Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৭, ১৩ রবিউস সানি ১৪৪২ হিজরী

কোটিপতি কর্মচারী!

দুদকের অনুসন্ধান

মালেক মল্লিক | প্রকাশের সময় : ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

আফজাল হোসেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের চতুর্থ শ্রেণীর একজন কর্মচারী। শত কোটি টাকার মালিক তিনি। ঢাকায় রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। বিলাসবহুল গাড়ি। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে বিপুল অঙ্কের অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। এই কর্মচারীর সিটি ব্যাংক ও এবি ব্যাংকে জমা রয়েছে কোটি টাকা। এমনকি তার স্ত্রী রুবিনা খানমও ঢাকায় বেশ কয়েকটি বাড়ির মালিক। আফজাল গত এক বছরে সপরিবারে বিদেশ সফর করেছেন ২৮ বারের বেশি। দুুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে এসব অবৈধ সম্পদের ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে। ইতোমধ্যে আফজাল ও তার স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই দম্পত্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
এদিকে গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দুর্নীতি চক্র ভাঙতে সুপারিশ করেছে দুদক। একই সঙ্গে অধিদপ্তরের ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের কাছে চিঠি দিয়েছে দুদক।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিক্যাল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ (ভারপ্রাপ্ত) কর্মকর্তা মো. আফজাল হোসেন ও তার স্ত্রী একই অধিদপ্তরের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন শাখার স্টেনোগ্রাফার রুবিনা খানম। আফজালকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। দুদকের উপ-পরিচালক (জনসংযোগ কর্মকর্তা) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য ইনকিলাবকে বলেন, আফজালের কাছে সম্পদ বিবরণীর নোটিশ দেয়া হয়েছিল। উনি সম্পদের হিসাব দিয়েছেন। তবে দুদকের অনুসন্ধানে তাদের শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এইসব বিষয়ে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে। এরপর আইন অনুযারী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরো বলেন, দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আফজালের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
দুদক সূত্রে জানা যায়, গত ৯ জানুয়ারি দুদকের উপ-পরিচালক সামসুল আলম স্বাক্ষরিত চিঠি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর ৪ জনকে তলব করে নোটিশ পাঠানো হয়। এদের মধ্যে দুদকের জিজ্ঞাসাবাদে হাজির হন ডা. আনিসুর রহমান ও আফজাল হোসেন। এরপরই শুরু অনুন্ধান। এতে উঠে আসে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। আফজাল হোসেন ও তার স্ত্রীর নামে রাজধানীর উত্তরায় ১৩ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর রোডে তিনটি পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে। বাড়ি নম্বর ৪৭, ৬২ ও ৬৬। ১৬ নম্বর রোডে রয়েছে পাঁচতলা বাড়ি। বাড়ি নম্বর ১৬। উত্তরার ১১ নম্বর রোডে রয়েছে একটি প্লট। এসবের বাইরে সিটি ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্টে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা করেছেন আফজাল। এছাড়া আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি হিসাবের তথ্যও পেয়েছে দুদক।
এছাড়া রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ও ফরিদপুরের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে তাদের অঢেল সম্পদ। অস্ট্রেলিয়ায় রয়েছে তাদের বাড়ি। দুদক সেই বাড়ির সন্ধানও পেয়েছে বলে জানা যায়। আফজাল হোসেনের মাসিক বেতন মাত্র ২৪ হাজার টাকা হলেও তিনি মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বিলাসবহুল একটি বাড়ি কিনেছেন। তিনি গত এক বছরে বিভিন্ন দেশে ২৮ বারের বেশি সপরিবারে সফর করেন। আফজালের প্রাডো, পাজেরো, হ্যারিয়ারের মতো দামি গাড়ির মালিক। তার স্ত্রী রুবিনা খানম একজন স্টেনোগ্রাফার। তার নামেও রাজধানী ঢাকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি ভবন। দুদকের কাছে জমা দেয়া সম্পদের বিবরণীতে তারা ১২ কোটি টাকার সম্পত্তি কথা জানিয়েছেন। তবে দুদকের অনুসন্ধানে তাদের শত কোটি টাকার সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। গত ১০ জানুয়ারি এ কর্মকর্তা আফজাল দম্পতিকে তাদের সম্পত্তির বিষয়ে দুদকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বিপুল সম্পদের তথ্য পেয়েই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এই দুজনের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। আফজাল হোসেন ও তার স্ত্রী রুবিনা খানমের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
২৩ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদকের চিঠি: স্বাস্থ্য অধিদফতরের দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগে অভিযুক্ত ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চিঠি দিয়েছে দুদক। গতকাল বুধবার দুদকের ভারপ্রাপ্ত সচিব স্বাক্ষরিত এই ২৩ জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিবের কাছে এই চিঠি পাঠানো হয় বলে জানা যায়।
২৩ কর্মকর্তা হলেন: স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (স্বাস্থ্য)-এর কার্যালয়ের সহকারী প্রধান (পরিসংখ্যানবিদ) মীর রায়হান আলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক হাসান, প্রধান সহকারী আশরাফুল ইসলাম, প্রধান সহকারী সাজেদুল করিম, উচ্চমান সহকারী তৈয়বুর রহমান, উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধি দফতরের পরিচালকের কার্যলয়ের প্রধান সহকারী ফয়জুর রহমান, প্রধান সহকারী মাহফুজুল হক, কম্পিউটার অপরেটর আজমল খান, ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য অধি দফতরের পরিচালকের কার্যলয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান,প্র্রধান সহকারী-কাম হিসাবরক্ষক আব্দুল কুদ্দুস, সিলেটের স্বাস্থ্য অধি দফতরের পরিচালকের কার্যলয়ের প্রধান সহকারী নুরুল হক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোস আহমেদ, উচ্চমান সহকারী আমান আহমেদ, অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার অপরেটর নেছার আহমেদ চৌধুরী, খুলনা স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যলয়ের ব্যক্তিগত সহকারী ফরিদ হোসেন, অফিস সহকারী মো. মাসুম, প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেন, বরিশাল স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালকের কার্যলয়ের প্রধান সহকারী মো. রাহাত খান, উচ্চমান সহকারী জুয়েল, রংপুর স্বাস্থ্য অধি দফতরের পরিচালকের কার্যলয়ের উচ্চমান সহকারী আজিজুর রহমান,স্টেনোগ্রাফার সাইফুল ইসলাম এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম। স্বাস্থ্য অধিদফতরে অধিনস্ত বিভিন্ন কার্যালয়ের কতিপয় দুর্নীতিবাজ স্বেচ্ছাচারী ও ক্ষমতা অপব্যবহারকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করার সুবাদে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। যা স্বাস্থ্য অধিদফতরের সুশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে দুদকের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: দুদক

২৯ অক্টোবর, ২০২০

আরও
আরও পড়ুন