা হয়েছে প্রসিদ্ধ ইসলামিক চিন্তাবিদ উবায়দুর রহমান খান নদভী সাহেবের লিখার উপর। আর নিচের অংশ টুকু লিখা হয়েছে উদাহরনের জন্যেঃ এখন আমরা যদি আল্লাহ্‌র হুকুমের বাহিরে যাই তাহলে চলবে না, সেজন্যই আজ আমাদের (মুসলমানদের) এই পরিণতি আমার মনে হয়। আমি বাংলাদেশকে নিয়ে আলোচনা করলে কি দেখতে পাই আল্লাহ্‌ ’৭১ সালে একটি মুসলিম দেশ পূর্ব পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশ হিসাবে নতুন একটি দেশের জন্ম দেন; এটাই ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে আমি বুঝেছি। এরপর এই দেশটা আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করেছে বাঙালী জাতীর জন্যে এবং এই দেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানিদের (উর্দু ভাষী মোসলমান যারা আমাদের উপর অত্যাচার অবিচার করছিল) বহিষ্কার করছেন। তাহলে আমি ইসলাম ধর্ম অনুযাযি বুঝেতে পারি যে, এই দেশে পাকিস্তানিদের কিংবা পাকিস্তানি মতবাদে বিশ্বাসীদের কোন স্থান এখানে নেই। যদি কোন পাকিস্তানিদের দোসর বঙ্গালী এই দেশে থাকতে চায় তবে অবশ্যই তাদেরকে পাকিস্তানি ভাবধারা ছেড়ে দিয়ে বাঙালি ভাবধারায় থাকতে হবে । এখন যেহেতু আমরা মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ট সেহেতু আমরা যখন ক্ষমতায় যাব তখন সংখ্যা গরিষ্টদের শাসনের জন্যে সেইভাবে মানে ইসলামি পন্থায় আইন প্রণয় করতে হবে তবে অন্য ধর্মের প্রতি শিথিল করে মানে সেখানে কোন রেশারেশি হবে না। তাহলে এযাবৎ ’৭৫ পর একনাগার ২১ বছর, ৫ বছর পর আবার ৭ বছর যারা ক্ষমতায় ছিলেন তারা সবাই ইসলাম ইসলাম বলে জনগণকে সন্তুষ্ট করে ক্ষমতায় থেকেছেন। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য তারা ইসলামের কোন আইন করেননি বরং উল্টোটা করেছেন। এখনকার সরকার ইসলামকে দেখিয়ে জনগণকে কাবু করেনা ঠিকই কিন্তু ইসলামের জন্যে যা যা করার দরকার সেটাই এনারা করে যাচ্ছেন তাই আল্লাহ্‌ যেকোন উপায়ই হউক না কেন ওনাদেরকে বার বার এই দেশের শাসন ভার দিচ্ছেন। এতে আমি বুঝতে পারছি যে, আল্লাহ্‌ এনাদের প্রতি সন্তুষ্ট। কাজেই এখন এসব আমাদেরকে বুঝতে হবে আল্লাহ্‌র হেকমত বুঝতে হবে তাহলেই দেশে শুখ ও শান্তি আসবে। ইসলাম ইসলাম ও আলেম আলেম বলে চেচামেচি করলেই আল্লাহ্‌র প্রিয় ধর্ম ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবে না। আল্লাহ্‌ আমাকে সহ সবাইকে আল্লাহ্‌র হেকমত জানার, বুঝার ও সেইভাবে চলার ক্ষমতা দান করুন। আমিন
    Total Reply(0) Reply
  • Mohammed Shah Alam Khan ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১০:০৫ এএম says : 0
    ইসলাম একটি ধর্ম, বিশ্বের এক শ্রেনী এই ধর্ম মানেন, বাকীরা বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী এটাই সত্য। আমি আলেম নই বা আমি কোন মাদ্রাসায় (ইসলামিক স্কুল) আধ্যায়ন করি নি তবে আমি কোরআন পড়েছি আরবী ভাষায় যেজন্য পূর্বে আমি ওয়াজের প্রতি আসক্ত ছিলাম কোরান বুঝার জন্যে। পরবর্তীতে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে বাংলা অর্থ সহ কোরান পড়েছি (খুব সম্ভব ১৯৮০ সালের দিকে) এবং আমার সামান্য জ্ঞান দিয়ে বুঝার চেষ্টা করছি অদ্যাবদি। কিন্তু সত্যকারে আমি কোরানের কিছুই এখনও বুঝে আনতে পারিনি এটাও সত্য। কাজেই আমি বুঝতে পেরেছি আল্লাহ্‌র বন্ধু হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) এর জীবনি পড়ে দেখেছি তিনি অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীল ছিলেন তাদের সাথে সমঝতাও তিনি করেছেন। কিন্তু আমরা এখন কি বলছি বা কি করছি সেটাকি একবার আমরা খেয়াল করে বলছি বা করছি??? ইসলামের যখন জন্ম তখন অন্যান্য ধর্মের লোকজন তাদের নিজেদের ধর্মকে আল্লাহ্‌ তাদেরকে তাদের গোত্রের নবীর মাধ্যমে যে কিতাব দিয়েছিলেন তার বাইরে যারা কিতাবের হেফজ করতেন (ধর্ম যাজক) তার নিজেদের খেয়াল বা ইচ্ছা মত আইন করতেন তাই সমাজে বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হয় তাই আল্লাহ্‌ ইসলাম ধর্ম নতুন করে প্রবর্তন করেন এবং এই কিতাব আল্লাহ্‌ স্বয়ং হেফাজত করবেন বলেন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯
১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন