Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৬, ২৩ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

মেহেদি রাঙা একুশ

মু হা ম্ম দ কা মা ল হো সে ন | প্রকাশের সময় : ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:৪১ এএম

ভোরের সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয়েছে অমর একুশে ভাষা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। মাঘের হিমেল সকালে কুয়াশা ভেদ করে রুটিনবাঁধা রক্তিম সূর্যটাও আজ অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রখর ও তেজোদীপ্ত। কুয়াশা ঘেরা আঁধার পাশ কাটিয়ে দীপ্তি ছড়ানো লাল সূর্যিটা যেনো বিজয়ের আবাহন ছড়িয়ে দিচ্ছে সর্বত্র। চতুর্দিকে সূরের মূর্ছনা ও বিজয়া ধ্বনি। মাইকে উচ্চস্বরে বেজে চলেছে শিল্পীর কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ কোরাস সংগীত। ছোট্ট নুহামণিও আজ লেপ কম্বলের মোহ ত্যাগ করেছে বহু আগে। মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে ‘আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম’ ডাক শুনে বিছানা ছেড়ে দে-ছুট। সম্ভবত এর দু’টো কারণ হতে পারে, এক. আজ মহান ভাষা দিবসের প্রথম প্রহর ও দ্বিতীয়ত. একমাত্র ফুফু আম্মাকে বহুদিন পর হাতের নাগালে পেয়েছে। বহুদিন পর শশুরালয় থেকে পৈত্রিক ভিটেতে বেড়াতে এসেছে আঁখি। আঁখির ভালো নাম ফাতেমা তুজ জোহরা। আঁখি নামেই পরিচিত। এই মুহূর্তে উঠোনের সজনে গাছের তলায় পাটি বিছিয়ে নুহা’র বাম হাতে ভাষা স্তম্ভ ও পতাকা অঙ্কন নিয়ে ব্যস্ত। এদিকে নাতিনের মেহেদি রাঙা হাতে রক্তিম গোল সূর্যটার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রয়েছেন, মিসেস সৈয়দা সহিদা পারভীন চৌধুরী। সেদিকে কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আজ নুহা’র পিঠে দুটো ছোট্ট ডানা গজেছে। দস্যিপনা অতসহজে বন্ধ হবার নয়। ওদিকে রান্নাঘর থেকে একেরপর এক জোরে চেঁচিয়ে চলেছে রূপা, ‘নুহা মামণি ঠান্ডা লেগে যাবে, রঙিন পুলওভারটা জলদি গায়ে জড়িয়ে নাও।’ কে শুনে কার কথা! নুহা’র থোড়াই কেয়ার। মায়ের কথায় কর্ণপাত করার ফুরসত নেই। মাঝে অবশ্য শুধু একবার মাথা উঁচিয়ে বলেছে, ‘আমার কিচ্ছু হবেনা আম্মি, তুমি শুধু শুধু অযথা চিন্তা করোনা।’ নুহা ফুফু’র কোলে সটান হাত মেলে রেখেছে। আঁকিবুকিতে মশগুল দু’জনে। গভীর মনোনিবেশে বিশেষ কায়দায় আঁখি শৈল্পিক কারুকাজ করে যাচ্ছে। চারপাশে কালো রঙের তিনটে শহীদ স্তম্ভের মাঝে তালু বরাবর মেহেদি রাঙা সূর্যটাকে সত্যি অসাধারণ লাগছে। কেমন যেন দীপ্তি ছড়াচ্ছে চতুর্দিকে। শীতের মিষ্টি রোদে মোড়া পেতে একটু অদূরে বসে বসে আড়চোখে সবি দেখছেন সত্তরোর্ধ মিসেস চৌধুরী। কালের সাক্ষী হয়ে আজও ইতিহাসের ক্ষণ গণনা করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। স্বামীর সঙ্গে বহুমাত্রিক লড়াইয়েও অংশগ্রহণ করেছেন। সেইসব সোনাঝরা ভয়াল দিনের কথা মনে পড়লে আজও শরীরে কাটা দিয়ে ওঠে। দেখেছেন ৫২’র ভাষা আন্দোলন। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ শ্লোগানে আন্দোলনরত ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভেঙে এগোতে থাকে। সেই মিছিলের অগ্রভাগে নিজের আদরের খোকা তূর্যও মিশে যায়। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছেলেটি আর ফিরে আসেনি। বাংলা বর্ণমালা তূর্যের রক্তে স্নাত হয়। ৫২›র ২১শে ফেব্রুয়ারীতে পৃথিবীর ইতিহাসে শুধু মাত্র মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার জন্য বুকের তাজা রক্ত ও জীবন উৎস্বর্গ করার কথা চির ভাস্বর হয়ে থাকবে। ভাষা শহীদদের রক্তস্রোত এ দেশের উর্বর মাটিতে বপন করেছিল স্বাধীনতার বীজ। যে কারণে বায়ান্ন ও একাত্তর একসূত্রে গাঁথা। যার একপ্রান্তে ভাষা আন্দোলন আর অন্যপ্রান্তে মুক্তিযুদ্ধ। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরে বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রাম একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় বিশ্ব মানচিত্রে স্বাধীন সার্বভৌম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উপ¯ি’তি নিশ্চিত করে। বাংলাদেশ এবং বাঙালি জাতির ইতিহাস খুবই পুরনো। হাজার হাজার বছর আগে এ দেশে সভ্যতার বিকাশ হয়। দুই-আড়াই হাজার বছর আগে এ ভূখণ্ডের অধিবাসীদের পরিচয় ছিল গঙ্গারিড জাতি হিসেবে। আলেকজান্ডারের সফরসঙ্গীরা এ জাতির বীরত্বের প্রশংসা করেছেন। রোমান কবি ভার্জিল পদ্মা মেঘনা যমুনা পাড়ের মানুষদের প্রশংসা করে আড়াই হাজার বছর আগে কবিতা লিখেছেন। তারপর এ দেশে আসে আর্যরা। আসে আরব পাঠান মোগলরা। বাঙালির দুর্দিনের সূচনা ব্রিটিশ শাসনামলে। প্রায় দুইশ বছরের গোলামীর জিঞ্জির বাঙালির আত্মপরিচয়কে ম্লান করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা উপমহাদেশ ছেড়ে যায়। প্রতিষ্ঠিত হয় ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি স্বাধীন দেশ। বাংলাদেশের মুসলমানদের ভোটে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলেও শুরুতেই এ দেশের মানুষ উপেক্ষার শিকার হয়। যার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ লাভ করে ৭১›র মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে। ইতিহাসের খেরোখাতায় সবি লিপিবদ্ধ রয়েছে। অথচ চোখের সম্মুখে ভাষা দিবস কিংবা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উন্মাদনায় ব্যস্ত একমাত্র নাতিন মুক্তিযুদ্ধের ‹ম›ও দেখেনি। ভাষা আন্দোলন সেতো অনেক দূরের ঘটনা। তবুও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বহে চলা এই ভাবাবেগ, ভালোবাসা উচ্ছাস দেখতে কার না ভালো লাগে। পরশে চক্ষু শীতল হয়ে যায়। অজান্তে বড় একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন মিসেস সৈয়দা সহিদা পারভীন। হিমালয়সম অটল-অবিচল ও এক ধৈর্যশীলা নারীর পথিকৃত তিনি। স্বামী নেই। গত হয়েছে একবছর। গেল পৌষে। কঠিন এক ব্যামো হয়েছিল। মিশুক মানুষটা চোখের সামনে যতক্ষণ ছিল, ঘরময় ঘুরে বেড়াতো। কথা বলতো। হাসতো, ঠাট্টা করতো। ছেলেপুলে ও নাতি-নাতকুরদের সঙ্গে শিশুতোষ আনন্দে মেতে ওঠতো। বিশেষত ভাষা দিবস বা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জাতীয় দিবসগুলোতে রীতিমতো আড্ডা আসর বসিয়ে যুদ্ধের নানান গল্প শোনাত। তূর্যের গল্প সবাইকে বলে বেড়াতেন। নিজের অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুলে দিতো নতুন যুগের নতুন প্রজন্মের নিকট। পেশায় একজন আদর্শবান শিক্ষক হওয়ার সুবাধে এই কাজটি আরও দক্ষভাবে করতে পারতেন। যুদ্ধকালীন সময়ের নানা ঘটনাপ্রবাহ ও ভয়াবহ লোমহর্ষক চিত্র তুলে ধরতেন কোমলমতী ছাত্রছাত্রীদের মাঝে। সবসময় বারবার একটি কথাই বলতেন, ‹বর্তমান নতুন প্রজন্মের সম্মুখে বাংলাদেশ জন্মের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে, পতাকা শোভিত রক্তিম সূর্যটার গল্প শোনাতে হবে। অথচ এই মাঘে এসে মানুষটা নেই। একদম নেই। হারিয়ে গেছে অনেক দূরে, দৃষ্টিসীমানারও অনেক বাহিরে। চলে গেছে মহাপরাক্রমশীল ওপরওয়ালা কাছে। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে একাত্তরে পাক হানাদার বাহিনী যে মানুষটাকে একদন্ড পরাস্ত করতে পারেনি, মরণব্যাধী ক্যানসার সেটা পেরেছে অনায়াসে। স্বাধীন ভূমে মানুষটাকে বেঁচে থাকতে দেয়নি।
বছর ঘুরে ঋতুর পালাবদলে ফিরে এসেছে আরেকটি ফেব্রুয়ারী। আবেগের মাস ভাষার মাস। সর্বত্র ভাষা উৎসব ও আনন্দ পালিত হচ্ছে। অথচ মানুষটা নেই। নুহা›র মেহেদি রাঙা একুশের দিকে তাকিয়ে অতীত স্মৃতির বিস্মৃতিতে হারিয়ে যান মিসেস চৌধুরী। ‹মাগো, আজ তো বাবা নেই, আমাদেরকে তূর্য দাদা ভাইয়ের গল্প কে শোনাবে? রফিক, সালাম, বরকত ও জব্বারের গল্প কে শোনাবে? তুমি শোনাবে না? হঠাৎ পেছন থেকে বড় ছেলে বাবু মাকে জড়িয়ে ধরে প্রশ্ন করে। ছেলের কথা শুনে মুহূর্তে আরো আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন তিনি। অঝোরে বুক ভাসিয়ে যান। স্বামী ও সন্তানহারা মনটাকে কিছুতেই বুঝাতে পারছেন না। এরিমধ্যে আঁখিও এসে মাকে জড়িয়ে ধরে। সান্ত¡না দেয়ার বৃথা চেষ্টা করে। মায়ের দু›চোখের অশ্রুত ফোটা সযতে্ন আলতোভাবে মুছে দেয়ার চেষ্টা করছে। প্রগাঢ় ভালোবাসায় ও বিনম্র শ্রদ্ধায় মুহুর্মুহু চুমোয় ভরে দিচ্ছে মায়ের সমস্ত মুখমন্ডল। বারেবারে ধৈর্য ও সান্তনার বাণী শোনাচ্ছে মাকে। আঁখি জলে সিক্ত হচ্ছে আহত হৃদয়গুলো। কাঁদছে একমাত্র বড়ছেলে বাবুও। (অসমাপ্ত)



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন