Inqilab Logo

ঢাকা, বুধবার ২৬ জুন ২০১৯, ১২ আষাঢ় ১৪২৬, ২২ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

তিন হাজার সুইচ গেট অকেজো

৪০৫ নদীর পানি প্রবাহ রক্ষণাবেক্ষণ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসীনতা

পঞ্চায়েত হাবিব | প্রকাশের সময় : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

ভারত আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে উজান থেকে পানি প্রত্যাহার করে নেয়ায় নদীমার্তৃক বাংলাদেশের নদীগুলোতে এখন পানি নেই। অনেক নদীর পেটে ফসল ফলানো হচ্ছে। অনেক নদীতে ধূধূ বালু চর। নদী যেমন হারিয়ে যাচ্ছে তেমনি শত শত টাকা খরচ করে নির্মিথ সুইচ গেইটগুলোও অকেজো হয়ে পড়েছে। গেটম্যান না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মূলত সুইচ গেটগুলো ‘থেকেও নাই’ হয়ে যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের উদাসিনতার কারণে পুর্ন:নিমাণ এবং নতুন করে সুইচ গেট হচ্ছে না। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খননের অভাবে পলি জমা পড়ে নদী ও খাল ভরাট করাতে ও নাব্য কমে যাওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেগুলো সচল রয়েছে সেগুলো কোনটা অকেজো আবার কোনটা সঠিক সময়ে দেখভাল না করায় গ্রামীণ কৃষি ব্যবস্থাপনায় দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা।
সারাদেশে নদীর স্বাভাবিক চলার গতি ধরে রাখা এবং কৃষি ফসল বৃদ্ধিতে পানির সঠিক ব্যবহারের জন্য ৪ হাজার ৭২টি সুইচ গেট ও ৫২৯টি রেগুলেটর রয়েছে। পানি চলাচল না থাকার কারণে তিন হাজার সুইচ গেট ও রেগুলেটর প্রায় ২৫ বছর ধরে অকেজো। ৫শতাধিক সুইচ গেট বিভিন্ন সময়ে নদীভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে। অন্যদিকে সুইচ গেটে ও রেগুলেটর দেখাশোনার জন্য নিয়োজিত গেট ম্যান থাকলেও বাস্তবে অনেক জেলায় সুইচ গেট ও রেগুলেটর নেই। ভারত উজান থেকে পানি তুলে নেয়া এবং নদী খননের অভাবে পানি চলাচলের পথ বন্ধ। আবার অনেক সুইচ গেট ও রেগুলেটর দখল হয়ে গেছে। ১৫ বছর আগে সারাদেশের সুইচ গেট নির্মাণ ও সংস্কার সিদ্ধান্ত হলে তা বাস্তবায়ন করতে পারছে না পানি উন্নয়ন বোর্ডে। ভোলায় ১২টি সুইচ গেট। কিন্তু এখন ১০টিই অকেজো। জরাজীর্ণ সুইচ গেটগুলো দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। স্থানীয়রা সুইচ গেট গুলো মেরামত বা নতুন করে নির্মাণের দাবি জানালেও তা আজও বাস্তবায়ন হয়নি। কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে এগুলো নষ্ট হয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সুইচ গেট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
জানতে চাইলে পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম ইনকিলাবকে বলেন, নদীর স্বাভাবিক চলার গতি ধরে রাখা এবং কৃষি ফসল বৃদ্ধিতে পানির সঠিক ব্যবহার এবং ভয়াবহ বন্যার হাত থেকে ফসল বাঁচাতে সুইচ গেট নির্মাণ করছে সরকার। নদী খননের অভাবে পানি চলাচলের পথ বন্ধ। এ বিষয়ে আমি ক্ষতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নিব। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবির বিন আনোয়ার বলেন, আসলে নদী খনন কাজ শুরু হচ্ছে। এ গুলো শুরু হলে সুইচ গেট ও রেগুলেটর নিয়ে কাজ করা হবে। আমরা চাই নদীর পানির প্রবাহ ধরে রাখতে। সেই লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।
পরিবেশ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আতিক রহমান ইনকিলাবকে বলেন, বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ পানিসংকটে ভুগছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে এই সংকট চরম রূপ ধারণ করবে। জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, গ্রীনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি, এসব নিয়ে গোটা বিশ্বের মানুষ উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, পানি চলাচলের জন্য সুইচ গেট গুলোর দিকে নজর দেয়ার সময় এসেছে এখন। এ গুলোর সংস্কার করলে পানির প্রবাহ বৃদ্ধি পাবে।
চীন ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশগুলো বর্ষকালের নদ-নদীর পানি ধরে রাখা এবং পানি চলাচলের প্রবাহ ব্যবস্থা এখনো করতে পারেনি সরকার। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। ৪০৫ নদীর দৈর্ঘ ২৪ হাজার একশ ৪০ কিলোমিটার। এ গুলোর মধ্যে ৫৭টি আন্ত:সীমান্ত নদী। আন্ত:সীমার ৫৭টি নদীর মধ্যে ৫৪টি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং ৩টি নদী এসেছে মায়ানমার থেকে। এসব নদীর মাধ্যমে বয়ে আসা পলি মাটির উপরিভাগে স্তর জমেছে। দেশের কৃষকের জমিতে ফসল বৃদ্ধি করা এবং মরুভুমির হাত থেকে দেশ রক্ষার জন্য ৪০৫ নদ-নদীর পানি নিস্কাসন করতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে দুই হাজার ৩২৩টি সুইচ-গেট নির্মাণ এবং গেটম্যান নিয়োগ করে সরকার। দশ বছর যেতে না যেতে সুইচ গেট গুলো অকেজো হয়ে যায়। থমকে গেছে নদীর স্বাভাবিক গতি। পানি চলাচলের নিস্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় দখল হয়েছে হাজারো নদী। ভারত থেকে আসা ৫৪টি আন্ত:সীমান্ত নদীর ৪২টিতে বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়ার শুরু করে। পানি উন্নয়ন বোর্ড শুস্কমৌসুমে পানি ধরে রাখা এবং দেশের কৃষি জমিতে ফসল বৃদ্ধি করতে সুইচ গেট নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে সারাদেশে ২০০ থেকে ২৫৯টি সুইচ গেট থাকলেও বাকি গুলো নদীর ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশের কৃষকের জমিতে ফসল বাড়ানো জন্য বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও নিস্কাশন, নদী তীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ, ব-দ্বীপ উন্নয়ন, ভূমি পুনরুদ্ধার ৪০৫ নদ-নদীতে তীরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে খাল খনন এবং সুইচ-গেট নির্মাণের প্রকল্প চালু করে এর মধ্যামে সারাদেশে ৪ হাজার ৭২টি সুইচ গেট ও ৫২৯টি রেগুলেটর নির্মাণ করা হয়। পরে ১৯৯৪ খালেদা জিয়া সরকার সেচ, পানি উন্নয়ন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয়কে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় করে নদীতীর ভাঙ্গন প্রতিরোধ, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তুত ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যারেজ, রেগুলেটর, সুইস, খাল, বেড়িবাঁধ, রাবার ড্যাম, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ, উপকূলীয় বাঁধ নির্মাণ ও খাল খনন-পুনঃখনন করে সেচ, পানিবদ্ধতা নিরসন, বন্যা প্রতিরোধ, নদীর তীর ভাঙ্গন প্রতিরোধে নতুন করে প্রকল্পের কাজ শুরু করে। পরে ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে জাতীয় পানি নীতি চুড়ান্ত করে পরে ২০১৩ সালে পাস করা হয়। দেশের পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়ন সাধন। বন্যা, খরা, জলাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক নদীর প্রবাহ, লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন জনিত বিরূপ প্রভাব মোকাবেলা ও প্রাকৃতিক পরিবেশের যথাযথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষি, মৎস্য, বন রক্ষার ক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়ন সাধন করা। জাতীয় পানি নীতি, জাতীয় পানি মহাপরিকল্পনা, অংশগ্রহণ মূলক পানি ব্যবস্থাপনা গাইড লাইন এবং বাপাউবো আইন অনুসারে দেশের পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন। বিশ্বের অর্ধেকের বেশি মানুষ পানি সংকটে ভুগছে। ভূগর্ভস্থ পানি কৃষিকাজে ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। ভারত, চীন ও ভিয়েতনাম সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার সীমিত করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আগামী বছরগুলোতে এই সংকট চরম রূপ ধারণ করবে। এর মধ্যে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। পানি উন্নয়ন বোর্ডের জন্য বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিডব্লিউডিবি) কাজ করছে সম্পদ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ,সেচ, নিষ্কাশন, লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্র থেকে জমি পুনরুদ্ধার।
যেসব জেলায় সুইচ গেট ও রেগুলেটর রয়েছে সে গুলো হচ্ছে, কুড়িগ্রামের চিলমারীর কাঁচকলের বাজার রেগুলেটর, উলিপুর উপজেলার থেতরাই এলাকায় গোড়াই পিয়ার সুইচ গেট, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় তিনটি সুইচ গেট অবৈধভাবে খাল দখল করে মাছ চাষ করছে দখলদারেরা। পানিবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন খালের মুখে ১৪টি সুইচ গেট এর মধ্যে ১২টি পড়ে রয়েছে অচল অবস্থায়।
বিডব্লিউডিবি কয়েকটি বাস্তবায়ন করেছে পানি সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনায় ক্ষুদ্রও বয় প্রকল্প। পানিবাহী বাঁধ, নিষ্কাশন নিষ্কাশন চ্যানেল এবং সেচ খাল উপর নির্মিত হয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের জন্য। বিডব্লিউডিবি ১৪ হাজার ৫৯৭ কাঠামো তৈরি করেছে (টিওআর অনুযায়ী)। বন্যা নিয়ন্ত্রক, পালাবার, সেতু, কালভার্ট, সাইফন এবং জলদস্যু ইত্যাদি। এদের মধ্যে সুইচ সংখ্যা সর্বোচ্চ। এর আগে গ্যাস অপারেটর (গেট খালাশী) এই সুইচ নিয়ন্ত্রকদের অপারেশন করেছিলেন। বর্তমানে, অপর্যাপ্ত জনশক্তি কারণে,এইগুলি সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। নদীর চ্যানেল মাধ্যমে প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ, এবং সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়, এটি দরজা যা ব্লক পুনরুদ্ধার/কাজ করা কঠিন।মসৃণ উদ্ধরণ এবং স্থায়িত্ব জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োাজন দরজা। সময় এবং বন্যা ক্ষতি হ্রাস সঙ্গে, পানিবাহী কাঠামো প্রয়োজন ধীরে ধীরে হ্রাস করা। তাছাড়া, এই কাঠামো অধিকাংশ দরকারী জীবন শেষ। অপর্যাপ্ত বা অপর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ক্ষেত্র বিভাগে প্রদান করা হয় পানিবাহী কাঠামো।
নিয়মিত মেরামত এবং রক্ষণাবেক্ষণ অনুপস্থিতিতে, তার মসৃণ জন্য প্রয়োজন অপারেশন, পানিবাহী কাঠামো তার কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং অকার্যকরী হয়ে উঠছে। বর্তমানে নদী খনন কাজকে আরও গুরুত্ব দিচ্ছে। পানিবাহী কাঠামো কার্যকারিতা পর্যালোচনা করার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। দ্য কমিটি আবার বিডব্লিউডিবি, এলজিইডি এবং লেভেল বোর্ডের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত উপ-কমিটি গঠন করে আরএইচডি এবং বিডব্লিউডিবি এবং স্থানীয় সরকার বিদ্যমান জলবাহী কাঠামোর তালিকা সংগ্রহ করেছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ (এলজিইডি) কার্যকারিতা এবং শারীরিক সম্পর্কিত তথ্য সহশর্ত।
ভোলার মনপুরা উপজেলা কৃষক সামছুল আলম জানান, মেঘনার ভাঙন ও জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার জন্য এখানে ১০০ কিলোমিটার বাঁধের উপর নির্মাণ করা হয় ১২টি সুইচ গেট। কিন্তু এখন ১০টিই অকেজো। জরাজীর্ণ সুইচ গেটগুলো নতুন করে নির্মাণের দাবি করেন তিনি।



 

Show all comments
  • Md Mohsin Khan ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ৩:১২ পিএম says : 0
    Its a dangerous things for bangladesh
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ