Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার ২৪ মে ২০১৯, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ১৮ রমজান ১৪৪০ হিজরী।

ফুটপাথ তুমি কার?

পুলিশ, ক্ষমতাসীন ও সিন্ডিকেটের মাশোহারা আদায়, মুক্ত ফুটপাথ ব্যবহার উপযোগী ও নিয়মিত তদারকি, মূল রাস্তা পরিহার করলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমবে

আবদুল্লাহ আল মামুন | প্রকাশের সময় : ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাজধানীজুড়ে ‘ট্রাফিক শৃঙ্খলা কার্যক্রম’ শুরুর পর এক সপ্তাহ পার হলেও বিশৃঙ্খল রয়ে গেছে সড়ক। এখনো ফুটপাথ বাদ দিয়ে মূল রাস্তা দিয়ে হাটছে পথচারীরা। নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া যত্রতত্র গাড়ি থামানো হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে দৌঁড়ে গাড়িতে উঠছে যাত্রীরা। চালক পথচারী কেউ মানছে না ট্রাফিক আইন। এদিকে ১৫ জানুয়ারি থেকে চলমান ট্রাফিক শৃঙ্খলা পক্ষ উদ্বোধনের সময় ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে ভবিষ্যতে অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন।
সড়ক সংশ্লিষ্ট নগরবিদরা মনে করেন, ফুটপাথমুক্ত ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। ফুটপাথ দখলে থাকায় পথচারীরা বাধ্য হয়েই মূল রাস্তা দিয়ে হাটা-চলা করে। যার কারণে সড়কের শৃঙ্খলা ফেরাতে সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো বারবার ভেস্তে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষকে আইন মানতে বাধ্য করার আগে ফুটপাথমুক্ত ও পথচারীদের ব্যবহার উপযোগী করতে হবে। একইভাবে ফুটপাথ থেকে চাঁদা আদায়কারী পুলিশের অসাধু কর্মকর্তা, ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম বন্ধ করা গেলে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরার সাথে সাথে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমবে।
গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীর গুলিস্তান, পল্টন, মতিঝিল, বাইতুল মোকাররম, নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, ফার্মগেট, আগারগাঁও, মিরপুর, মহাখালী, রামপুরা ও যাত্রাবাড়ী এলাকা ঘুরে ফুটপাতের বেহাল অবস্থা চোখে পড়েছে। এ সব এলাকার ফুটপাথে কোথাও এক ফুট জায়গায়ও ফাঁকা নেই। কোন কোন এলাকায় ফুটপাথের বাইরে মূল রাস্তায় দোকান বসিয়েছে হকাররা। এর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) গুলিস্তানের ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে অনেক লড়াই-সংগ্রাম করেও ব্যর্থ হয়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা (অঞ্চল-৫) এস এম অজিয়র রহমান বলেন, নিয়মিতভাবে ফুটপাথ দখলমুক্তকরণ অভিযান চলে। প্রায় প্রতিদিনই ঢাকার কোনো না কোনো জায়গায় অভিযান চালানো হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হতে না হতেই পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। তিনি বলেন, শুধু উচ্ছেদ অভিযান দিয়ে হবে না, সবাইকে সচেতন করা গেলে কেউ ফুটপাথ দখল করবে না। তখনই পথচারীরা ফুটপাথ ব্যবহার করতে পারবে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অধিকাংশ ফুটপাথ দখল করে কাপড়ের দোকান, খাবার হোটেল, ফলের দোকান, জুতার দোকানসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান বসিয়েছে হকাররা। ফুট ওভরব্রিজের নিচে গড়ে তোলা হয়েছে বাসের টিকিট কাউন্টার। ব্রিজের ওপরের অংশও হকারদের পাশাপাশি ভাসমান মানুষ ও ভিক্ষুকরা শুয়ে-বসে দখলে রেখেছে। নগরীর হাসপাতালগুলোর সামনের অবস্থায় আরও ভয়াবহ। এতে ইচ্ছে থাকলেও ফুটপাথগুলো পথচারীরা ব্যবহার করতে পারছে না। যার কারণে মূল রাস্তা দিয়ে চলতে বাধ্য হচ্ছে।
এ নিয়ে গুলিস্তানে উজালা সরকার নামে এক পথচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইচ্ছে থাকলেও ফুটপাথ দিয়ে চলতে পারছি না। অনেক ঠেলাঠেলি করে পথ চলতে হয়। তিনি বলেন, ফুটপাথের অবস্থা দেখলে মনে হবে এদেশে কোন আইন-কানুন নেই। ক্ষমতা আর গায়ের জোরে দেশ চলছে।
পল্টনে ব্যাংক কর্মকর্তা সৈকত খান বলেন, হকারদের ঠেলে ফুটপাথ দিয়ে চলতে গেলে প্রায় সময় মোবাইল ও মানিব্যাগ ছিনতাই হয়ে যায়। তিনি বলেন, ফুটপাথ দখল একদিনে হয়নি। এর সাথে ক্ষমতাসীন ও শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা ফুটপাথ দখলে রেখে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি করায় অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে না।
নিউমার্কেটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী ফারাজানা মীম বলেন, পথচারীরা ফুটপাথ ব্যবহার করতে পারলে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে কমে আসবে। কিন্তু সেটি এদেশে সম্ভব নয়। এই শিক্ষার্থী বলেন, ফুটপাথ দখলের সাথে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি জড়িত। সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন চাঁদাবাজদের আইনের আওতায় আনলে ভবিষ্যতে অন্যরাও ফুটপাথ দখলে ভয় পাবে। ফুটপাথ নিরাপদ থাকলে সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় মূল রাস্তা পরিত্যাগ করে ফুটপাথ ব্যবহার করবে।
এদিকে ফুটপাথ দখল করা হকার ও দোকানীদের বক্তব্য ভিন্ন। তারা বলছেন, পুলিশ, স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সিন্ডিকেটকে নিয়মিতভাবে মাসোহারা দিয়ে ব্যবসা করছেন তারা।
পুরানা পল্টনের গেঞ্জী বিক্রেতা রহিম শেখ বলেন, ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ‘পজিশন’ কিনেছি। প্রতিদিন ১০০ টাকা মাশোহারা দিচ্ছি। এর বাইরে পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের ঝামেলা রয়েছে। তাই চাইলেও পরিবারের কথা চিন্তা করে ফুটপাথ ছাড়া সম্ভব না।
গুলিস্তানের হকার আলতাফ বলেন, তার ‘পজিশন’ ১ লাখ টাকায় বিক্রি করতে পারেন। তিনি মার্কেটের ভেতরে দোকান করায় পজিশনটি এখন ভাড়া দিয়েছেন।
ফার্মগেটের জুতার দোকানী বলেন, বর্তমান হকারা উঠে গেলেও কয়েকদিনের মধ্যেই অন্য একটি গ্রুপ আবারও ফুটপাথ দখল করবে। তিনি বলেন, ফুটপাথের দোকানীরা খুবই অসহায়। আমরা পেটের দায়ে পুলিশের তাড়া খেয়েও ব্যবসা করে যাচ্ছি। চাঁদা আদায়কারী সিন্ডিকেটগুলো নিজেদের স্বার্থে হকার ও ব্যবসায়ীদের ব্যবহার করে কোটিপতি হচ্ছে।
এ বিষয়ে সড়ক বিশেষজ্ঞ বুয়েটের ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, সড়কে স্থায়ীভাবে শৃঙ্খলা ফেরাতে রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগকে শক্তিশালী ও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। শুধু ফুটপাথ মুক্ত করলেই হবে না নিয়মিতভাবে তদারকি করতে হবে। তাহলে পথচারীরা মূল রাস্তা পরিহার করে ফুটপাথ দিয়ে চলাচলে অভ্যস্ত হবে।
নগর পরিবহন বিশেষজ্ঞ ড. সালেহ উদ্দিন বলেন, রাজধানীর ফুটপাথকে দখলমুক্ত রেখে ব্যবহার করা গেলে নগরীর যানজট অনেকটা কমে যাবে। মুক্ত ফুটপাথ দিয়ে পথচারীরা হাঁটতে পারলে কেউ আর রাস্তায় নামবে না। তিনি বলেন, ফুটপাথ ব্যবহার করতে না পারায় নগরবাসী প্রধান সড়ক দিয়ে চলাফেরা করে। এতে দুর্ঘটনা যেমন ঘটছে তেমনি সড়কের বিশৃঙ্খলাও বাড়ছে। তার মতে, গুলিস্তান, মহাখালী, নিউমার্কেট ও মতিঝিল এলাকার ফুটপাথকে মানসম্মতভাবে তৈরি করে দখলমুক্ত রাখা গেলে এ সব এলাকার যানজট অনেক কমে যাবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সড়ক


আরও
আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ