Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬, ২৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

কুখ্যাত তাতারদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে মামলুক বাহিনীর নিকট

খালেদ সাইফুল্লাহ সিদ্দিকী | প্রকাশের সময় : ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

প্রায় শতাব্দীকাল পর্যন্ত মধ্য এশিয়াসহ মুসলিম দুনিয়ার সর্বত্র হিংস্র বর্বর চেঙ্গিসখানের বংশধর তাতার-মুঘলদের ধ্বংসলীলা ও অপ্রতিরোধ্য জয়যাত্রা ঠেকানোর কোনো শক্তি ছিল না। হালাকু খানের বর্বরতা ও নৃশংসতা ইসলামের কলঙ্কিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে। তাতারী সয়লাব প্রতিহত করার কথা চিন্তা করা যেত না। কিন্তু ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা, রক্তপিপাসু শক্তিকে একসময় মিসরের মামলুক বাহিনীর কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়। এ মামলুক তথা দাস রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এক মহিয়সী নারী শাজারাতুর দোরা। মিসরেও ‘মামলুক’ বা দাস রাজবংশের ইতিহাস এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মামলুকরা প্রধানত দুইভাগে বিভক্ত ছিল। যথা- বাহরি ও বুরজি। উভয় বংশের ৪৭ জন সুলতানের মধ্যে ২৪ জন বাহরি ও ২৩ জন বুরজি সুলতান রাজত্ব করেন।
আইউবীয় সুলতান আল আস সালেহর বিধবা পত্মী শাজারাতুর ছিলেন মামলুক বংশের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ইতোপূর্বে বাগদাদের খলিফা আল মোস্তাসেমের হেরেমের একজন কৃতদাসী ছিলেন। অতঃপর তিনি সুলতান আস সালেহর অধীনস্থ হন এবং স্বল্পকাল পর সুলতান তাকে দাসত্ব থেকে মুক্তি দেন।
শাজারাতুর মাত্র ৮০ দিন রাজত্ব করেন। তিনি নিজের নামে মুদ্রা প্রচলন করেন ও জুমার খোতবায় তার নাম পাঠ করেন। অল্প দিনের মধ্যেই সাম্রাজ্যের আমীররা মহিলা শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন। অতঃপর তারা রাজ্যের প্রধান সেনানায়ককে (আল মোয়েজ ইজ্জদ্দীন) সুলতানের পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেন। অবশেষে অনন্যোপায় হয়ে শাজারাতুর প্রধান সেনানায়ক আইবেকের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হতে বাধ্য হন।
এভাবেই আইবেক বাহরি মামলুকদিগের প্রথম সুলতান নির্বাচিত হলেন। পরবর্তীকালে আইবেকের সঙ্গে শাজারাতুরের সাথে মতৈক্য হয়। মাত্র সাত বছর রাজত্ব করার পর সুলতানা শাজারাতুর তাকে হত্যা করেন এবং তিনি নিজেও নিহত হন। আইবেকের শোচনীয় মৃত্যুর পর তার ছেলে আলী (আল মুনসুর নূরুদ্দিন) ইবনে আইবেক সিংহাসনে আরোহণ করেন।
আইবেকের রাজত্বকালেই কুতুজ (আল মালিক আল মোজাফফর সাইফুদ্দীন মামলুক রাজবংশের তৃতীয় বা চতুর্থ সুলতান) বিশেষ প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তিনি আইবেকের ছেলে মনসুরের অভিভাবক নিযুক্ত হন এবং রাজ্যের সমস্ত শক্তি ক্রমে তার হস্তগত হয়। কুতুজ ছিলেন অসামান্য সমরকৌশল ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার অধিকারী।
কথিত আছে, ইতোপূর্বে তাতারগণ এক যুদ্ধে কুতুজকে বন্দী করেছিল এবং অবশেষে আইবেক তাকে তাতারদের কাছ থেকে ক্রীতদাসরূপে গ্রহণ করেন। স্বীয় অধ্যাবসায়, সহিষ্ণুতা ও চরিত্র বলে কুতুজ সামান্য অবস্থা থেকে সুলতানের পদে অভিষিক্ত হন। তিনি বাহরি শ্রেণীর সুলতান। তার রাজত্বকাল ১২৫৯ থেকে ১২৬০ সাল পর্যন্ত। সিংহাসন লাভের আগেই তিনি আইউবীয় সুলতানের বিরুদ্ধে কার্কের যুদ্ধক্ষেত্রে যথেষ্ট রণনৈপুণ্য ও পারদর্শিতা প্রদর্শন করেন।
এটি মনসুরা যুদ্ধ নামে খ্যাত, যা লুই নবমের সঙ্গে হয়েছিল। এরপর কুতুজের নেতৃত্বেই সংঘটিত সেই আইনে জালুত যুদ্ধ- যা ইসলামের ইতিহাসে এক চূড়ান্ত সংগ্রাম বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। এই যুদ্ধে কুতুজের সুদক্ষ সেনানায়ক বাইবার্স (আল মালিক আজ জাহের) অসামান্য রণনৈপুণ্যের পরিচয় দেন এবং মোঙ্গলদের বিপন্ন করে তোলেন। ফলে মোঙ্গলরা (তাতার) পরাজিত হয়।
আইনে জালুত-নাসেরার নিকটবর্তী ফিলিস্তিনের একটি স্থানের নাম। ওই স্থানে সংঘটিত যুদ্ধ সুলতান কুতুজ ও বাইবার্সকে ইতিহাসে অমর করে রাখে। যদিও বাইবার্সের হাতে সুলতান কুতুজ শোচনীয়ভাবে নিহত হন, তথাপি কুতুজের আমলে আইনে জালুত যুদ্ধে বাইবার্সের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা ইতহাসের একটি স্মরণীয় ঘটনা।
এই যুদ্ধের পর মিসর কেবল তাতারদের আক্রমণ থেকেই রক্ষা পায়নি, এমনকি মামলুকদের হাতে তাদের শক্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় এবং মামলুকরা তাদের একটার পর একটা দুর্গ অধিকার করে নেয়। তাই আইনে জালুত যুদ্ধকে ইসলামের ইতিহাসে এক চ‚ড়ান্ত ঘটনা বলে গণ্য করা হয়। তাতাদের বিরুদ্ধে আইনে জালুতে এই তুমুল যুদ্ধ সংঘটিত হয় হিজরি ৬৫৮/১২৬০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর।



 

Show all comments
  • মনির হোসেন মনির ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২১ এএম says : 0
    তাতারদের ইতিহাসে আমাদের জন্য বহু শিক্ষা রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব বর্ণনা করে বলেন, ‘নিশ্চয়ই তাদের কাহিনীতে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় সমূহ রয়েছে’ (ইউসূফ ১২/১১১)। তিনি আরো বলেন, ‘অতএব এদের কাহিনী বর্ণনা কর যাতে তারা চিন্তা করে’ (আ‘রাফ ৭/১৭৬)।
    Total Reply(0) Reply
  • জোবায়ের পরশ ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২২ এএম says : 0
    সপ্তম হিজরির প্রথমার্ধে তাতার শব্দটি ছিল মুসলমানদের কাছে ভীতি ও আতংকের প্রতীক। তাতারীদের হাতে একের পর এক মার খেতে খেতে মুসলমানরা বিশ্বাস করে নিয়েছিল, তাতারীরা অজেয়। আরবীতে প্রবাদ প্রচলিত ছিল: ইযা কীলা লাকা ইন্নাত তাতরা ইনহ্যযামু ফালা কতুসাদ্দিকু যদি বলা হয় তাতারীরা হেরে গেছে, তাহলে সে কথা বিশ্বাস করো না। মুসলমানদের ওপর তাতারীদের এই মার আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য নির্ধারিত হয়েছিল। কয়েকশো বছর থেকে তারা দীনের দায়িত্ব পালনে অবহেলা করে আসছিল। ভোগ বিলাসিতা ও পার্থিব লোভ লালসার পেছনে ছুটে বেড়াচ্ছিল তারা অন্ধের মতো।
    Total Reply(0) Reply
  • তাসলিমা বেগম ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২২ এএম says : 0
    পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষ যত ধ্বংসলীলা চালিয়েছে তার সব কিছুকে ছাড়িয়ে যাবে তাতারদের ধ্বংসযজ্ঞ। বাগদাদ ধ্বংসকে কেন্দ্র করে বহু কবি কবিতা রচনা করেছেন। কেউবা গেয়েছেন শোকগাঁথা। অনেক ঐতিহাসিক লিখেছেন ইতিহাস গ্রন্থ। কিন্তু এর ভয়াবহতা বর্ণনা করে কেউ পরিসমাপ্তি টানতে পারেননি।
    Total Reply(0) Reply
  • Zulfiqar Ahmed ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২৩ এএম says : 0
    অনৈক্য, বিভেদ, আত্নকলহ তাদের দীন ও মিল্লাতের সংহতি বিনষ্ট করে ফেলেছিল এবং বিশেষ করে দুনিয়ায় ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের মূলোৎপাটনের যে দায়িত্ব তাদের উপর অর্পিত হয়েছিল তার সম্পূর্ণ উলটো পথে তারা চলতে শুরু করেছিল। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের জন্য এই ধরনের মারাত্মক শাস্তি ছাড়া আর কি আশা করা যেতে পারে?
    Total Reply(0) Reply
  • মো রেযাউল ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২৪ এএম says : 0
    বাদশাহ বখতে নছর বায়তুল মাকদাস ধ্বংস ও তার অধিবাসী বনু ইসরাঈলদের হত্যা করেছিলেন। কিন্তু বাগদাদ ধ্বংসের সাথে তার তুলনা হবে না। দাজ্জাল পৃথিবীতে এসে মানুষ হত্যা করবে। কিন্তু তার অনুসারীদের রেহাই দিবে। পক্ষান্তরে তাতার এমন এক রক্তপিপাসু জাতি ছিল, যারা নারী-পুরুষ ও শিশু সবাইকে হত্যা করেছে। এমনকি গর্ভবতী নারীদের গর্ভপাত ঘটিয়ে ভ্রূণকেও হত্যা করেছে। বিশ্ব হয়তো ইয়াজূজ-মাজূজ ব্যতীত কারো দ্বারা এরূপ হত্যাকান্ড কখনো দেখেনি এবং ভবিষ্যতেও দেখবে না।
    Total Reply(0) Reply
  • সত্য পথের পথিক ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২৬ এএম says : 0
    প্রায় অর্ধশতাব্দীকাল তাতারীদের হাতে নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হবার পর মুসলমানরা আবার কেমন করে চাঙ্গা হয়ে উঠলো, সে এক চমকপ্রদ ইতিহাস। যারা মুসলমানদেরকে সবংশে নির্মূল করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল তারা নিজেরই মুসলমানদের সারিতে এসে দাঁড়াল। ইসলামকে দুনিয়ার বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেবার জন্য যারা কসম খেয়ে বসেছিল তারা নত মস্তকে ইসলামের বাণী শিরোধার্য করে নিল। বিনা শর্তে তারা ইসলামকে নিজেদের একমাত্র জীবন বিধান বলে মেনে নিল। মধ্য এশিয়ার অর্ধসভ্য ও বর্বর তাতারীরা অবশেষে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বের কাছে মাথা নত করলো। তারা ইসলাম গ্রহণ করলো।
    Total Reply(0) Reply
  • সত্য চিরদিন সত্য ২২ জানুয়ারি, ২০১৯, ২:২৭ এএম says : 0
    তাতারীদের হাতে সপ্তম হিজরির ইসলামী বিশ্বের ধ্বংসযজ্ঞ যতটা বিস্ময়কর ছিল না তার চাইতে অনেক বেশি বিস্ময়কর ছিল তাদের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা। কারণ মুসলিম সমাজ ও ইসলামী বিশ্বের আভ্যন্তরীণ দুরবস্থা সেকালে তাতারীদের মতো একটি তাজাদম ও কষ্টসহিষ্ণু জাতির বিজয়কে নিশ্চিত করে দেবে এতে বিস্ময়ের তেমন কিছু নেই। কিন্তু ইসলামকে লাঞ্ছিত ও ধ্বংস করতে এসে ইসলামের নিকট বিজিত হওয়া সত্যিই ইতিহাসের সবচাইতে বিস্ময়কর ঘটনা।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ইসলাম


আরও
আরও পড়ুন