Inqilab Logo

ঢাকা, সোমবার ১৭ জুন ২০১৯, ৩ আষাঢ় ১৪২৬, ১৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

ঢাকা ডিসি অফিসে জনভোগান্তি চরমে

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ২১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম | আপডেট : ১২:০৮ এএম, ২১ জানুয়ারি, ২০১৯

ভোগান্তির অপর নাম যেন ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। চেক জালিয়াতি, ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিদিনের চিত্র সেখানে নিত্য ঘটনা। পর্দার আড়ালে ঘুষ-অনিয়মে সাড়া না দেয়ায় পাকিস্তান আমলে অধিগ্রহণ করা জমির মালিকরা দীর্ঘ ৫০ বছরেও ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি। আবার সেই ডিসি অফিসে ভুমি অধিগ্রহণে ভয়াবহ চেক জালিয়াতি করা হয়েছে। ব্যাংক ম্যানেজারের সতর্কতায় জমি অধিগ্রহণের সরকারি আট কোটি টাকা অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা ডিসি অফিসে জমি অধিগ্রহণের টাকা পেতে হলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। হয়নারী নয় যেন অধিগ্রহণ মানেই মরণফাঁদ। সম্প্রতি চেক জালিয়াতির ঘটনায় ডিসি অফিসের সিনিয়র সহকারী কমিশনার এবং ডিসি অফিসের এলএ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক আবু বকর সিদ্দিককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। চেক জালিয়াতির ঘটনার ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আবদুল কাদির মিয়াকে ইউএনও পদে পদায়নের জন্য ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে ন্যস্ত করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় আর এ ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী কমিশনার রুনা লায়লাকে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে। এঘটনার অধিকতর তদন্তের জন্য ঢাকা জেলা প্রশাসন নথিপত্র দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে নানা জটিলতা, জালিয়াতি, হয়রানির কারণে জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা বুঝে পায়নি অনেকই। ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়ে অনেকেই ভিক্ষাবৃত্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ তাদের জীবনে মরণফাঁদ হিসেবে দেখা দিয়েছে। যারা দেড় শ-দুই শ বিঘা জমির মালিক হিসেবে পরিচিত ছিল, তাদের শেষ জীবন কেটেছে কপর্দকশূন্য অবস্থায়। তাদের মাথার ওপর ছনের ছাউনি পর্যন্ত ছিল না। তাদের মধ্যে ঢাকার নর্দারটেকের (বর্তমান উত্তরার সাত নম্বর সেক্টর) আদি বাসিন্দা মোহর আলী নাতি মো. খুরশীদ আলম উত্তরার আজমপুরে সাইনবোর্ড লিখে জীবন ধারণ করতেন। কিছু দিন আগে তিনিও বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। এ রকম শত শত মানুষ টাকা না পেয়ে হয়রানীর শিকার হচ্ছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান ইনকিলাবকে বলেন, চেক জালিয়াতির ঘটনা নিয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত হয়েছে। এর সুপারিশের আলোকে একজন অফিস সহকারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। অধিকতর তদন্তের জন্য বিষয়টি দুদকে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, আগে যে দুনীতি ছিল, তার এখন আর নেই। তবে চেক জালিয়াতি, ঘুষ, অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে কাজ করা হচ্ছে। যারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন তারা কিছু বলে না।
জানা গেছে. ঢাকার জেলার উত্তরার সাত নম্বর সেক্টর বাসিন্দা মোহর আলী ২০০ বিঘা জমির মালিক।যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। উত্তরা মডেল টউনের ৬ ও ৭ নম্বর সেক্টরের বেশির ভাগ বাড়িঘর গড়ে উঠেছে সেই জমির ওপর। অথচ ঢাকা শহরে বসবাসের জন্য এক টুকরা জমি পর্যন্ত মেহের আলীর পরিবারের জোটেনি। পাকিস্তান আমলে তাদের এ বিপুল জমি অধিগ্রহণ হলেও দীর্ঘ ৫০ বছরেও ক্ষতিপূরণের টাকা পায়নি তারা। মেহের আলীর পরিবারের সদস্যরা এখন অনাহারে-অর্ধাহারে জীবন যাপন করছে। গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার আন্ধারমানিক নামে গ্রামে বসবাস করছেন তারা।
রাজধানীর আমিনুল ইসলাম আমিনের নামে চলতি মাসের প্রথমদিকে ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ডুমনী শাখায় দুটি চেক জমা পড়ে। একটি চেকে (এলএ কেস নং ২১/২০১৫-২০১৬ এর চেক নং-০৫৫৯৪৪, ক্ষতিপূরণ রোয়েদাদ তালিকা নং-২১, তারিখ ২৪-১২-১৮) চার কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার ৩৫০ টাকা ৭০ পয়সা এবং অপর চেকে ( চেক নং-০৫৫৯৪৫, ক্ষতিপূরণ রোয়েদাদ তালিকা নং-২০, তারিখ ২৪-১২-১৮) তিন কোটি ৪৫ লাখ ২৬ হাজার ৫১০ টাকা ৩০ পয়সা উল্লেখ করা হয়। দুটি চেকে টাকার পরিমাণ সাত কোটি ৬৩ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬১। বিষয়টি ব্যাংকের শাখা ম্যানেজার ইসমাইল হোসেনের সন্দেহ হলে ৬ জানুয়ারি পিয়ন মারফত চেক দুটির ফটোকপি তিনি ঢাকা ডিসি অফিসের সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠান। সেখানে উল্লিখিত দুটি চেকের তথ্য এডওয়ার্ড বইয়ের সঙ্গে কোনো মিল নেই। এমনকি চেকের স্বাক্ষর তার নয় বলেও দাবি করেন সংশ্লিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আবদুল কাদির। এছাড়া চেক দুটির জমি ক্ষতিপূরণ পাওয়া মালিকের আবেদনেরও অনুমোদন নেই। মূলত ২০নং ক্রমিকের চেকে গত বছরের ৩ মে হানিফকে ২১ কোটি ৬৯ হাজার ২৩৮ টাকা এবং ২১নং ক্রমিকের চেকে ৩১ অক্টোবর জুয়েল আহমেদ গংকে ৫০ লাখ ৮১ হাজার ৩৩১ টাকা দেয়া হয়। চেক জালিয়াতি নিয়ে ডিসি অফিসে তোলপাড় শুরু হলে ৭ জানুয়ারি সকালে এলএ শাখার অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক আবু বকর সিদ্দিক ছুটির আবেদন দিয়ে পালিয়ে যান। এরপর অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে ডিসি অফিসের সিনিয়র সহকারী কমিশনার (আগ্নেয়াস্ত্র শাখা) রুনা লায়লাকে তদন্তের দায়িত্ব দিয়ে দু’দিনের মধ্যেই প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তার সঙ্গে বারবার যোগাযোগ করেও তার খোঁজ পাওয়া যায়নি। বিনা কারণে বেশ কয়েকদিন অফিসে উপস্থিত না হওয়ায়, অফিস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ না করায় প্রতীয়মান হয়েছে- অফিস সহকারী আবু বকর জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে চেক দুটি সৃজন করে তা নগদায়ন করার চেষ্টা করেছেন। ১০ জানুয়ারি তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে অফিস আদেশ জারি করেন ঢাকার ডিসি। ঢাকা ডিসি অফিসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ইনকিলাবকে বলেন, জমি অধিগ্রহণের চেকে জালিয়াতি হলেও আরো অনেক ঘটনা আছে।
ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা আবদুল কাদির মিয়া ইনকিলাবকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে তদন্ত হয়েছে। তদন্তের পর দোষী ব্যক্তিকে বরখাস্ত করা হয়েছে। কাদির বলেন, আমাদের ওপর দায় আসবে কেন? আমরা তো জাল চেক ধরে টাকা ছাড় না করতে ব্যাংককে নির্দেশ দিয়েছি। এ কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ টাকা রক্ষা পেয়েছে।
ঢাকা জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখার এক কর্মকর্তার অসদাচরণের কারণে প্রবীণ রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা ও আ ন ম শাহজাহানকে জীবন দিতে হয়েছে। বছরের পর বছর ঘুরেও তিনি হাতিরঝিল প্রকল্পে অধিগ্রহণকৃত তাঁর ওয়ারিশান সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ পাচ্ছিলেন না। গত ২৪ অক্টোবর তিনি ক্ষতিপূরণ আনতে সেখানে যান। টাকা না পাওয়ার কারণ তিনি তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা মাশফাকুর রহমানের কাছে জানতে চান। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মাশফাকুর মোবাইল কোর্ট বসিয়ে শাহজাহানকে এক মাসের কারাদন্ড দেন। এ ঘটনায় শাহজাহান মর্মাহত হন ও মানসিকভাবে প্রচন্ড আঘাত পান। কোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বাসায় ফিরে তিনি এ অপমান সহ্য করতে না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
ঢাকা জেলা প্রশাসকের দপ্তরে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কারণে তাদের মানসম্মান ধুলায় মিশে যাচ্ছে। এতটা নোংরাভাবে সেখানে ঘুষ আদায় করা হয়, তা সত্যি নজিরবিহীন। নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুষ না দিলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের বছরের পর বছর হয়রানি করা হয়। এমনকি ভুয়া অভিযোগ দাঁড় করিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে রাখা হয়। একাধিক চক্র নির্ধারিত দালালের মাধ্যমে ভুয়া মামলা করে তাদের হয়রানি করে। হয় ঘুষ দাও, না হয় দিনের পর দিন ঘুরতে থাকো। ঢাকার শুধু একটি ভূমি অধিগ্রহণের ঘটনায় (নম্বর-২০, ২০১৫-২০১৬) ৩৬৪টি আপত্তি মামলা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে ক্ষতিপূরণের এক হাজার ৫০০ কোটি টাকা আটকে আছে। এ টাকা কখন অধিগ্রহণকৃত জমির মালিকদের দেওয়া হবে,সেটা প্রায় অনিশ্চিত। হাতিরঝিল প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা আশরাফ উদ্দিন সাত-আট বছর ধরে ক্ষতিপূরণের টাকার জন্য এখানে পাননি। তার বাড়ির ভুয়া মালিক সেজে এক ব্যক্তি একটি মামলা করেছে। সে ব্যক্তি বলছে, তাকে অর্ধেক টাকা দিলে মামলা তুলে নেবে। তা না হলে ১০০ বছরেও মামলা তুলবে না। সেই মামলা ডিসি অফিসের লোকজন করেছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ