Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬, ২৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

তাওবা ও ইস্তিগফার : গুরুত্ব ও উপকারিতা

মুফতী পিয়ার মাহমুদ | প্রকাশের সময় : ৩১ জানুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

(পূর্বে প্রকাশিতের পর)
একেই বলে তাওবা
পাঠক! একটু ভেবে দেখুন, লোকটির এ অসিয়ত কত নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ ছিল; বরং একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় যে, তার এ ভাবনা ও কাজটি ছিল কুফুরী ভাবনা ও কাজ। কারণ তার ধারণা ছিল, আল্লাহ যদি তাকে ধরতে পারেন, তাহলে তার আর রক্ষা নেই। তিনি তাকে এমন শাস্তি দিবেন, যে শাস্তি দুনিয়ার অন্য কাউকে দেওয়া হবে না। এ ধরণের আকীদা তো কুফুরী আকীদা। যেন তার ধারণা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছাইগুলোকে আল্লাহ তাআলা একত্রিত করে তাকে জীবিত করতে পারবেন না। কিন্তু আল্লাহ যখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, তখন সে উত্তর দিলো, হে আমার রব! এর কারণ ছিলো, কেবলমাত্র আপনার ভয়। এ উত্তর শুনেই আল্লাহ তার জীবনের সকল গুনাহ ও নাফরমানী ক্ষমা করে দিলেন। কারণ এ ব্যক্তি এ কাজ এ জন্যই করেছিল, সে মূলত কৃতগুনাহগুলোর উপর অনুতপ্ত হয়েছিলো, লজ্জিত হয়েছিলো, মৃত্যুর পূর্বে এ জন্য অনুশোচনাও প্রকাশ করেছিলো। আর একেই বলে তাওবা। তাই অসীম দয়ালু আল্লাহ তাকে মাফ করে দিয়েছেন। এ ঘটনাটিরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কেন বর্ণনা করলেন? এ ঘটনা বর্ণনার দ্বারা তিনি উম্মতকে এ শিক্ষা দিয়েছেন যে, গুনাহগার বান্দার কাছে আল্লাহর রহমত কেবল একটি জিনিস দাবি করে। তাহলো, কৃত গুনাহের উপর নির্ভেজাল অনুশোচনা প্রকাশ করবে, অনুতপ্ত হবে, লজ্জিত হবে, খালিছ দিলে তাওবা করবে। তাহলে আল্লাহ তাআলা তার কৃত সকল গুনাহই মাফ করে দিবেন।
শয়তান মানব হৃদয়ে প্রভাব বিস্তার করে কুমন্ত্রনা দেয়
কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে, [আদম আ.কে সিজদা না করার কারণে আল্লাহ তাআলা যখন ইবলিসকে অভিসম্পাত করে তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন তখন] ইবলিস বললো,‘আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ তথা হায়াত দিন। তার প্রার্থনা কবূল করে আল্লাহ তাআলা বললেন, তোকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ তথা হায়াত দান করা হলো। তখন সে বললো, যাদের জন্য আপনি আমাকে উদভ্রান্ত [বিতাড়িত] করেছেন, আমি অবশ্যই তাদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য আপনার সরল পথে বসে থকবো। তারপর বিভ্রান্ত করার জন্য তাদের কাছে আসবো তাদের সামনের দিক থেকে, পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে এবং বাম দিক থেকে। আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।’ [আরাফ:১৪-১৭] এক হাদীসে আছে, আবূ কালাবাহ রাহ. বলেন, আল্লাহ তাআলা যখন ইবলিসকে অভিসম্পাত করে তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন, তখন সে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ তথা হায়াত প্রার্থনা করেছিল। তার প্রার্থনা কবূল করে আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ তথা হায়াত দান করলেন। তখন সে বলেছিলো, আপনার ইজ্জতের কসম! আমি মানুষের হৃদয়কে আচ্ছন্ন [গুনাহ করতে প্ররোচিত করবো] করে রাখবো, যতক্ষণ তার দেহে প্রাণ থাকবে। আল্লাহ তাআলা তখন তাকে উত্তর দিয়েছিলেন, আমার ইজ্জতের কসম! আমিও তার থেকে তাওবার পর্দা উঠাবো না, যতক্ষণ তার দেহে প্রাণ থাকবে। অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত বনী আদমের তাওবা আমি কবূল করবো। [মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা, হাদীস:৩৪২১৭]
এ ধারণা ভূল
উপোরক্ত হাদীস ও আয়াতগুলো পড়ে কারো এই ভ্রম হতে পারে যে, শয়তান তো অনেক ক্ষমতার অধিকারী। তার সাথে মুকাবিলা করে মানুষ তো পেরে উঠবে না। এ ধারণা ভূল। কারণ শয়তানকে পরাজিত করা সম্ভব। আলোকিত মানুষের কাছে শয়তান পরাজিত হয়। শয়তানকে পরাজিত করার জন্য মুমিনের প্রধান হাতিয়ার হলো তাওবা। মূলত আল্লাহ তাআলা শয়তানকে সৃষ্টি করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত হায়াত দান করেছেন, মানব দেহে প্রবেশ করে কুমন্ত্রণা দেওয়ার ক্ষমতা দান করেছেন মানুষের পরীক্ষার জন্য।
আলোকিত ও পরহেযগার মানুষের কাছে শয়তান খুবই দুর্বল ও অসহায়
শয়তানকে এত ক্ষমতা দেওয়া সত্তেও সে আলোকিত ও পরহেযগার মানুষের কাছে খুবই দুর্বল ও অসহায়। এত দুর্বল যে, সে সহজেই তাদের সামনে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। অনায়েশেই তাঁরা শয়তানকে কুপোকাত করতে পারে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,
‘নিশ্চয় শয়তানের চক্রান্ত খুবই দুর্বল’ [নিসা:৭৬] মূলত শয়তান তাদের উপরই বিরত্ব ও কর্তৃত্ব দেখায়, যাদের হৃদয় আলোকিত নয়, ঈমান কমজোর ও গুনাহের ব্যাপারে বেপরোয়া। তবে আশার কথা হলো এই বুযদিল, কমজোর ঈমানদারদারাও যদি খালিছভাবে তাওবা করে, তাহলেও শয়তান কুপোকাত হয়ে যায়। তাওবার সামনে সে টিকতে পারে না। মোটকথা খাটি তাওবার সামনে শয়তানের সকল কুটচাল ও ষড়যন্ত্র দুর্বল ও ভজ্ঞুর।
বারবার তাওবাকারীকে আল্লাহ ভালোবাসেন
এক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা অধিকহারে তওবাকারী ও উত্তমভাবে পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালোবাসেন।’ [বাকারা: ২২২] সাহাবী আনাস রা. এর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘প্রত্যেক আদম সন্তানই বারবার ভুল করে। আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম হলো সেই ব্যক্তি, যে ভুলের পর তাওবা করে।’ [ইবনে মাজা, হাদীস:৪২৫১; তিরমিযী, হাদীস:২৪৯৯; আহমাদ, হাদীস:১৩০৪৯; মুসনাদে বায্যার, হাদীস:৭২৩৬] এর মাঝেই ইঙ্গিত রয়েছে, মোহের এই দুনিয়াতে মানুষের গুনাহের প্রতি আকর্ষিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তার দ্বারা গুনাহ প্রকাশ হতেই পারে। তবে মুমিনের কাজ হচ্ছে গুনাহ হওয়ার সাথে সাথেই তাওবা করে নিবে। তাহলে সে সর্বোত্তম ও আল্লাহর মাহবুব বান্দায় পরিণত হবে। আরো ইঙ্গিত রয়েছে, তাওবার পর তাওবা ভেঙ্গে যেতে পারে। আবারও গুনাহ হয়ে যেতে পারে। এতে ভেঙ্গে পড়া যাবে না। হিম্মত হারানো যাবে না। নব উদ্যমে আবার তাওবা করতে হবে। এভাবে যতবারই তাওবা ভঙ্গ হয়ে যাবে, ততবারই নতুন করে তাওবা করে নিবে। এভাবে চলতে থাকলে শয়তান দুর্বল ও নিস্তেজ হবে এবং পাপাচার কমতে থাকবে ইনশাআল্লাহ। [ইসলাহী মাজালিস:২০৯-২১১]
শয়তান মানুষের মাঝে নৈরাশ্য সৃষ্টি করে
মূলত মরদুদ শয়তান মানুষের মাঝে নৈরাশ্য সৃষ্টি করে। সে মানুষকে এভাবে বিপথগামী করে যে, সে মানুষের মনে একথা জাগিয়ে দেয় যে, তুই এত মারাত্মক ও ভয়ংকর গুনাহ করেছিস যে, তুই মরদুদ ও বিতাড়িত হয়ে গেছিস। তুই এত বেশি গুনাহ করেছিস যে, তোর আর কোনো মুক্তির পথ নেই। তাই তুই এখন যা ইচ্ছা কর। যে গুনাহ ইচ্ছা করতে পারিস। শয়তান মানুষের মাঝে এভাবে নিরাশা সৃষ্টি করে বিপথগামী করে। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে,‘হে আমার ঐ সকল বান্দা যারা নিজেদের উপর জুলুম করেছো, [গুনাহ করেছো, আল্লাহর নাফরমানী করেছো, কুফুর, শিরক ও বিদআতে লিপ্ত হয়েছো।] তারা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। [কারণ] নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাআলা সকল গুনাহই ক্ষমা করেন। নিশ্চয় তিনি বড় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।’ [যুমার: ৫৩]
গুনাহকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেন
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-‘যারা এসব গুনাহ [কুফুর-শিরক, মানব হত্যা, যিনা ইত্যাদি] করবে, তারা শাস্তির সম্মুখীন হবে। কিয়ামত দিবসে তাদের শাস্তি দ্বিগুণ হবে এবং তথায় লাঞ্চিত অবস্থায় থাকবে চিরকাল। কিন্তু যারা তাওবা করে ঈমান আনে এবং নেক আমল করে আল্লাহ তাআলা তাদের গুনাহ সমূহ পূণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দিবেন। আর আল্লাহ তাআলা বড় ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু এবং যারা তাওবা করলো এবং নেক আমল করলো, তারা ফিরে আসার স্থান আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসলো। [ফুরকান:৬৮-৭১] বর্ণিত আয়াতগুলো প্রমাণ বহন করে অপরাধ বা গুনাহ যত বড়ই হোক, যত বেশিই হোক, যথা নিয়মে তাওবা করলে আল্লাহ তাআলা তা মাফ করে দেন। অধিকন্তু গুনাহকে পূণ্য দ্বারা পরিবর্তিত করে দেন। তো এরচে বড় আশার বাণী আর কি হতে পারে। কাজেই বান্দার হতাশ ও নিরাশ হওয়া কোনো কারণ নেই। যত গুনাহই করুক না কেন, সাহস করে যথা নিয়মে খাঁটি দিলে তাওবা করলেই মাফ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।
গুনাহ বা পাপ সৃষ্টির পেছনেও রহস্য ও হিকমত রয়েছে
এখানে একটি প্রশ্ন জাগে। তাহলো, যেহেতু গুনাহের কারণেই বড় আদরে সৃষ্টি করা সৃষ্টির সেরা মানবা জাতি জাহান্নামী হয়। আল্লাহর ক্রোধের পাত্র হয়। তাহলে তিনি গুনাহ সৃষ্টি না করলেই পারতেন। সকল ঝামেলা চুকে যেত। এই প্রশ্নের উত্তর হলো, গুনাহ বা পাপ সৃষ্টির পেছনে দুটি রহস্য ও হিকমত রয়েছে। ১. মানুষ যখন গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য পরিপূর্ণ চেষ্টা করে যাবে, তখন তার হৃদয় রাজ্যে তাকওয়া ও খোদাভীতির মশাল জ্বলে উঠবে। গুনাহ থেকে সে যত বেশি দূরত্ব বজায় রাখবে, তত বেশি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারবে। এভাবে সে এক সময় আল্লাহর প্রিয় ও মাহবুব বান্দায় পরিণত হবে। ২. পূর্ণ চেষ্টার পরও যদি সে গুনাহ করেই ফেলে। আর মানুষ হিসাবে তা হতেও পারে, তাহলে সে অনুতপ্ত হবে। অনুশোচনা করবে। লজ্জিত হবে। অনুনয়-বিনয় করে তাওবা-ইস্তিগফার করবে। এতে আল্লাহর দরবারে এ বান্দার মর্যাদা আরো বেশি বৃদ্ধি পাবে। মোট কথা হলো, গুনাহ করার দুঃসাহস কখনও দেখাবে না। এরপরও একান্ত গুনাহ করেই ফেললে নিরাশও হওয়া যাবে না। কাকুতী-মিনতী করে নিজের আসহায়ত্ব প্রকাশ করে আল্ল্হর দরবারে তাওবা-ইস্তিগফার করবে। এর দ্বারা এমন অনেক মর্যাদায় লাভ হবে, যা গুনাহ বর্জন করার দ্বারা লাভ করা যায় না। উক্ত কথাগুলো খুবই স্পর্শকাতর। ভূল ব্যাখ্যার আশ্রয় গ্রহণ করা থেকে আল্লাহ আমাদের হেফাযত করুন। আমীন। [ইসলাহী খুতুবাত:৬/৪৭৮-৪৭৯]
তাওবা করবে কিভাবে
তো এই তাওবা করবে কিভাবে? এ ব্যাপারেও উলামায়ে কিরাম বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে প্রথম কথা হলো, তাওবা ও ইস্তিগফার তিন প্রকার। ১. গুনাহসমূহ থেকে তাওবা ও ইস্তিগফার করা। ২. ইবাদত-বন্দেগী বা আল্লাহর হুকুম পালনে ত্রæটি হলে তা থেকে তাওবা ও ইস্তিগফার করা। ৩. ইস্তিগফার থেকে ইস্তিগফার। অর্থাৎ ইস্তিগফার যেভাবে করতে বলা হয়েছে, সেভাবে করতে পারিনি, এ জন্য ইস্তিগফার করছি। প্রথম প্রকার তথা গুনাহসমূহ থেকে তাওবা করা প্রত্যেক মানুষের উপর ফরযে আইন। এটা না করার সুযোগ কোনো মানুষের নেই। এই তাওবার দুটি স্তর রয়েছে। ১. ইজমালী বা সংক্ষিপ্ত তাওবা। ২.তাফসীলী বা বিস্তারিত তাওবা। ইজমালী বা সংক্ষিপ্ত তাওবার নিয়ম হলো, স্থিরতার সঙ্গে বসে জীবনের সকল গুনাহের কথা স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে তাওবা করা। এর জন্য উত্তম পদ্ধতি হলো, প্রথমে তাওবার নিয়তে দু’ রাকআত নামায পড়ে নিবে। এরপর অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে, লজ্জিত ও অনুতপ্ত হয়ে একেকটি গুনাহের কথা স্মরণ করবে এবং আল্লাহর দরবারে এ দুআ করবে, হে আল্লাহ! প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য, আল্লাহর কিংবা বান্দার হকের সাথে সংশ্লিষ্ট ছগীরা-কবীরা গুনাহ- মোটকথা জীবনে যত গুনাহ করেছি, সবগুলো থেকে তাওবা করছি। ইজমালী বা সংক্ষিপ্ত তাওবা করার পর নিশ্চন্ত মনে বসে থাকলে হবে না; বরং এরপর তাফসীলী বা বিস্তারিত তাওবা করতে হবে। [ইসলাহী খুতুবাত:৬/৪৮০-৪৮১]
ছুটে যাওয়া নামায, যাকাত, রোযা, হজ্ব ইত্যাদি ফরয-ওয়াজিব বিধানগুলোর হিসাব করে আমল শুরু করে দিবে
তাফসীলী বা বিস্তারিত তাওবার পদ্ধতি হলো, যে সকল গুনাহ তৎক্ষণাত শোধরানো সম্ভব, সেগুলো শোধরানোর কাজ শুরু করে দিবে। যেমন ধরুন, এক ব্যক্তির ফরয নামায, রোযা, যাকাত ইত্যাদি কাযা হয়েছে অনেক। এভাবে ফরয হজ্বও সে আদায় করেনি। এখন তার ভিতরে আল্লাহর ভয় জেগেছে। অতীত কর্মের জন্য অনুশোচনা এসেছে। তাই সে তাওবা করতে চায়। তো সে সর্ব প্রথম ছুটে যাওয়া নামাযগুলো কাযা করা শুরু করে দিবে। কারণ মৃত্যুর পূর্বে এ নামাযগুলোর কাযা করা তার উপর ফরয। বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এখন ইজমালী তাওবার পর যদি সে নিশ্চিন্তে বসে থাকে, নামাযগুলোর কাযা করা শুরু না করে, তাহলে তার তাওবা সম্পন্ন হবে না। এভাবে তাফসীলী তাওবা জরুরী। তাফসীলী বা বিস্তারিত তাওবা মধ্যে সর্ব প্রথম আসে নামাযের বিষয়টি। বালেগ হওয়ার পর থেকে শুরু হবে এ হিসাব। [পুরুষ সপ্নদোষের পর থেকে আর নারী ঋত¯্রাবের পর থেকে বালেগ হয়। কোনো পুরুষ বা নারীর যদি উক্ত আলামত প্রকাশ না পায়, তাহলে পুরুষ-নারী উভয়ের বালেগ হওয়ার জন্য ১৫ বছর হওয়া জরুরী। ১৫ বছর হলেই পুরুষ হোক বা নারী হোক, শরীআতের দৃষ্টিতে তারা বালেগ বলে গণ্য হবে। এর চেয়ে কম বয়স হলে বালেগ বলে গণ্য হবে না।] এভাবে হিসাব করবে যে, আমি যে দিন থেকে বালেগ হয়েছি, সে দিন থেকে আজ পর্যন্ত কত ওয়াক্ত নামায আমার ছুটে গেছে; সবগুলো কাযা করা আমার যিম্মায় ফরয। এক্ষেত্রে যদি সঠিক হিসাব বের করা সম্ভব না হয়, তাহলে প্রবল ধারনার ভিত্তেতে সম্ভাব্য একটি হিসাব ধরতে হবে, যেন কম না হয়ে বেশিই হয়। তারপর সেটা ডায়রী বা খাতায় লিখে ফেলতে হবে যে, আজ এত তারিখ পর্যন্ত আমার নামায মোট এই পরিমাণ কাযা হয়েছে। যদি মৃত্যুর আগে এসব নামায কাযা করতে পারি, তাহলে তো আলহামদুল্লিাহ। অন্যথায় আমি অসিয়ত করছি, মৃত্যুর পর আমার পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে নামাযগুলোর ফিদয়া যেন আদায় করে দেওয়া হয়। এরপর একই নিয়ম ও পদ্ধতিতে নামাযের মতো যাকাত, রোযা, হজ্ব ইত্যাদি ফরয-ওয়াজিব বিধানগুলোর হিসাব করে নিবে ও আমল শুরু করে দিবে এবং অসিয়তনামা লিখে নিবে।
উমরী কাযা আদায়ের সহজ পদ্ধতি
এই কাযা নামাযগুলোকে বলে উমরী কাযা। উমরী কাযা আদায়ের সহজ পদ্ধতি হলো, প্রতি ওয়াক্তের ফরয আদায়ের আগে বা পরে অন্তত একটি কাযা নামায পড়ে নেওয়া। সময় থাকলে আরো বেশি পড়া। যত তাড়াতাড়ি তা শেষ করা যাবে ততই মঙ্গল। যতদিন উমরী কাযা বাকি থাকে, ততদিন নফলের পরিবর্তে কাযা নামায পড়াই শ্রেয়। সুন্নাতের পরিবর্তে কাযা নামায করা যাবে না; বরং সুন্নাতে মুআক্কাদা আদায় করতেই হবে। এগুলো ছাড়ার সুযোগ নেই। ফযরের পর ইশরাকের ওয়াক্ত হওয়া পর্যন্ত ও আসরের নামাযের পর নফল নামায পড়া না গেলেও কাযা নামায পড়া যায়। তাই এই সময়ও কাযা নামায পড়া যেতে পারে। এভাবে যত ওয়াক্ত নামায আদায় করা হয়, সেগুলোর হিসাবও লিখে রাখতে হবে।
অসিয়তনামা লেখার গুরুত্ব
উক্ত অসিয়ত কেন লিখতে হবে? এ জন্য লিখতে হবে যে, যদি অসিয়তটি না লিখা হয়, আর কাযা নামায, রোযা, যাকাত, হজ্ব ইত্যাদি আদায়ের পূর্বেই সে মারা যায়, তাহলে ওয়ারিশদের উপর তার উপরোক্ত কাযা আমালগুলোর ফিদয়া আদায় করা জরুরী থাকবে না। যদি তারা আদায় করে, তাহলে এটা হবে তার উপর ইহসান বা দয়া। অন্যথায় শরীআতের দৃষ্টিতে আদায় করা জরুরী নয়। কিন্তু যদি মাইয়েত মৃত্যুর আগে অসিয়ত করে যায়, তাহলে তার পরিত্যক্ত সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থেকে অসিয়ত পুরো করা তাদের উপর ওয়াজিব। ফিদয়া আদায় করে দিলে আশা করা যায়, তাকে মাফ করা হবে। এরপরও যদি ওয়ারিশরা ফিদয়া আদায় না করে, তাহলেও আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করবেন বলে আশা করা যায়। অসিয়ত মূলত একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। যার প্রতি আমাদের অনেকেরই কোনো গুরুত্ব নেই। অথচ হাদীস শরীফে অসিয়তনামা লেখার ব্যাপারে বেশ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তদীয় রাসূলের উপর ঈমান রাখে এবং অসিয়ত লেখার মতো তার কাছে কোনো বিষয় থাকে, তাহলে অসিয়ত লেখা ব্যতীত মাত্র দু’ রাত অতিক্রম করাও তার জন্য জায়িয নেই। [তিরমিযী:২/৩৩] এই হাদীসের আলোকে বুঝা যায়, অসিয়ত লেখার মতো কোনো কিছু থাকলে অসিয়তনামা না লেখাও একটি স্বতন্ত্র গুনাহ। যতদিন এ অসিয়ত- নামা না লেখা হবে, ততদিন গুনাহটি ঘাড়ে ঝুলে থাকবে। তাই অসিয়তনামা লেখার মতো কোনো কিছু থাকলে এখনই অসিয়ত নামা লিখুন। [ইসলাহী খুতুবাত:৬/৪৮২]
বান্দার হক আদায় করা জরুরী, অন্যথায় মাফ করিয়ে নিতে হবে
এভাবে বান্দার হক [কাউকে কষ্ট দেওয়া, অন্যায়ভাবে প্রহার করা, গীবত-শেকায়াত করা, কারো টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ মেরে দেওয়া ইত্যাদি।] থেকে গেলে, তা মৃত্যুর আগেই আদায় করতে হবে। আদায় করা সম্ভব না হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থেকে মাফ চেয়ে নিতে হবে। কারণ বান্দার হক কেবল উপরোক্ত পদ্ধতি তাওবা করলেই মাফ হয় না। যেমন মনে করুন, আপনি কারো থেকে ঘুষ খেয়েছেন বা সুদ খেয়েছেন কিংবা কারো টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এখন আপনার দীনের সমঝ এসেছে। আপনার ভিতর আল্লাহর ভয় পয়দা হয়েছে। তাই আপনি তাওবা করতে চাচ্ছেন। তো এক্ষেত্রে আপনার যিম্মাদারী হলো, সুদ-ঘোষ ও আত্মসাতের টাকা স্ব স্ব মালিককে বুঝিয়ে দিতে হবে। তারা জীবত না থাকলে তাদের ওয়ারিশদেরকে বুঝিয়ে দিতে হবে। তাদেরকে না পাওয়া গেলে কওমী মাদরাসার গুরাবা ফান্ডে বা যাকাত খেতে পারে এমন লোকদেরকে সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে। একবারে সম্ভব না হলে কিস্তি কিস্তি করেও আদায় করতে পারবে। যদি কোনো কারণে আদায় করা সম্ভব না হয়, তাহলে যে কোনোভাবেই হোক না কেন, তাদের থেকে মাফ করিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় পরকালে এর জন্য পাকড়াও করা হবে। এক হাদীসে এসেছে, ‘একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী সাহাবায়ে কিরামের মাঝে দাঁড়িয়ে এই ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আমি যদি কাউকে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি, দুঃখ দিয়ে থাকি কিংবা আমার উপর যদি কারো কোনো হক থেকে থাকে, তাহলে আজ আমি সকলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি, সে এসে আমার থেকে প্রতিশোধ নিয়ে নিক বা আমাকে মাফ করে দিক।’ পাঠক! লক্ষ্য করুন, যেখানে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জন্য প্রাণ উৎসর্গকারী সাহাবায়ে কিরামের কাছে মাফ চাচ্ছেন, সেখানে আমরা কোন ছার! ছাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও তাঁদেরকে অত্যাধিক ভালোবাসতেন। তাঁর থেকে প্রাণের সাহাবীদের উপর জুলুম কল্পনাও করা যায় না। তর্কের খাতিরে তা মেনে নিলেও, সাহাবায়ে কিরাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে পরিমাণে ভালোবাসতেন, তা সামনে রাখলে বুঝা যায়, তাঁরা কেবল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মাফই করবেন না; বরং তাঁর জুলুমকে নিজেদের জন্য পরমা সৌভাগ্যের ব্যাপার মনে করবেন।
(চলবে)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: তাওবা
আরও পড়ুন