Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ ২০১৯, ০৭ চৈত্র ১৪২৫, ১৩ রজব ১৪৪০ হিজরী।

প্রতিটি ব্যাংকে বিশেষ নিরীক্ষা

রূপালী ব্যাংকের ব্যবসায়িক সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম দূর করতে প্রতিটি ব্যাংকে স্পেশাল অডিট (বিশেষ নিরীক্ষা) করা হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম বের করতে, প্রতিটি ব্যাংকে স্পেশাল অডিট করতে হবে। আমাদের জানতে হবে কেন ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম হচ্ছে। এই অনিয়মের সঙ্গে কারা জড়িত তা বের করতে হবে এবং তাদের সহায়তাকারীও চিহ্নিত করা হবে। তবে, ব্যংকারদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। প্রকৃত দোষীরাই শাস্তি পাবে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) অডিটরিয়ামে রূপালী ব্যাংকের বার্ষিক ব্যবসায়িক সম্মেলন ২০১৯ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে আ হ ম মোস্তফা কামাল এসব কথা বলেন। রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। অনুষ্ঠানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ফজলুল হক, রূপালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আতাউর রহমান প্রধান বক্তব্য রাখেন। অডিটের জন্য অর্থমন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি কমিটি করা হবে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আর্থিক বিভাগের সচিব বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। তিনি দেশে ফিরলেই একটি কমিটি করা হবে। এই কমিটির তদারকিতে সব ব্যাংকে অডিট পরিচালনা করা হবে। অডিটের জন্য তিনটি ফার্মকে দায়িত্ব দেয়া হবে। তবে, এ নিয়ে ভয়ের কোনো কারণ নেই, অডিট করার উদ্দেশ্য হল আমাদের প্রকৃত সত্যটা জানতে হবে কেন ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে।
আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, বাংলাদেশ ২০৪১ সালে বিশ্বের সেরা ২০টি অর্থনৈতিক দেশের কাতারে উন্নীত হবে। তখন আমরা জি-২০ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হব এবং জি-২০ দেশের সম্মেলনে আমরা অংশগ্রহণ করতে পারব এবং এটা সম্ভব। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১ তম সেরা অর্থনীতির দেশের তালিকায় রয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ ৫৮তম অর্থনীতির দেশের তালিকায় ছিল সেখান থেকে ১৭ ধাপ এগিয়ে ৪১ তম ধাপে উন্নীত হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০৪১ সাল আসতে এখনো ২১ বছর বাকি। এই ২১ বছরে বাংলাদেশে ২১তম ধাপ অতিক্রম করে ২০৪১ সালে বিশ্বের শীর্ষ ২০ অর্থনৈতিক দেশে পরিণত হবে। এই অর্জনের মধ্য দিয়ে ২০৪১ সালে আমরা জি-টোয়েন্টি সম্মেলনে অংশগ্রহণ করতে পারব এটা হবে বাংলাদেশের জন্য অনেক গৌরবের বিষয়।
আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, অর্থনীতির নানা খাতের অর্জনে বাংলাদেশ চীন-ভারতের সমকক্ষ অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। অন্য সব দেশের উপরে আছি। এই অর্জনের দাবীদার সবাই। অর্থমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখেছিলেন। অনেককিছু বাস্তবায়ন করতে পারেননি। এখন বাস্তবায়ন হচ্ছে। এ জন্য আমাদের আছে কর্মক্ষম মানুষ। তারা দেশেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আমি একজন ফেল করতে পারি, কিন্তু সবাই মিলে বিজয়ী হবো। খেলার মাঠেও জিততে হলে সবার সম্মিলিত শক্তি দরকার বলে উল্লেখ করেন তিনি।
খেলাপি ঋণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, এই মুহুর্তে আমাদের সবচেয়ে উদ্বেগ খেলাপী ঋণ। এটা একটি অপরাধ। আমাদের এই অপরাধ বন্ধ করতে হবে। জনগণের টাকা, কৃষকের টাকা, দিনমজুরের টাকার সঠিক ব্যবহার করতে হবে। সঠিক ব্যবহার করতে না পারলে সেটি ব্যর্থতা হিসেবে চিহিৃত হবে। খেলাপি ঋণ বাড়ার প্রবণতা আমাদের থামাতে হবে, জাতিকে খেলাপি ঋণ থেকে মুক্ত করতে হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসায় উত্থান-পতন আছে। যারা সৎ ভাবে ব্যবসা করবে তাদের সকল ধরনের সহায়তা দেয়া হবে যাতে তারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। দেশে দুই ধরনের ব্যবসায়ি শ্রেণী আছে। একটি ভালো শ্রেণীর। দ্বিতীয়টি হচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ি। আমরা ভালো ও অসাধু ব্যবসায়িদের এক কাতারে ফেলব না। ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করে দেশের জন্য, তারা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে কলকারখানা করে, মাঝে মাঝে বিপদে পড়লে লোন ফেরত দিতে সমস্যা হয় এদেরকে আমরা বিশেষভাবে বিবেচনা করবো। তাদের কোন ধরনের হয়রানি করা হবে না। ব্যবসায় যাতে ঘুঁরে দাঁড়াতে পারেন তার ব্যবস্থা করা হবে। তবে দেখতে হবে তারা ব্যবসার জন্য চেষ্টা করছেন কিনা।
অন্যদিকে অসাধু ব্যবসায়ি ও ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার হুশিয়ারি দিয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, যারা অসৎ ব্যবসায়ী লোন নেয়, ফেরত না দেয়ার জন্য এমন ব্যবসায়ীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, শক্ত ও বড় অনিয়মের বিরুদ্ধে দূর্বল ব্যবস্থা নিলে ব্যর্থ হতে হবে। দুষ্ট চক্রকে কোন ভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। সরকারি ব্যাংকগুলোতে সুশাসন বাড়াতে শিগগিরই বিশেষ নীরিক্ষা পরিচালনা করা হবে। মুস্তফা কামাল বলেন, মালেশিয়াতে ঋণ খেলাপিদের তালিকা করা হয়। তাদের তালিকা সরকার বিভিন্ন সংস্থাগুলোকে দিয়ে থাকে। যাতে ঋণ খেলাপিরা কোন ধরনের সুযোগ সুবিধা না পান। এমনকি দেশের বাইরেও যেতে না পারেন। আমাদেরকেও কঠোর হতে হবে অসাধুদের ব্যাপারে। কারণ অসাধু ব্যবসায়িরা ঋণ নিয়ে থাকেন ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করার চিন্তুা থেকে। অসাধু ব্যবসায়ি ও ব্যাংকারের যোগসাজস এর প্রসঙ্গে টেনে অর্থমন্ত্রী বলেন, বারবার একই কায়দায় কোন কোন গ্রুপ ঋণ নিচ্ছে। আপনারা দিয়ে যাচ্ছেন। আগের ঋণের কোন খবর রাখছেন না। এটি আর হবে না। ব্যবসায়ি ও অসাধু ব্যাংকারদের পারস্পরিক সম্পৃক্তা এখানে স্পষ্ট। তাই দু’জনের বিরুদ্ধেই শক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনে ক্রটি বিচ্যুতি থাকলে তা ঠিক করা হবে।
আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, আমি যেসব বিষয় ধারণা করতে পারছি, প্রকৃত সত্য চিত্র পেলে আমাদের জন্য ভালো হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে আমি ভালোভাবে চিনি। তিনি ব্যাংকে আতঙ্ক তৈরির জন্য কোনো কাজ করেননি। একই সঙ্গে আমি এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করার জন্য আসিনি। ১৯৭৩ সাল থেকে আমি ব্যবসা করি। গ্রাহককে জেনে শুনে ঋণ দিতে হবে। স্বল্প মেয়াদি আমানত নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদি বিনিয়োগে সর্তক থাকতেও বলেন আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ জন্য বিকল্প আমানত উৎস বের করার কথাও বলেন তিনি।
ব্যাংক কর্মকর্তাদের সততা ও নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালনের আহবান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা কাজের ফাঁকে একে অপরের নেগেটিভ সমালোচনা করি। যা গীবত বা পরনিন্দা। এটা অন্যায়। এটা পরিহার করতে হবে। গীবত করা মুসলিম ধর্মে নেই। কোরআনে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভালো কাজকে উৎসাহ এবং মিথ্যা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন তিনি। ব্যাংক কর্মকর্তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার আহবান জানিয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশকে বড় করে দেখতে হবে। দেশের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পরিপালন করতে হবে। কারণ যে মানুষের দেশপ্রেম নেই তিনি খাটি মুসলমান নয়। তাই এ দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে হবে, স্বপ্ন দেখাতে হবে। একই সঙ্গে গ্রামে কাজ করার কথা বলেন।
সবাইকে ভালোকাজে উৎসাহ প্রদানের কথা বলে অর্থমন্ত্রী বলেন, ভালো কাজ হলো ধর্ম। সৎ কাজে প্রতিযোগীতা করবেন। শুধু সততার বিজয় হবে। কোরআনের উধ্বৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আল্লাহ কোরআনে বলেছেন-পিতা-মাতার প্রতি সদয় হতে হবে। আ হ ম মুস্তফা কামাল সবাইকে যাকাত দেওয়ার আহবান জানিয়ে বলেন, আপনারা যাকাত দিবেন এবং সবাইকে যাকাত দিতে উৎসাহ দিবেন। কারণ যাকাত কর্তব্য দয়া নয়।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বলেন, রূপালী ব্যাংকে সুশাসনের দিকে মনোযোগ দিতে হবে। এজন্য ব্যাংকের কর্মকর্তাদের প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে চলতে হবে। লোকসানী শাখার সংখ্যা মাত্র ৮টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে যেটি অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংকগুলোর মধ্যে রূপালী ব্যাংকই সর্বপ্রথম সকল শাখায় শতভাগ অনলাইন কার্যক্রম শুরু করে। ব্যাংকের চেয়ারম্যান মনজুর হোসেন ব্যবস্থাপকদের ব্যাংকিং কার্যক্রমে সচেতন ও যত্মবান হওয়ার পরামর্শ দেন।
রূপালি ব্যাংকের এমডি বলেন, আমরা গত বছর বেশির ভাগ সূচকে উন্নতি করেছি। আমাদের আমানত দাড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৯৫৫ কোটি টাকা। আগের বছর ছিলো ৩১ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। লোকসানি শাখা কমে দাড়িয়েছে ৮টি। যা চলতি বছরে শুণ্যে নামিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি ব্যাংকটিকে আরো এগিয়ে নিতে পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর দাবি করেন। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৩৭৭ কোটি টাকা। যা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। এর ফলে আন্তর্জাতিক অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকটি ব্যবসা করতে পারছে না। কম মূলধন ভিত্তি থাকার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করতে অনাগ্রহ দেখায়। এ জন্য তিনি সরকারের কাছে মূলধন বাড়াতে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগান দেয়ার দাবি জানান। আতাউর রহমান প্রধান বলেন, রূপালী ব্যাংক সত্যিকারেই ঘুরে দাড়িয়েছে। প্রায় ১০০ কোটি টাকা লোকসান কাটিয়ে ব্যাংকটি এখন বিরাট অংকের মুনাফা করেছে।
সৌদি আরবে নিজস্ব শাখা খোলার দাবি করে আতাউর রহমান বলেন, সৌদি আরবে প্রায় ৪০ লাখ বাংলাদেশি আছেন। এর মধ্যে প্রায় ২০ লাখেরই বৈধ কাগজপত্র নেই। ফলে তারা কাজ করে বৈধভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারেন না। তাই বৈধভাবে দেশে টাকা পাঠাতে ওই দেশে একটি সরকারি ব্যাংকের শাখা দরকার। তিনি বলেন, রূপালী ব্যাংকের পক্ষ থেকে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে সে দেশে একটি শাখা খুলতে চাই। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকও সৌদিতে শাখা খুলতে চায়।
এ সময় অর্থমন্ত্রীর কাছে তিনি সৌদিতে শাখা খুলতে সোনালী ব্যাংককে দুইমাস সময় বেঁধে দেয়ার দাবি জানিয়ে বলেন, নির্ধারিত সময়ে তারা (সোনালী ব্যাংক) সেখানে শাখা খুলতে না পারলে রূপালী ব্যাংক শাখা খুলবে।
এ বিষয়ে পরে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, দেশের বাইরে একই স্থানে দুটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রতিযোগিতা করা ঠিক হবে না। তাই রিয়াদ ও জেদ্দায় দুই ব্যাংকের পৃথক শাখা খোলার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ব্যবসায়িক সম্মেলনে সারা দেশের ৫৬৮টি শাখার ব্যবস্থাপকসহ ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। ব্যবস্থাপকদের উৎসাহিত করতে ১০ সেরা ব্যবস্থাপককে সম্মাননা পদক প্রদান করা হয়।#



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: অর্থমন্ত্রী


আরও
আরও পড়ুন