Inqilab Logo

ঢাকা রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২০, ১৬ কার্তিক ১৪২৭, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী
শিরোনাম

উপেক্ষিত সৈকত খনিজ বালু

বছরে হাজার কোটি টাকার তেজষ্ক্রিয় বালু বিক্রি সম্ভব উড়োজাহাজ তৈরিসহ শিল্প-বাণিজ্যে বিশ্বব্যাপী চাহিদা

শফিউল আলম | প্রকাশের সময় : ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:১০ এএম

পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের দেশ বাংলাদেশ। অথচ এদেশের অমূল্য এক সম্পদ সৈকত খনিজ ভারী বালুর অর্থনৈতিক সদ্ব্যবহার শুরু করা হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক আগ্রহ ও পৃষ্টপোষকতায় এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বামী কৃতী পরমাণু বিজ্ঞানী বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মরহুম ড. আবদুল ওয়াজেদ মিঞার নেতৃত্বে এদেশের বিজ্ঞানী ও গবেষকগণ বঙ্গোপসাগর সৈকতের খনিজ ভারী তেজষ্ক্রিয় বালু উত্তোলন বা আহরণের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বাজারজাত ও রফতানির লক্ষ্য পূরণে অনেকদূর অগ্রসর হয়েছিলেন। কিন্তু দীর্ঘ প্রায় চার দশক পরও সৈকতের অর্থকরী সম্পদ খনিজ বালু উপেক্ষিতই পড়ে আছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞগণ বলেছেন, দেশের সমুদ্র সৈকত থেকে বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকার তেজষ্ক্রিয় বালু বিক্রি করা সম্ভব। এই খনিজ তেজষ্ক্রিয়তা সম্পন্ন ভারী বিভিন্ন ধরনের বালু দিয়ে পৃথিবীর অনেক দেশে উড়োজাহাজ তৈরিসহ শিল্প-বাণিজ্যে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির শিল্পায়নে ব্যবহৃত হচ্ছে সৈকত ভারী বালু। সমুদ্র সৈকত বেষ্টিত বাংলাদেশের মতো অল্প সংখ্যক দেশেরই রয়েছে অমূল্য এ খনিজ সম্পদ। অথচ ‘হবে-হচ্ছে’ করে বাংলাদেশের খনিজ সম্পদটি অনাদরে অবহেলায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বঙ্গোপসাগরের সৈকত খনিজ ভারী ও তেজষ্ক্রিয় বালু আহরণের লক্ষ্যে সরকার অতীতে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু এ নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতা এবং কিছু দায়সারা তৎপরতা ছাড়া বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়নি। ১৯৭৫ সালে কক্সবাজারের কলাতলীতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (তখনকার আনবিক শক্তি কমিশন) বিশেষায়িত একটি সেন্টার স্থাপন করে। এরপর দীর্ঘ ৪৪ বছর ধরে কেবল গবেষণার মাঝেই এটি ঘুরপাক খাচ্ছে। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সৈকতের খনিজ তেজষ্ক্রিয় ভারী বালু, মাটি ও পাথর উত্তোলনের দূরদর্শী উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
জানা গেছে, কমিশনের বিজ্ঞানীদের চার দশকের গবেষণা ও অনুসন্ধানে ১৭টি ভারী খনিজ ও তেজষ্ক্রিয় বালুর স্তুপের সন্ধান মিলেছে। বিভিন্ন ধরনের খনিজ বালু ও পাথরের বিস্তৃতি, মজুদ, গুনগত মান নির্ণয় করা হয়। বিজ্ঞানীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অর্থনৈতিক তথা বাণিজ্যিকআহরণের ব্যাপক সম্ভাবনাময় যেসব সৈকত ভারী ও তেজষ্ক্রিয় খনিজ বালু চিহ্নিত করেন এরমধ্যে আছে, ইলমেনাইট, ম্যাগনেটাইট, গারনেট, জিরকন ও রুটাইল। এরপর রয়েছে টাইটানিয়াম, লিউকক্সিন, কেনাইট এবং মোনাজাইট। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, দেশের সমুদ্র উপকূলভাগে আহরণের মাধ্যমে এ ধরনের খনিজ বালু বিক্রি করা সম্ভব হবে প্রতিবছর কয়েক হাজার কোটি টাকা মূল্যের। এখন সেসব বালু ফেলনা এবং অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে।
অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, উচ্চ তেজষ্ক্রিয় (হাইলি রেডিয়েটেড) ভারী খনিজ বালু উত্তোলনের সময় যাতে কোনো প্রকারের জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে এরজন্য আন্তর্জাতিক মানের প্রাক-প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে হয়। এরপর খনিজ বালু উত্তোলন ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়া হবে নিরাপদ। এ বিষয়ে যথাযথ মানদণ্ড রয়েছে।
পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের ধারক বাংলাদেশের খনিজ ভারী বালু সম্পদের বেশিরভাগই মজুদ পাওয়া গেছে দক্ষিণ-পূর্বে কক্সবাজারে। নিরবচ্ছিন্ন সৈকত বেলাভূমি ধারণ করে আছে লাখ কোটি টাকা মূল্যের বিভিন্ন তেজষ্ক্রিয় খনিজ ভারী বালু। সেখানে মজুদ খনিজ বালুর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক টাইটানিয়াম, ইলমেনাইট, জিরকন, রুটাইল, মেগনেটাইট, লিউকক্সিন, কেনাইট, গারনেট ও মোনাজাইট পাওয়া গেছে। এছাড়া কুয়াকাটা, খুলনার সমুদ্র সৈকত ও উপকূলভাগে এ ধরনের খনিজ ভারী ও তেজষ্ক্রিয় বালু রয়েছে। কক্সবাজারে বার্ষিক ১ দশমিক ৭৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন তেজষ্ক্রিয় ভারী খনিজ বালু বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আহরণ করা সম্ভব। যা দেশের শিল্প-কারখানায় কাজে লাগিয়ে বিদেশে রফতানির সুযোগ রয়েছে। কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ, টেকনাফ থেকে খুলনা পর্যন্ত সমুদ্র তটরেখা বরাবর ভারী খনিজ বালু, মাটি, পাথরসহ হরেক মূল্যবান পদার্থের রাশি রাশি মজুদ থাকার বিষয়ে পরমাণু বিজ্ঞানীরা একমত।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দূরদর্শী পরিকল্পনার ফসল হিসেবে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন কক্সবাজারে একটি অপারেশনাল স্টেশন স্থাপন করে। এর আওতায় পাইলট প্রকল্পভিত্তিক স্থান বাছাই করে গবেষণার পাশাপাশি সীমিত পরিসরে খনিজ বালুর বাণিজ্যিক উত্তোলন সূচনা করা হলেও তা পরিপূর্ণতা পায়নি আজও। পরমাণু কমিশনের বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, কক্সবাজারের শহর থেকে টেকনাফ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ সৈকতে সমগ্র বালুর সাথে গড়ে ২৩ শতাংশ হারে ১৭ ধরনের তেজষ্ক্রিয় পদার্থসমৃদ্ধ ভারী খনিজ বালু মজুদ রয়েছে। যার প্রাথমিক পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ৪.৪৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন। খনিজ মূল্যবান ভারী বালু কক্সবাজারের নাজিরার টেক থেকে টেকনাফ ছাড়াও কুয়াকাটা, খুলনার সমুদ্রতটে ছড়িয়ে আছে। কক্সবাজার জেলায় কমপক্ষে ৮ হাজার হেক্টর জমিতে উপরোক্ত তেজষ্ক্রিয় ভারী খনিজ বালু মজুদ আছে।



 

Show all comments
  • Abdul Wadud Mian ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯, ১:৩৫ এএম says : 0
    বঙ্গোপসাগরের সৈকতের অর্থকরী সম্পদ খনিজ ভারী বালি কমার্শিয়াল ভিত্তিতে সংগ্রহ করা প্রয়োজন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: সৈকত খনিজ বালু

২৬ জানুয়ারি, ২০১৯
আরও পড়ুন