Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, ২০ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

অর্থপাচার রোধে সর্বাগ্রে বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে

জালাল উদ্দিন ওমর | প্রকাশের সময় : ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৩ এএম

বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টি আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) কর্তৃক ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯২ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় পঞ্চাশ হাজার কোটি টাকা। একই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ২০১৭ সালের ১ মে প্রকাশিত ‘ইলিসিট ফিন্যান্সিয়াল ফ্লোজ ফ্রম ডেভেলাপিং কান্ট্রিজ: ২০০৫-২০১৪’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে এক অর্থ বছরে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ১০০০ (এক হাজার) কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০০০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। এর আগে ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর জিএফআই কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০০৪ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৫৫৮৮ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। সেই রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশ থেকে ২০০৪ সালে ৩৩৫ কোটি ডলার, ২০০৫ সালে ৪২৬ কোটি ডলার, ২০০৬ সালে ৩৩৮ কোটি ডলার, ২০০৭ সালে ৪১০ কোটি ডলার, ২০০৮ সালে ৬৪৪ কোটি ডলার, ২০০৯ সালে ৬১৩ কোটি ডলার, ২০১০ সালে ৫৪১ কোটি ডলার, ২০১১ সালে ৫৯২ কোটি ডলার, ২০১২ সালে ৭২২ কোটি ডলার এবং ২০১৩ সালে ৯৬৭ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। যদি ১ ডলারের গড় মূল্য ৭৫ টাকা হিসাব করা হয়, তাহলে ২০০৪-২০১৩ এই দশ বছরে পাচার হওয়া অর্থের বাংলাদেশি টাকায় পরিমাণ ৪,১৯,১০০ (চার লক্ষ উনিশ হাজার একশত) কোটি টাকা এবং গড়ে প্রতি বছর পাচার হওয়া অর্থের বাংলাদেশি মান ৪১৯১০ কোটি টাকা। আর শুধুমাত্র ২০১৪ সালে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ১০০০ কোটি ডলার, যার গড় মূল্য বাংলাদেশি টাকায় ৭৫০০০ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেহেতু প্রতিবছরই অর্থ পাচার হয়েছে, সুতরাং অর্থ পাচারের এই ধারা ২০১৫-১৬-১৭ সালেও অব্যাহত থাকাটা স্বাভাবিক। এদিকে ২০১৪ সালের জুন মাসে ইউএনডিপি কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাধীনতার পর থেকে চার দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ জিডিপির আকারের প্রায় ৩০ শতাংশ। সে হিসাবে গত চার দশকে প্রায় ৩ (তিন) লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।
প্রতিবেদন সমূহ থেকে আমরা দেখতে পেলাম, আমাদের দেশ থেকে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের দেশ অনুন্নত রয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে এই সব অর্থ উন্নত দেশে জমা হচ্ছে। ফলে উন্নত দেশসমূহ আরো উন্নত হচ্ছে। অর্থ পাচারের এই ধারা যেন নদীর পানির মতই প্রবাহমান। উঁচু এলাকার পানি যেমন সবসময় নদীর পথ ধরে নিচু এলাকার দিকে চলে যায়, ঠিক তেমনি আমাদের মত অনুন্নত দেশের অর্থও পাচার হয়ে উন্নত দেশে চলে যায়। ফলে অনুন্নত দেশের ভাগ্য ফেরে না, আর উন্নত দেশের অবস্থাও খারাপ হয় না। অনুন্নতরা অনুন্নতই থাকে আর উন্নতরা আরো উন্নত হতে থাকে। ফলে উন্নত দেশসমূহ আমাদের মতো অনুন্নত দেশসমূহের ওপর খবরদারি করে। অনুন্নত দেশসমূহ তখন উন্নত দেশসমূহের আজ্ঞাবহে পরিণত হয়। জিএফআই এর তথ্য অনুযায়ী, যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, তা যদি পাচার না হয়ে এদেশে থাকত এবং এদেশে বিনিয়োগ হতো, তাহলে বাংলাদেশ আজ আরো অনেক বেশি উন্নত হতো। শিক্ষার হার বাড়ত, শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা হতো, কর্মসংস্থান বাড়ত, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হতো, আরো বেশি জনগণ বিদ্যুত সুবিধা পেত, বেকারত্ব কমত, দারিদ্র্য কমত, আমদানি কমত এবং রপ্তানি বাড়ত। বড় বড় সেতু আর বিদ্যুত প্রকল্পের জন্য বিশ^্বব্যাংক, এডিবি, আইডিবি এবং বিদেশ থেকে ঋণ নিতে হতো না। তখন এদেশের মানুষের জীবন যাত্রার মান অনেক উন্নত হতো। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৩ সালে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ ৩৩৫ কোটি ডলার। ডলারের মূল্যমান ৭৫ টাকা ধরলে, বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ২৫১২৫ কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে ঐ বছরে বড় আকারের কমপক্ষে ১০০টি শিল্প কারখানা প্রতিষ্ঠা করা যেত। প্রতিটি শিল্প কারখানায় গড়ে ২০০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হলে ঐ বছরেই ২০০০০ (বিশ হাজার) মানুষের কর্মসংস্থান হতো। ফলে বেকারত্ব কমত। ঐ ১০০টি শিল্প কারখানায় যদি ৫০টি পণ্যও উৎপাদন হতো তাহলে ঐ ৫০টি পণ্য বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো না। ফলে ঐ ৫০টি পণ্য আমদানিতে কোনো অর্থ ব্যয় হতো না। দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি হতো এবং আমাদের জিডিপি বাড়ত। এভাবেই দেশ উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেত। এভাবে প্রতি বছরই যে পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে, সেই টাকা বিদেশে পাচার না হয়ে যদি দেশে বিনিয়োগ হতো, তাহলে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে উন্নতির দিকেই এগিয়ে চলত এবং আমরা একটি উন্নত দেশেই পরিণত হতাম। আমরা এখন একটি শিল্পসমৃদ্ধ দেশেই পরিণত হতাম। আমরা আমদানি প্রধান দেশ না হয়ে তখন রপ্তানি প্রধান দেশে পরিণত হতাম। তখন এদেশের লাখো মানুষকে রুজি রোজগারের জন্য বিদেশে যেতে হতো না। বরং দেশেই কর্মসংস্থান হতো।
এই যে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে চলে যাচ্ছে, তার সাথে কিন্তু সমাজের উঁচু স্তরের ব্যক্তিরাই জড়িত। দেশের গরিব দুঃখী মানুষেরা কখনো বিদেশে টাকা পাচার করে না। তাদের যেমন অর্থ নেই, ঠিক তেমনি অর্থ পাচার পথঘাটও তারা চেনে না। যারা বড় বড় ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি তারাই অর্থ পাচারের সাথে জড়িত। তারা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণের একটি অংশ উন্নত দেশে পাচার করছে। সেখানে বাড়ি কিনছে, গাড়ি কিনছে এবং সম্পত্তি কিনছে। সেখানেই তারা ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলছে। অনেকেই অন্য দেশকে সেকেন্ড হোম বানাচ্ছে। ফলে আমাদের অর্থে সেসব দেশ আরো উন্নত হচ্ছে। এই অর্থ পাচারের প্রধান অংশ সম্পাদিত হচ্ছে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে এবং এর শতকরা হার প্রায় ৫৮ শতাংশ। অর্থাৎ বিদেশে পাচারকৃত অর্থের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ ব্যাংকিং চ্যানেলকে ব্যবহার করে পাচার হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী পণ্য আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং করে অর্থাৎ পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থটা বিদেশে পাচার করে। আবার পণ্য রপ্তানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং করে অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে রপ্তানি পণ্যের মূল্যের একটি অংশ বিদেশেই রেখে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য আমদানির ঘোষণা দিয়ে খালি কন্টেইনার আনা হয় অথবা মূল্যবান পণ্য ঘোষণা দিয়ে ইট, বালি আর পাথর আনা হয়। এভাবে আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে এদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার করছে। এদিকে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণের একটি অংশ বিদেশে পাচার করার কারণে অনেক ঋণ গ্রহীতা ঠিকমত ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারে না বা পরিশোধ করে না। ফলে তারা ঋণ খেলাপী হচ্ছে। ব্যাংকের বিতরণকৃত ঋণের একটি অংশ আদায় হচ্ছে না এবং এতে ব্যাংকিং সেক্টর সমস্যায় পড়েছে। সুতরাং ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে বিদেশে যেন অর্থপাচার করতে না পারে সে জন্য ব্যাংকিং সেক্টরে মনিটরিং বাড়াতে হবে এবং সিস্টেম ডেভেলাপ করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেহেতু সব ব্যাংকের কন্ট্রোলিং অথরিটি, সুতরাং এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বটা সব চেয়ে বেশি। অর্থ পাচার রোধে দেশে মানি লন্ডারিং আইন প্রবর্তিত হলেও, অর্থ পাচার কিন্তু বন্ধ হয়নি। অর্থ পাচার রোধে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইঊনিট (বিএফআইউ), এনবিআর এবং দুদক কাজ করছে। কিন্তু অর্থপাচার বন্ধ হচ্ছে না। অর্থ পাচার বন্ধের জন্য ব্যাংকিং এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা আরো বাড়াতে হবে। একই সাথে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার বন্ধের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি টাকা পাচারে জড়িত এবং এর সহযোগীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি দুদক এবং এনবিআরসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঠিক এবং যথাযথ নজরদারি বাড়াতে হবে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে কিছু ব্যবসায়ী এবং শিল্পপতি বিদেশে টাকা পাচার করছে কেন? আর সেই টাকা দিয়ে তারা উন্নত দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে তুলছে কেন? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। প্রথম কারণ হচ্ছে নিজ দেশের প্রতি ভালবাসার ঘাটতি এবং দেশের মানুষের প্রতি ভালবাসার ঘাটতি। দ্বিতীয় কারণ, নাজুক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে নিজেকে এবং নিজের বিনিয়োগকে নিরাপদ মনে না করা। এই সঙ্গে দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকা, বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং উপাদান যেমন বিদ্যুত, গ্যাস সহজলভ্য না হওয়া। উপরন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং দুর্নীতিও রয়েছে। সুতরাং বিদেশে অর্থ পাচার বন্ধ করতে হলে এবং সেই অর্থ দেশে বিনিয়োগ করাতে হলে, সবার আগে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতা বন্ধ করতে হবে এবং সহনশীলতা সৃষ্টি করতে হবে। ব্যবসায়ীদেরকে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করার সুযোগ দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অথবা ভিন্ন মতালম্বী হবার কারণে কোনো ব্যবসায়ীকে হয়রানি করা যাবে না। বস্তুত, সর্বাগ্রে দেশে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর এবং দুনীর্তি নির্মূল করতে হবে। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দেশ থেকে অর্থ পাচার বন্ধ হোক এবং দেশ উন্নয়ন এবং শান্তির পথে অব্যাহতভাবে এগিয়ে যাক, এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ