Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার ১৯ জুলাই ২০১৯, ০৪ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৫ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.) ছিলেন ইসলামি ঐক্যের প্রতীক

অধ্যক্ষ শাব্বীর আহমদ মোমতাজী | প্রকাশের সময় : ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

আজ মরহুম মগফুর মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর ১৩তম ওফাত বার্ষিকী। প্রতি বছরই এই দিনে দেশের প্রায় সকল মাদরাসা, বিভিন্ন খানকা ও মসজিদে মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর স্মরণে আলোচনা সভা ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়। হুজুরের প্রিয় সংগঠন বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীন কমপ্লেক্সে আয়োজন করা হয় পবিত্র ঈছালে ছাওয়াব মাহফিল অনুষ্ঠান। দেশবরেণ্য আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আলোচনায় অংশ নিয়ে মরহুমের বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের ওপর আলোচনা করেন।

মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান ছিলেন বহু প্রতিভার অধিকারী ক্ষণজন্মা একজন বড় মাপের আলেম, ইবাদত-বন্দেগীর দিক থেকে তিনি ছিলেন একজন মস্তবড় আবেদ। রাজনৈতিক, সামাজিকভাবে চিন্তা করলে তিনি ছিলেন উচ্চপর্যায়ের একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সামা্িজকভাবে দেখলে মনে হয় তিনি ছিলেন একজন সমাজ সচেতনতাসম্পন্ন ও সামাজিক নেতা। তাঁর আচার-আচরণ আতিথেয়তা ছিল সম্পূর্ণ সুন্নতে রাসূল (স:) ভরপুর।
মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:) ছিলেন আলিয়া নেছাবে শিক্ষিত একজন আলেম, সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও তিনি মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে ফাইলে ইংরেজিতে নোট লিখতেন। কারো জন্য কোনো সুপারিশ করলে তাও তিনি ইংরেজিতে লিখতেন। সুন্দর বাংলা লেখা ও পড়ায় ছিলেন একজন পন্ডিত। আল্লাহপ্রেমিকদের বড় একটা গুণ হলো সকলের সাথে সদ্ব্যবহার করা, সেই গুণে শতভাগ গুণান্বিত ছিলেন তিনি। শুধু দেশেই নয় বরং সারা বিশ্বের মুসলিম জ্ঞানী-গুণী, দার্শনিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সাথে ছিল তাঁর বন্ধুত্ব। আমার সৌভাগ্য হয়েছে মরহুম হুজুরের সাথে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সভা-সেমিনারে যোগ দেয়ার, সে সময়ে লক্ষ করেছি বিভিন্ন দেশের উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সাথে তাঁর সুমধুর সম্পর্ক। মনে হয়েছিল মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:) তাঁদের বহু দিনের আপনজন। লক্ষ করেছি হুজুরও তাঁদের বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন আপন বন্ধুর মতো, এটা ছিল মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর একটি বড় গুণ। শুধু তাই নয়, অনেক রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধানদের সাথে ছিল মরহুম হুজুরের গভীর বন্ধুত্ব, যা দুঃসময়ে আমাদের দেশের অনেক উপকারে এসেছে বলে দেখেছি। আমাদের দেশের ভেতরেও যদি লক্ষ করি দেখা যাবে ডান, বাম, সুন্নী, গায়রে সুন্নী, মাজহাবী, লা-মাজহাবী, কওমী, আলীয়া এসব নিয়ে যুগ যুগ ধরে বিভেদ চলছে। কেউ কারোর সাথে মুখ দেখাদেখিও করেন না। কিন্তু একমাত্র ভিন্নতা দেখেছি মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর চরিত্রে, তিনি মনেপ্রাণে ছিলেন একজন তরিকতপন্থী, খাঁটি আহলে সুন্নতের অনুসারী। তদুপরি বাংলাদেশের বড় বড় দরবারের ওলিদের সাথে ছিল হুজুরের সুসম্পর্ক। দেশের প্রখ্যাত পীর-মাশায়েখগণও নিশ্চিন্তে মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:) হুজুরকে আপন বলেই জানতেন। তিনি ছিলেন ছারছীনা দরবার শরীফের খাছ ভক্ত ও অনুসারী, তাছাড়াও হুজুরের সাথে সুসম্পর্ক ছিল ফুলতলী ছাহেব কেবলার সাথে, ফুলতলী হুজুরকে কাছে পেলে খুবই খুশি হতেন মরহুম হুজুর। ছাহেব কেবলার আতিথেয়তায় নিজেকে বিলিয়ে দিতেন। বিশ্ব জাকের মঞ্জিলে হুজুরের সাথে যাওয়ার সুবাদে দেখেছি সেখানকার পীরসাহেব (রহ:) কত আন্তরিক। চরমোনাই দরবারের মরহুম পীর সাহেব সৈয়দ ফজলুল করীম (রহ:), নারিন্দার শাহ্ ছাহেব (রহ:), মুশুরীখোলার পীর সাহেবসহ দেশের অগণিত দরবার ও খানকার সাথে ছিল মরহুম হুজুরের আত্মার সম্পর্ক। কওমী লাইনের বড় ধরনের আলেম মরহুম মাওলানা ওবায়দুল হক (রহ:)-এর সরকারি মাদরাসা-ই-আলীয়ার হেড মাওলানা ও জাতীয় মসজিদের খতিব নিযুক্তের বিষয়ে মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর শতভাগ আন্তরিকতা ছিল। শায়খুল হাদিস আল্লামা আজিজুল হক (রহ:) জমিয়াত অফিসে অনেকবার এসেছেন। মরহুম হুজুর (রহ:) ও শায়খুল হাদিস (রহ:) প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় গিয়েছেন এবং দাওরা জামাতে দরছ দিয়ে সকলের সুদৃষ্টি কেড়েছেন। মরহুম খত্তানী হুজুর, কায়েদ সাহেব হুজুরসহ সে সময়ের এমন কোনো বড় ধরনের আলেম নেই যারা জমিয়াত অফিসে আসেননি বা মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর সাথে সুসম্পর্ক ছিল না। লক্ষ করেছি ১৯৭৮ থেকে ২০০৪ খ্রি: পর্যন্ত সময়ের পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা, ইসলামি পন্ডিত ব্যক্তিদের ঐক্যের একটিই ঠিকানা ছিল বাংলাদেশ জমিয়াতুল মোদার্রেছীনের সভাপতি মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)। অনেকে তাঁকে ভাবতেন অভিভাবক হিসেবে, কেউ ভাবতেন বন্ধু হিসেবে, কেউ ভাবতেন সহযোদ্ধা হিসেবে। বহুবার দেখেছি মরহুম মাওলানা মুহিউদ্দিন (রহ:) মরহুম মাওলানা আমিনুল ইসলাম (রহ:)কে হুজুরের সান্নিধ্যে। অনেক গভীর রাতে মরহুম মাওলানা ফজলুল হক আমিনী (রহ:)কে দেখেছি হুজুরের সাথে একান্তে নীরবে বিভিন্ন আলোচনা করতে। মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর সামান্যতম সমস্যা হলে উল্লেখিত আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখগণ ছুটে আসতেন হুজুরকে সহানুভ‚তি জানাতে। বার বার মনে পরে ছারছীনা শরীফের মরহুম হুজুর কেবলার কথা, হুজুর জমিয়াত, ইনকিলাবের সবাইকে আপন ভাবতেন। মরহুম হুজুর কেবলা মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর সামান্যতম অসুবিধা হলে গর্জে উঠতেন আপন মহিমায়, সন্তানের মতো আগলে রাখতেন মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-কে। মরহুম হুজুরের জন্য রাজপথে মিছিলেও অংশ নিয়েছেন ছারছীনা শরীফের মরহুম হুজুর (রহ:), ফুলতলীর সাহেব কেবলা (রহ:) প্রমুখ পীর সাহেব ও আলেম ওলামাগণ। শুধু একটাই কারণ আর তা হলো মরহুম মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:) ছিলেন একজন ঐক্যের প্রতীক, সকলের প্রিয় আস্থাভাজন। বর্তমান প্রেক্ষাপটেও তাঁর মতো একজন ক্ষণজন্মা ঐক্যের প্রতীক আলেম দরকার। আজকের আলেম সমাজ বহু দলে বিভক্ত, এক পীর সাহেব অন্য দরবারে যায় না, একজন বড় আলেম অন্য বড় আলেমের সাথে সাক্ষাৎ করতে চান না। ইসলামি সামান্য মাসয়ালা-মাসায়েল নিয়ে বিভিন্ন ধরনের মতামত প্রকাশ করেন। ইসলামি নেতৃবৃন্দ আজ বহু দলে বিভক্তির কারণে সমাজে অবদান রাখতে পারছে না। আর তাতে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ জনগণ।
তাই আসুন আমরা সকলেই মরহুম মগফুর মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণ করে সকল ভেদাভেদ ও মতপার্থক্য ভুলে দরবার, খানকা, পীর-মাশায়েখ, আলেম-ওলামা, ঐক্যবদ্ধ হয়ে সমাজে ইসলামি মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসি।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

লেখক : মহাসচিব, বাংলাদেশ জমিয়তুল মোদার্রেছীন।



 

Show all comments
  • ফয়সাল ৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ৫:২৪ এএম says : 0
    মাওলানা এম এ মান্নান (রহ:)-এর মতো বিদ্বান, দূরদর্শী, বিচক্ষণ ও কর্মী পুরুষ বাংলাদেশে খুব বেশি জন্মাননি। তিনি ছিলেন প্রকৃতপক্ষেই একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। তার মতো সর্বদর্শী দেশ-জাতিপ্রেমী মানুষ এখন বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: মাওলানা এম এ মান্নান (রহ.)

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮

আরও
আরও পড়ুন