Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার ১৯ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬, ১৬ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

নির্বাচনের আগে কংগ্রেসের ট্রাম্পকার্ড প্রিয়াংকা গান্ধী

রক্তে রাজনীতি

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

অবশেষে ট্রাম্পকার্ড ছুড়লো ভারতীয় ন্যাশনাল কংগ্রেস। রাজনীতির রক্ত থেকে জন্ম নেয়া প্রিয়াংকা গান্ধীকে উত্তরপ্রদেশ পূর্ব শাখা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক পদ দিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় করানো হল। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। চলতি বছরের নির্বাচনের আগে তার এ নিয়োগকে মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে মনে করা হচ্ছে। আগের জাতীয় বা বিধানসভা নির্বাচনগুলোর সময় দলের প্রচারণা বা সমাবেশে দেখা গেলেও সরাসরি সাংগঠনিক কোনো দায়িত্ব নেননি কখনো। জাতীয় সংসদ বা লোকসভা নির্বাচনের কয়েকমাস আগে সেই ‘অস্ত্র’ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী সাংগঠনিক দায়িত্ব নিয়ে নেমে পড়লেন রাজনীতির মাঠে। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। গতকাল প্রিয়াঙ্কাকে এই পদে অধিষ্ঠিত করে তাকে উত্তর প্রদেশ পূর্বাঞ্চলের ‘ইনচার্জ’র দায়িত্ব দেন রাহুল গান্ধী। এই অঞ্চলেই কংগ্রেসের সবচেয়ে ‘বড় মাথা ব্যথা’ প্রধানমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা নরেন্দ্র মোদীর আসন, এখানেই বিজেপির আরেক নেতা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের লোকসভা আসন। বোঝাই যাচ্ছে, প্রতিদ্ব›দ্বী দলের ‘মূল খেলোয়াড়’কে কুপোকাত করতে প্রিয়াঙ্কাকে বেশ মাথা খেলিয়েই লড়তে হবে।
সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে বেশ কয়েকজনকে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এরা অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন করেন।
৪৭ বছর বয়সী প্রিয়াঙ্কাকে শীর্ষস্থানীয় এই পদে দায়িত্ব দিয়ে গতকাল বুধবার কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধী বলেন, ‘আমি শুধু দু’মাসের জন্য তাকে পাঠাচ্ছি না। উত্তর প্রদেশে কংগ্রেসের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য পাঠানো হচ্ছে তাকে।’
প্রিয়াঙ্কার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও চালচলনের মধ্যে অনেকে তার দাদি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে দেখতে পান। যদিও ২০০৪ সালে নির্বাচনী প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার পর এতোদিন ধরে মা সোনিয়া ও ভাই রাহুলের আসনেই (উত্তর প্রদেশের আমেথি ও রায়বেরেলি) নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলেন দুই সন্তানের জননী প্রিয়াঙ্কা।
লোকসভার ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৮০টিই উত্তর প্রদেশে। সেজন্য সরকার গঠনে উত্তর প্রদেশকে ‘কেন্দ্র’ হিসেবে ধরা হয়। আগেরবারের নির্বাচনে এই রাজ্যে ভরাডুবি হয়েছিল কংগ্রেসের। এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তাই এবার সাংগঠনিক কর্মকান্ড ও প্রচারণা চালাতে উত্তর প্রদেশকে দুই অঞ্চলে বিভক্ত করেছে কংগ্রেস। রাজ্যের পূর্বাঞ্চল সমন্বয়ের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে প্রিয়াঙ্কাকে। আর পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে।
কংগ্রেসের নেতারা বলছেন, প্রিয়াঙ্কাকে উত্তর প্রদেশের ময়দানে নামানোর ক্ষেত্রে রাহুলের যেমন মোদী-আদিত্যনাথের মতো ‘হেভিওয়েট’কে কুপোকাতের পরিকল্পনা আছে, তেমনি আছে কংগ্রেসকে ছাড়াই রাজ্যের আঞ্চলিক দল বহুজন সমাজ পার্টির নেতা মায়াবতী ও সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবের জোট গঠনের দৌড়ঝাঁপের প্রতি পাল্টা চ্যালেঞ্জও।
প্রিয়াঙ্কার স্বামী ব্যবসায়ী রবার্ট ভদ্র হরিয়ানা ও রাজস্থানে জমি সংক্রান্ত দুর্নীতিতে তদন্তাধীন রয়েছেন। যদিও অভিযোগ এবং তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আসছে কংগ্রেস। তবে স্ত্রী প্রিয়াঙ্কার এই সাংগঠনিক দায়িত্ব গ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছেন রবার্ট। বলেছেন সবসময়ই প্রিয়াঙ্কার পাশে থাকবেন তিনি।
কংগ্রেসের কর্মীরা মনে করেন, বিগত লোকসভা নির্বাচনে উত্তর প্রদেশের আসনগুলোতে বিপর্যয়ের পর ২০১৭ সালের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে কংগ্রেস জোট বেঁধে যে ভোট করেছে, সেখানে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে ভূমিকা পালন করেন প্রিয়াঙ্কা। তাছাড়া কংগ্রেসের যে সম্মেলনে রাহুলকে দলের প্রধান করা হয়, সেই বৈঠকও প্রিয়াঙ্কাই মা সোনিয়ার সঙ্গে মিলে তদারকি করেছেন বলে মনে করা হয়।
গেরুয়া বিজেপি শিবির থেকে উড়ে আসত কটাক্ষ, বিদ্রুপ। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে এআইসিসি সাধারণ সম্পাদক করার পর সেই পরিবারতন্ত্রের অভিযোগই আরও জোরদার করল বিজেপি। স্বাগত জানিয়েও খোঁচা দিতে ছাড়েননি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। বিজেপি নেতা সম্বিত পাত্র আবার আরও এক ধাপ এগিয়ে বললেন, ‘প্রমাণ হল রাহুল নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ।’ তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের বড় অংশই মনে করছেন, সক্রিয় রাজনীতিতে প্রিয়াঙ্কার অভিষেকের ফসল ঘরে তুলবে কংগ্রেস।
এইআইসিসিতে প্রিয়াঙ্কার অন্তর্ভুক্তির খবর ছড়িয়ে পড়তেই দেশ জুড়ে কংগ্রেস নেতা-কর্মী-সমর্থকরা নতুন করে উচ্ছ্বাসে ভাসছেন। উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের দুই শক্ত ঘাঁটি রায়বরেলী ও অমেথীতে উৎসবের আমেজ। আতশবাজি-আবিরে চলছে উদযাপন। দিল্লিতেও ২৪ আকবর রোডে কংগ্রেস সদর কার্যালয়ের সামনে উচ্ছ্বাসে মাতেন নেতা-কর্মীরা। দেশের বাকি অংশের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীদের অগণিত শুভেচ্ছায় ভাসছেন প্রিয়াঙ্কা।
মাস দু’য়েক আগে থেকে হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্য-সহ মোট পাঁচ রাজ্যে বিধানসভা ভোটের প্রচারে পরিবারতন্ত্রের অভিযোগে কংগ্রেসকে বিদ্ধ করেছে বিজেপি। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী একাধিক সভায় চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, একবার অন্তত গান্ধী পরিবারের বাইরের কাউকে দলের সভাপতি করে দেখাক। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সক্রিয় রাজনীতিতে পদার্পণের পরের মুহূর্তেই বিজেপি সেই অভিযোগকে আরও উচ্চগ্রামে নিয়ে গিয়েছে।
সেই পরিবারতন্ত্রের সঙ্গেই প্রিয়াঙ্কাকে শুধুমাত্র উত্তরপ্রদেশের দায়িত্ব দেওয়া নিয়ে খোঁচাও দিয়েছেন কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী তথা বিজেপি মুখপাত্র রবিশঙ্কর প্রসাদ। বলেন, ‘প্রিয়াঙ্কাজি কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। আমার শুভেচ্ছা। পরিবারভিত্তিক দলের থেকে এরকম সিদ্ধান্ত অপ্রত্যাশিত নয়। তবে তাঁকে শুধু উত্তরপ্রদেশের দায়িত্ব কেন দেয়া হল? তাঁর ক্যারিশমা ও ব্যক্তিত্ব রাজনীতির ময়দানে আরও বড় পরিসর দাবি করে।’
বিজেপির সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি তথা উত্তরপ্রদেশের নেতা জে পি নাড্ডা বলেন, ‘প্রিয়াঙ্কা সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হয়েছেন। কিন্তু সবাই জানেন, পারিবারিক সংস্থা কীভাবে কাজ করে। পরিবারতন্ত্র সম্পর্কে তাঁর কী মত, এ বার রাহুলের সেটা বলা উচিত।’
রাহুল গান্ধী সভাপতি পদে দায়িত্ব নেয়ার পর এক বছরের মধ্যেই হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যে সাফল্য পেয়েছে কংগ্রেস। তিন রাজ্যেই সরকার গঠন করেছে কংগ্রেস। কিন্তু বিজেপি সেটাকে সাফল্য হিসেবে মানতে নারাজ। প্রিয়াঙ্কার নিয়োগের পর দলের নেতা সম্বিত পাত্র বলেন, ‘পরিবারতন্ত্র আরও শক্তপোক্ত করতে প্রিয়াঙ্কার নিয়োগ প্রত্যাশিতই ছিল। একই সঙ্গে কংগ্রেস মেনে নিল যে, রাহুল গান্ধী ফেল করেছেন।’
বিজেপি সমালোচনা করলেও কংগ্রেসের এই পদক্ষেপ সদর্থক হিসেবেই দেখেছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। রাজনৈতিক নীতি নির্ধারণকারী জনতা দলের নেতা প্রশান্ত কিশোর যেমন বলেছেন, প্রিয়াঙ্কার সক্রিয় রাজনীতিতে নামা ‘ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে প্রতীক্ষিত অধ্যায়। ঠিক সময়ে এলেন কিনা, সঠিক দায়িত্ব দেয়া হল কিনা, সেসব সাধারণ মানুষ বিচার করবেন। তবে আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড় খবর যে, তিনি শেষ পর্যন্ত রাজনীতিতে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাঁকে স্বাগত।’ স্বাগত জানিয়েছেন অন্যান্য দলের নেতারাও।
কংগ্রেসে অবশ্য সর্বস্তরে এক সুর। প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে উচ্ছ্বসিত সবাই। দিল্লির দু’বারের মুখ্যমন্ত্রী শীলা দীক্ষিত বলেন, ‘শুধু নেতারাই নন, দলের নীচু তলার কর্মীরাও নতুন করে উজ্জীবিত হবেন।’ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা রাজ্যসভার সাংসদ রেণুকা চৌধুরীর প্রতিক্রিয়া, ‘এটা রাহুলের মাস্টারস্ট্রোক। আমরা সবাই এই সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করে ছিলাম।’
সোনিয়া গান্ধীর লোকসভা কেন্দ্র রায়বরেলি থেকে এবার প্রিয়াংকা ভোটে লড়তে পারেন বলেও জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল প্রিয়াংকার সক্রিয় রাজনীতিতে যোগদানের পরই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি এবার রায়বরেলি থেকে ভোটে লড়বেন প্রিয়াংকা গান্ধী? সূত্র মারফৎ জানা গেছে, এবারের ভোটে রায়বরেলি থেকে লড়তে পারেন সোনিয়া কন্যা।
উল্লেখ্য, গতকালই দু’দিনের সফরে রায়বরেলি যাবার কথা ইউপিএ চেয়ারপার্সনের। শারীরিক সমস্যার জন্য গত ৫ বছরে রায়বরেলিতে তেমনভাবে যেতে পারেননি সোনিয়া। প্রায় দেড় বছর আগে শেষবার রায়বরেলি গিয়েছিলেন মিসেস গান্ধী।
প্রিয়াংকার রাজনীতিতে যোগদান প্রসঙ্গে রাহুল গান্ধী বলেছেন, ‘আমার দিদি খুবই দক্ষ। উনি আমার সঙ্গেই কাজ করবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি খুবই খুশি।’ রাহুল আরও বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে দল তরুণ নেতা চেয়েছিল।’
প্রসঙ্গত, উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসকে ছাড়াই একে অপরের হাত ধরেছে সপা-বসপা। সে রাজ্যের ৮০টি লোকসভা কেন্দ্রে একলা লড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাহুল গান্ধীরা। এমন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পূর্ব উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের প্রধান হিসেবে প্রিয়াংকার অভিষেক যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ বলেই মত সংশ্লিষ্ট মহলের। পূর্ব উত্তরপ্রদেশের ৩০টি কেন্দ্রের দায়িত্ব বর্তেছে প্রিয়াংকার কাঁধে। যে কেন্দ্রগুলির মধ্যে রয়েছে মোদীর বারাণসী ও যোগী আদিত্যনাথের গোরাখপুর কেন্দ্রও। সূত্র : ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, আনন্দবাজার।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভারত


আরও
আরও পড়ুন