Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ০৩ কার্তিক ১৪২৬, ১৯ সফর ১৪৪১ হিজরী

সিলেটে থামছেনা আত্মহত্যার রথ

এক বছরে ৮১ জনের মৃত্যু অধিকাংশই তরুণ

সিলেট ব্যুরো | প্রকাশের সময় : ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯, ১:৪৫ পিএম

গত ১৪ জানুয়ারি নগরীর বাগবাড়ি এলাকা থেকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাইফুর রহমান প্রতীকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের অনার্সে ফাস্ট হওয়া এই শিক্ষার্থী আত্মহত্যার জন্য তার বিভাগের শিক্ষকদের দায়ী করে প্রতীকের পরিবার। আর শাবি'র উপাচার্য এই আত্মহত্যার জন্য দায়ী করেন প্রতীকের পরিবারকে। মেধাবী এই শিক্ষার্থীর হঠাৎ আত্মহত্যার পথ বেছে নেওয়া নিয়ে দেশজুড়েই চলছে নানা আলোচনা-বিশ্লেষণ।

শুধু প্রতীকের আত্মহত্যার ঘটনায় নয়, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেটে বেড়েছে আত্মহত্যার প্রবণতা। সিলেট মহানগর পুলিশের হিসেব মতে, গত একবছরে সিলেটে আত্মহনন করেছেন ৮১ জন। যাদের বেশিরভাগই তরুণ এবং শিক্ষিত। আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার জন্য চারটি কারণকে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মহানগর পুলিশের হিসেব মতে, ২০১৭ সালে সিলেটে আত্মহত্যা করেন ৭০ জন। আর ২০১৮ সাল আত্মহত্যা করেছেন ৮১ জন। এরমধ্যে কোতোয়ালী থানা এলাকায় ২৪ জন, জালালাবাদ থানায় ১৯ জন, বিমানবন্দর থানার আওতায় ১৪ জন, দক্ষিণ সুরমা থানার আওতায় ২ জন, শাহপরান থানার আওতায় ১৩ জন এবং মোগলাবাজার থানা এলাকার আওতায় ৬ জন আত্মহত্যা করেছেন।

সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা সিলেটটুডে টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই আত্মহত্যাকারীদের সংখ্যায় অধিকাংশই পুরুষ। বয়সের হিসেবে অধিকাংশেরই বয়স ১৬ থেকে ২৪ এর ভিতরে। তবে আত্মহতননকারীদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই ২৪ থেকে ৩৫ বছর বয়সের। এদের বেশির ভাগই শিক্ষিত শ্রেণির মানুষ বলে জানিয়েছেন তিনি।

মহানগর পুলিশের এ অতিরিক্ত উপ-কমিশনার বলেন, বেকারত্ব, নেশাগ্রস্ততা, পারিবারিক কলহ, ঋণগ্রস্ত এবং প্রেম- এসব কারণেই বেশিরভাগ আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে।

জেদান আল মুসা আরো বলেন, যেসব নারীরা আত্মহত্যা করেন তারা বেশির ভাগই সংসার জীবনে অশান্তি, স্বামীর নির্যাতন, স্বামীর সাথে মতের অমিল বা পরকীয়ায় আসক্ততার কারণে। আবার কেউ কেউ স্বামীর পরকীয়া আসক্ততার কারণেও অশান্তিতে ভোগে আত্মহত্যা করেন বলে মনে করছেন তিনি।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা এটিকে একটি মানসিক ব্যাধি হিসেবেই চিহ্নিত করছেন। এ ক্ষেত্রে সামাজিক সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক সচেতনতা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততা এবং প্রয়োজনে মনরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা। বিশেষজ্ঞরা আত্মহত্যার কারণ হিসেবে মূলত ৪ টি বিষয়কেই দায়ী করছেন।

সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইকেট্রিক বিভাগের প্রধান ডা. আর. কে. এস রয়েল বলেন, ১৬ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে ছেলে-মেয়েদের ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না পাওয়া, ২৪ থেকে ৩০ এর ভিতর বয়সে বেকারত্ব বা কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছাতে ব্যর্থতা, ৩০ থেকে ৩৫ এর ভিতর বয়সের লোকদের সংসার জীবনে অশান্তি, স্বামী-স্ত্রীর মতের অমিল, পরকীয়া, স্বামীর নির্যাতন ইত্যাদি এবং নেশাগ্রস্থতা- এই চারটি কারণেই মানুষ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে আত্মহত্যা করে থাকে। এর প্রতিটিই মানুষের মাঝে এক ধরণের মনরোগ তৈরি করে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর পরিবার থেকে ভালো ফলাফলের পাশাপাশি যে খারাপ ফলাফল হলে সেটা মেনে নিতে হয় সে উৎসাহ না দেয়ার কারণেই অনেকাংশে ছেলেমেয়েরা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এছাড়া বেকারত্ব এবং কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে যারা ব্যর্থ হয় তাদের ক্ষেত্রেও অনেক সময় আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দেয়। সে ক্ষেত্রে সামাজিক, পারিবারিক সচেতনতা প্রয়োজন। অভিভাবকদের বন্ধুসুলভ আচরণই পারে এসব বিষয় রোধ করতে। তাদেরকে বুঝাতে হবে একটি পথ বন্ধ হলে আরো অনেক পথ খোলা আছে।

এই মনরোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, সংসার জীবনে অশান্তির জন্য মূলত আমরাই দায়ী। আমরা ছেলে-মেয়ে বিয়ে দেয়ার পর তাদের ইচ্ছা মতো চলতে দেই না, স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে বুঝতে সময় লাগে সে ক্ষেত্রে মতে অমিল হয় এতে তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা না করে ভিতরে ভিতরে রেখে অশান্তিতে ভোগেন, তাছাড়া অভাবগ্রস্ততার কারণে সংসারে অশান্তি থাকে। এ ক্ষেত্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনই একে অপররের সাথে বন্ধুসুলভ থাকাটা জরুরি।

সিলেট আনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এড. এমাদউল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন আত্মহত্যাকে আইনগত অপরাধ উল্লেখ করে বলেন, দেশে উদ্বেগজনক হারে আত্মহত্যা বাড়ছে। কারণ দেশে বর্তমান সময়ে উচ্চ শিক্ষিত, মধ্য শিক্ষিত লোকদের চাকরির প্রচুর অভাব। এসব কারণে বেকারত্ত্ব বাড়তে বাড়তে তাদের মধ্যে আত্মহত্যা প্রবণতা দেখা দেয়।

তিনি বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকরণের কারণে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ছেলে-মেয়েদের প্রথম হতে চাপ দেন। কারণ টাকা খরচ করে পড়াচ্ছেন এতে প্রথম হলে খরচ কমবে এমন ধারণা থেকে তাদের চাপ প্রয়োগের ফলে ছেলে-মেয়েরা প্রথম না হতে পেরে বা ভালো ফল না করতে পারলেও কেউ কেউ আত্মহত্যা করেন এবং ইন্টারনেটের অপব্যবহারের কারণেও কিছু কিছু ছেলে-মেয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারে বলে মনে করেন আনজীবী সমিতির সাবেক এ সভাপতি।

তিনি বলেন, এসব কারণ ছাড়াও পারিবারিক অশান্তির অনেক কারণের মধ্যে পুঁজিবাদী স্বাতন্ত্রিকরণটাই মূলত দায়ী। এখনকার স্বামী-স্ত্রী আলাদা আলাদা সম্পদ করতে চান। তাদের সম্পদের হিসেব আলাদা থাকে। এতে তাদের মধ্যে স্বাতন্ত্রীকরণের ফলে বৈষম্য তৈরি হয়। এসব কারণে তাদের মতানৈক্য দেখা দেয়। এক সময় অশান্তি বিরাজ করে। এসব কারণে কলহ, পরকীয়াসহ নানা সমস্যা তৈরি হয়। এতেও আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ে।

আত্মহত্যা দন্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ যদি আত্মহত্যা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে তার ১ বছরের কারাদন্ড বা জরিমানা অথবা উভয়টি হতে পারে। এর কেউ যদি কাউকে আত্মহত্যায় সহযোগিতা করে সে ক্ষেত্রে তার ১০ বছরের কারাদন্ড বা জরিমানা অথবা উভয়টিও হতে পারে। এমনকি এটি সামাজিক, ধর্মীয় অনুশাসন অনুযায়ীও অন্যায় এবং পাপ কাজ। এজন্য এসব বিষয়ে সকলের সচেতনতা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: আত্মহত্যা

১৭ অক্টোবর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ