Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ০৭ ভাদ্র ১৪২৬, ২০ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

বরগুনায় এতিম নেই অনেক এতিমখানায় : বাড়ছে বরাদ্দ

মো. মোশাররফ হোসেন, স্টাফ রিপোর্টার, বরগুনা | প্রকাশের সময় : ২৯ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

বরগুনার ৬টি উপজেলায় যুগ যুগ ধরে অনেকগুলো এতিমখানা এতিমশূন্য থাকলেও সমাজসেবা অধিদপ্তরের যোগসাজশে কোটি কোটি টাকার ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট বরাদ্দ তুলছেন একটি কুচক্রী মহল। নামে-বেনামে বরাদ্দ দিয়ে প্রতি বছর সমাজসেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীসহ এতিমদের বরাদ্দের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন প্রতিষ্ঠান প্রধানরা। এতিম না থাকলেও প্রতি বছর বাড়ানো হচ্ছে এতিমের সংখ্যা, বাড়ছে ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট। প্রত্যেক এতিমের জন্য প্রতি মাসে এক হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। সমাজসেবা অধিদপ্তর যাদেরকে বরাদ্দ দিচ্ছেন তারাও বলছেন, দপ্তর ম্যানেজ করেই ক্যাপিটেশন বাড়াচ্ছেন এবং বরাদ্দ নিচ্ছেন। প্রতিবার বরাদ্দ দেয়ার পূর্বে সমাজ সেবা অধিদপ্তর কর্তৃক প্রতিটি এতিমখানা পরিদর্শন করার কথা থাকলেও বাস্তবে কিছুই হচ্ছে না।

জেলা সমাজসেবা অধিদফতর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর জেলায় ১৩১টি এতিমখানায় এতিম শিশুদের জন্য বছরে দুই কিস্তিতে সরকার থেকে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে প্রায় ৩ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২ হাজার ৩ শ’ ৬৩ জন এতিম শিশুর জন্য বছরে দুই কিস্তিতে সরকার থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ কোটি ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। যার ২য় কিস্তি এ সপ্তাহেই উত্তোলনের অপেক্ষায়। যার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ইতোমধ্যেই প্রস্তুত করা হয়েছে। ঠিক সে মুহূর্তে বরগুনার অনেকগুলো এতিমখানা সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কাগজ-কলমে থাকলেও অনেক স্থানেই বাস্তবে এতিমখানার কোন অন্তিত্ব নেই। কোথও কোথাও এতিমখানার নামে ছোট্ট একটা কুড়েঘর থাকলেও তা তালাবদ্ধ। সেখানে এতিমের কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রশ্নের জবাবে ওইসব এতিমখানার পরিচালকরা বলেন, এতিমরা ছুটিতে রয়েছে, বেড়াতে গেছে, রাতে আসলে পাবেন ইত্যাদি নানা খোড়া অজুহাত। বিশেষকরে অধিকাংশ স্বতন্ত্র এবং আলীয়া মাদরাসা সংলগ্ন এতিমখানাগুলোতে কোন এতিম পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রত্যক্ষদর্শী স্থানীয়রা বলছেন, এসব এতিমখানায় কখনই কোন এতিম থাকে না। নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক অনেক মাদরাসা শিক্ষকের কাছ থেকেই জানা গেছে, এতিমদের বরাদ্দ টাকা আত্মসাতে প্রতিষ্ঠান প্রধানসহ সমাজসেবা অধিদপ্তরের অসাধু কর্মকর্তারাও জড়িত রয়েছেন। প্রতিবার বরাদ্দ দেয়ার পূর্বে সমাজসেবা কর্তৃপক্ষের পরিদর্শনের নিয়ম থাকলেও ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দিলেই পরিদর্শন ছাড়া বরাদ্দ দেয়া হয় এতিমশূন্য এ এতিমখানাগুলোতে।

নীতিমালায় উল্লেখ রয়েছে, এতিমখানার বরাদ্দ পেতে হলে সর্বনিম্ন ১০ জন এতিম থাকতে হবে, কিন্তু অবৈধ অর্থ আয় করতে বছরের পর বছর এতিমশূন্য এসব এতিমখানায় বরাদ্দ দিয়ে আসছে বরগুনা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর। সরেজমিন তথ্যানুসন্ধানে অর্ধেকেরও বেশি এতিমখানা এতিমশূন্য পাওয়া গেছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে। অনেক মাদরাসায় সরকারী ক্যাপিটেশন আছে ৪০/৫০ জনের, কিন্তু এতিম আছে দেড় থেকে দুইশ’ জন। কওমী ও হাফেযী মাদরাসার ক্ষেত্রেই এমনটি বেশি পরিলক্ষিত হয়েছে।

এ ব্যাপারে সু-শাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বরগুনা জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা কাদের, বরগুনা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি সাংবাদিক হাসানুর রহমান ঝণ্টু, সেক্রেটারি জাফর হোসেন হাওলাদার, সাংবাদিক ইফতেখার শাহীন বলেন, সমাজসেবা অধিদপ্তর ও কিছু প্রতিষ্ঠান প্রধানদের যোগসাজশে এতিমদের বরাদ্দের টাকা প্রতিবছর হাতিয়ে নিচ্ছেন একটি কুচক্রী মহল। তাই এতিমদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাত বন্ধ করতে সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। এ ব্যাপারে তারা জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

বরগুনা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক (অ.দা.) খন্দকার গোলাম সরওয়ার জানান, বরগুনা জেলায় আমি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি। আমার সময় যদি বরাদ্দের টাকা দেয়া হয় তাহলে প্রত্যেক এতিমখানা পরিদর্শন করে বরাদ্দ প্রদান করা হবে। আর যে এতিমখানায় এতিম শিশু পাওয়া যাবে না সে সকল প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটেশন গ্র্যান্ট হারানোসহ বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হবে। এ কথার কোনো নড়চড় হবে না বলেও জানান তিনি।

বরগুনা জেলার চিত্র যদি দেশের ৬৪ জেলায় হয় তাহলে প্রতি বছর এতিমদের নামে বরাদ্দকৃত কত হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়? এতিমের টাকা আত্মসাতের অভিযোগে যদি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাস্তি হতে পারে তবে কেন দেশব্যাপী এতিমদের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতকারীদের কাছ থেকে আত্মসাতকৃত টাকা উদ্ধারসহ তাদের শাস্তি হবে না?



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ