Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৭ জামাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী।

গণতন্ত্র পিছু হটছে

মুনশী আবদুল মাননান | প্রকাশের সময় : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

গণতন্ত্র ও কর্তৃত্ববাদ একসঙ্গে যায় না। এদের অবস্থান পরস্পরবিরোধী দুই মেরুতে। গণতন্ত্র মানে জনগণের শাসন বা জনগণের রায়ভিত্তিক শাসন। আর কর্র্তৃত্ববাদী শাসন হলো, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষের শাসন বা তাদের মর্জিমাফিক শাসন। গণতন্ত্রে কিছু ত্রæটি-বিচ্যুতি বা সীমাবদ্ধতা থাকলেও এটাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে জনহিতৈষি শাসন ব্যবস্থা হিসাবে গণ্য। যেখানে বা সেসব দেশে গণতন্ত্র নেই, সেখানে বা সেসব দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার তাকিদ ও সংগ্রাম তাই সহজেই লক্ষ্য করা যায়। তারপরও বিশ্বে গণতন্ত্র আছে, এমন দেশের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। যেসব দেশে গণতন্ত্র আছে, সেসব দেশেও এখন দেখা যাচ্ছে, কর্তৃত্ববাদের প্রবণতা। এমতাবস্থায়, গণতন্ত্রের ভবিষ্যত দিয়ে বিশ্বের বিদ্ব্যৎ সমাজ বিচলিত ও চিন্তিত।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ফ্রিডম হাউসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশ্বের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতিতে সঙ্গতই উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, বিগত ১৩ বছর ধরে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনতি প্রত্যক্ষ করছে বিশ্ব। সুপ্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক দেশ থেকে শুরু করে দীর্ঘদিন ধরে কর্র্তৃত্ববাদী শাসনের অধীনে থাকা দেশ পর্যন্ত-সবখানেই গণতন্ত্রের স্বাধীনতাসূচক নিম্নমুখী। এর কারণ হিসাবে সংস্থাটি জানিয়েছে, বিশ্ব রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মেরুকরণের কারণেই পূর্বের তুলনায় অধিক দেশ এখন কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকছে। আর গণতন্ত্র পিছু হটছে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে বিশ্বের দেশগুলোকে গণতান্ত্রিক অবস্থার ভিত্তিতে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে; যথা : মুক্ত, আংশিক মুক্ত ও মুক্ত না। এই নিরিখে বিশ্বের ১৯৫টি দেশ ও ১৪টি অঞ্চলকে গবেষনার বিষয়বস্তু করে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সঙ্গতকারণে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া গবেষ্য ও বিবেচ্য বিষয় হিসাবে যথাযথ স্থান ও গুরুত্ব লাভ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাগরিক স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশ ‘মুক্ত’ গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে গণ্য হয়নি। গণ্য হয়েছে ‘আংশিক মুক্ত’ দেশ হিসাবে। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১০০ পয়েন্টের মধ্যে পেয়েছে ৪১ পয়েন্ট। রাজনৈতিক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ৭ স্তর বিশিষ্ট নিম্নমুখী সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম স্তরে। একইভাবে নাগরিক স্বাধীনতার সূচকে বাংলাদেশ পঞ্চম অবস্থানে। আর গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার ৭ স্তর বিশিষ্ট নিম্নমুখী সূচকেও তার অবস্থান পঞ্চম স্তরে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে: ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক দমনপীড়ন চালিয়েছে। বিরোধীদের দাবিয়ে রাখতে তারা নন্দিত ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও ভীতি প্রদর্শন করেছে এবং নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম চিহ্নিত হয়েছে। একইসঙ্গে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে সহিংসতা ঘটেছে এবং এক ডজনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থা নাজুকই বলা যায়। একমাত্র ভারত মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। বাকী নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা ও পাকিস্তান বাংলাদেশের মতই আংশিক মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় স্থান পেয়েছে। মিয়ানমারও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে। বলা বাহুল্য, অবস্থান এক ক্যাটাগরিতে হলেও এসব দেশের রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা একই রকম নয়। এক্ষেত্রে কমবেশী পার্থক্য রয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে, গণতান্ত্রিক সূচকে সবচেয়ে এগিয়ে আছে সুইডেন, নরওয়ে ও ফিলল্যান্ড। এই তিন ইউরোপীয় দেশ ১০০ পয়েন্টের মধ্যে পুরো পয়েন্ট পেয়েছে। মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র স্থান পেলেও দেশটির বর্তমান গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে সতর্ক বার্তা প্রদান করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা যে অবনতিশীল ধারায় রয়েছে, তাতে কোনো দ্বিমত নেই। শুধু ফ্রিডম হাউসের প্রতিবেদনে নয়, লন্ডনভিত্তিক দি ইকোনোমিস্টের ইন্টেলিসেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) ‘গণতন্ত্রের সূচক’ সম্পর্কিত প্রতিবেদনেও সেটি উঠে এসেছে। বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশ ও দুটি অঞ্চলকে নিয়ে সূচকটি তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থা, বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের কার্যকারিতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক অধিকারের বিবেচনায় ১০ পয়েন্টভিত্তিক এই সূচক তৈরি করা হয়েছে। পয়েন্টের ভিত্তিতে চারটি শ্রেণীতে দেশগুলোকে ভাগ করা হয়েছে; যথা : পূর্ণ গণতন্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র, মিশ্র শাসন ও স্বৈরতন্ত্র। ১০ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট পেয়েছে এবং তার অবস্থান দাঁড়িয়েছে ৯২তম। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো অবস্থান ভারতের। তার পরে শ্রীলংকা। বৈশ্বিক এই সূচকে ৯ দশমিক ৮৭ পয়েন্ট পেয়ে শীর্ষে আছে নরওয়ে। শীর্ষ পাঁচে অবস্থানকারী অন্য দেশগুলো হলো : আইসল্যান্ড, সুইডেন, নিউজিল্যান্ড ও ডেনমার্ক। সবার নীচে অবস্থান উত্তর কোরিয়ার।
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যে চিত্র দৃশ্যমান তা একইসঙ্গে অনভিপ্রেত ও দু:খজনক। দেশের মানুষ কখনই এ ধরনের পরিস্থিতি প্রত্যাশা করে না। গণতন্ত্রের জন্য তারা দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছে। অথচ আজও কাঙ্খিত গণতন্ত্র বা মুক্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কে না জানে, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খা মূখ্য ভূমিকায় ছিল। পাকিস্তানের ২৩ বছরের মধ্যে ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখার ষড়যন্ত্র এবং’ ৭১ সালের ২৫ মার্চ নিরিহ জনগণের ওপর সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে গণহত্যা শুরু করার প্রেক্ষিতে স্বাধীনতাযুদ্ধের সূচনা হয়, যার সমাপ্তি ঘটে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মধ্য দিয়ে। স্বাধীনতার লক্ষ্যসমূহের মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা ছিল না। রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের পাশাপাশি সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিা ছিল স্বাধীনতার লক্ষ্য। অত্যন্ত পরিতাপের হলেও বলতে হচ্ছে, এখনো রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত হয়নি। সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদাও চরম উপেক্ষার শিকার।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার যে সুযোগ এসেছিল, তা কাজে লাগানো হয়নি। বিষয়গুলো ব্রাত্য হিসাবে পরিত্যক্ত হয়েছিল। পরবর্তীকালেও এসব যথোচিত গুরুত্ব পায়নি।’ ৯০ সালের গণঅভ্যুস্থানের পর নব পর্যায়ে গণতান্ত্রিক ধারার উন্নয়ন, বিকাশ ও প্রতিষ্ঠায় একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। সে সম্ভাবনাও নষ্ট করা হয়েছে। গণতন্ত্রের অনিবার্য অনুসঙ্গ নির্বাচন। অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্যে দিয়েই গণরায়ের সুস্পষ্ট প্রতিফলন ঘটে। সেই রায়ভিত্তিক সরকারই গণতান্ত্রিক সরকার হিসাবে বিবেচিত হয়। লক্ষ্য করা গেছে, আমাদের দেশে ক্ষমতাসীন দলীয় সরকারের অধীনে যতগুলো সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তার একটিও গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য হয়নি। মাঝখানে নির্দলীয় তত্ত¡াবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এই ব্যবস্থা সংবিধান থেকে তুলে দেয়ার পর দুটি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একটি ২০১৪ সালে এবং অপরটি ২০১৮ সালে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিরোধীদলগুলো অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগ ও তার জোটসঙ্গীরা একতরফাভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয় পেয়ে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই ১৫৪ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ওই নির্বাচন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিলেও নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। নানা অনিয়মে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। দেশে-বিদেশে এ নির্বাচনও গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পটভূমিতে আশা করা গিয়েছিল, ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে। সব দল নির্বাচনে অংশ নেয়ায় সে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, এ নির্বাচন আগের নির্বাচনের চেয়েও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সরকারি দল, সরকার, প্রশাসন, আইনশৃংখলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশন একট্টা হয়ে এমন একটি নির্বাচন উপহার দিয়েছে, যার কোনো নজির বিশ্বের ইতিহাসে নেই। বিরোধীদলগুলোর অভিযোগ এবং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের অভিমত, নির্বাচনের আগের রাতেই কার্যত নির্বাচনটি হয়ে যায়। নির্বাচনের দিন ভোট গ্রহণ নিতান্তই ছিল লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। এ নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে এখনো আলোচনা-বিশ্লেষণ চলছে। আমরা এখানে এ নিয়ে কোনো আলোচনায় যেতে চাইনে। শুধু এটুকুই বলতে চাই যে, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে জনগণ অবাধে ভোট দিতে পারেনি। তাদের অধিকাংশই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এ দুই নির্বাচনে গণরায় প্রতিফলিত হয়নি। নির্বাচন হয়েছে বটে, তবে তাতে জনগণ ও গণতন্ত্র বিজয়ী হয়নি; শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে যে শাসন চলছে তাকে গণতন্ত্রসম্মত শাসন বলে অভিহিত করা যায় না। গণতন্ত্রের নামে চলছে ক্ষমতাসীনদের কর্র্তৃত্বশীল এক ধরনের শাসন, যেখানে জনগণের কোনো অংশগ্রহণ বা ভূমিকা নেই। গণতন্ত্রে জনগণের কাছে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহিতার সংস্থান রয়েছে। ক্ষমতাসীনরা সেই জবাবদিহিতা থেকেও নিজেদের মুক্ত করে নিয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের মালিক জনগণ হলেও তাদের মালিকানা এখন আর নেই। দেশের মালিকানা ক্ষমতাসীনরা নিজেদের করতল গত করে নিয়েছেন। জনগণের রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের যে অবনমন, সেটা যে এই কারণেই, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
গণতন্ত্রের নামে অথবা বেনামে যখন কোনো দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন জেঁকে বসে তখন কমন কিছু বৈশিষ্ট্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীনরা সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তাদের কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। বিশেষ করে প্রশাসন, আইনশৃংখলা বাহিনী ও বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ নিরংকুশ করেন। একইভাবে নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর তাদের ক্ষমতা ও প্রভাব সম্প্রসারিত করেন। তারা জনগণের অধিকার ও ক্ষমতার কোনো তোয়াক্কা করেন না। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর দমনপীড়নের স্টিন রোলার চালাতে দ্বিধা করেন না। এমন কি নাগরিক সাধারণতও এ দমন-পীড়ন থেকে রেহাই পায় না। জননিরাপত্তা নানাভাবে বিপন্ন হয়। তারা জনগণের রাজনৈতিক, নাগরিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের বিপরীতে উন্নয়নকে প্রাধান্য দেন এবং উন্নয়নের শ্লোগানের আড়ালে তাদের ক্ষমতায় থাকার যৌক্তিকতা প্রতিপন্ন করেন।
এই বৈশিষ্ট্যগুলোর আলোকে বাংলাদেশে এখন কোন ধরনের শাসন চলছে তার বিচারের ভার পাঠকবর্গের কাছেই রইল। বিশ্লেষকদের অনেকে বলেন, দেশে প্রকৃতপক্ষে কর্তৃত্ববাদী শাসনই চলছে। কর্র্তৃত্ববাদ ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে এবং গণতন্ত্রের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। কর্তৃত্ববাদী শাসন ও স্বৈরশাসনের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা বেশ কঠিন। মূলত এ দু’য়ের মধ্যে পার্থক্য মাত্রাগত। কর্তৃত্ববাদী শাসনের মাত্রাধিক্যতায় উদ্ভব হয় স্বৈরশাসনের। আমাদের দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন অতিক্রম করে স্বৈরশাসনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনের বিষয়ে এক অনুষ্ঠানে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বিশিষ্ট আইনবিদ ড. শাহাদীন মালিক বলেছেন, বিশ্বের দু’শটি দেশের মধ্যে ৫০টি দেশে গণতন্ত্র আছে। বাকী দেশগুলোতে স্বৈরতন্ত্র চলছে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের মিছিলে ঢুকে গেছে।
কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পরিণতি, বিশেষ করে শাসকদের পরিণতি কখনই ভালো হয় না। বিশ্বের ইতিহাসে এর নজিরের অভাব নেই। উদাহরণ হিসাবে ফিলিপাইনে মার্কোসের, নাইজেরিয়ায় সানি আবাচার এবং তিউনিশিয়ার বেন আলীর পরিণতির কথা স্মরণ করা যায়। এরকম নজির আরো দেয়া যায়, সেখানে শাসকদের পরিণতি হয়েছে অত্যন্ত করুণ। কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরশাসন কবলিত দেশ পরবর্তীতে বহু বছর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি, এমন নজিরও আছে। প্রতিটি দেশের ক্ষমতাসীনদের তাই সতর্ক হওয়া উচিৎ। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে পথ চলা উচিৎ। তাদের মনে রাখা উচিৎ, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। একদিন না একদিন তার অবসান ঘটবেই।
বিশ্বজুড়েই কর্র্তৃত্ববাদ যেভাবে আগ্রাসী হয়ে উঠছে এবং গণতন্ত্র কিছু হটছে তাতে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায় না। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে কীভাবে কর্র্তৃত্ববাদকে হটিয়ে দেয়া যায়, সেটা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের গভীরভাবে ভেবে দেখতে হবে। উপায় বের করতে হবে এবং সক্রিয় ও তৎপর হয়ে উঠতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন