Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১১ ফাল্গুন ১৪২৫, ১৭ জামাদিউস সানি ১৪৪০ হিজরী।

কর্ণফুলী পেপার মিলের বর্জ্যে দূষণের কবলে কর্ণফুলী

স্টাফ রিপোর্টার | প্রকাশের সময় : ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:৩৮ পিএম | আপডেট : ৬:৫৯ পিএম, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

কর্ণফুলী পেপার মিলের কেপিএম) তরল বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে কর্ণফুলী নদী। পরিবেশ অধিদপ্তরের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই এসব বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। এতে করে বিপন্ন হয়ে উঠেছে নদীর বা¯স্তুসংস্থান। বিলুপ্তির মুখে একাধিক প্রজাতির মাছ।
কেপিএম কর্মকর্তারা বলছেন, কারখানায় একটি ইটিপি (তরল বর্জ্য শোধনাগার) স্থাপন করা হলেও তা যুগোপযোগী নয়। নতুন ও আধুনিক ইটিপি স্থাপনের জন্য অনুমোদন চেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করছেন তারা। যদিও এ বিষয়ে ভিন্ন কথা বলছে পরিবেশ অধিদপ্তর।
কেপিএম সংলগ্ন কর্ণফুলী নদীতে দেখা গেছে, কারখানার তরল বর্জ্য ফেলা হচ্ছে নদীতে। কস্টিক অ্যাসিডের এ মিশ্রণ পানিতে ফেলায় কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর উপরের অংশ সাদা হয়ে গেছে। নদীর দুই তীরে কস্টিকের বর্জ্যরে ফেনা জমে লালচে আকার ধারণ করেছে। বদলে গেছে পানির রঙও। গত কয়েকদিনে বর্জ্যরে পরিমাণ বাড়ায় নদীর তীরবর্তী এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে।
কেপিএম সংলগ্ন চন্দ্রঘোনা দোভাষী বাজার এলাকার মাঝি মালেক জানান, কাগজ কল থেকে প্রতিদিন বিষাক্ত পানি ফেলা হচ্ছে নদীতে। বিশেষ করে সকালে কারখানা থেকে গন্ধযুক্ত বর্জ্য পানিতে ফেলা হয়। কারখানার বর্জ্যরে তীব্র দুর্গন্ধে যাত্রী ও মাঝিদের জন্য এখন নদী পারাপারও কঠিন হয়ে পড়েছে।

পরিবেশ অধিদপ্তর জানিয়েছে, পরিবেশ দূষণের দায়ে ২০১৫ সালের ২৯ অক্টোবর কেপিএমে অভিযান পরিচালনা করে অধিদপ্তর। ওই অভিযানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটিকে ১ কোটি ৮৩ লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানার পরিপ্রেক্ষিতে আপিল করে কেপিএম। এরপর জরিমানার টাকায় ইটিপি স্থাপনের শর্তে কেপিএমকে ছাড় দেয় অধিদপ্তর। এরপর তিন বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনো প্রতিদিনই নদীতে অপরিশোধিত তরল বর্জ্য ফেলছে প্রতিষ্ঠানটি। কর্ণফুলীর উজান থেকে এসব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন দিকে।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, কেপিএম কোনো ধরনের পরিশোধন ছাড়াই কস্টিক অ্যাসিড মিশ্রিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলছে। মাত্রাতিরিক্ত দূষিত বর্জ্যরে কারণে নদীতে মা মাছ এসে ডিম ছাড়তে পারে না। মাছের আবাসস্থল হিসেবে পানির সর্বোচ্চ সহনশীল ঘনত্বের পরিমাণ সাড়ে ৭ পয়েন্ট টিএস। অন্যদিকে কর্ণফুলীতে এ ঘনত্বের মাত্রা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ পয়েন্ট বেশি। এ কারণে কেপিএম সংলগ্ন এলাকা ছাড়াও নদীর কয়েক নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত দূষিত বর্জ্যরে কারণে মাছের প্রজনন ও বংশবৃদ্ধিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে। এক সময় কর্ণফুলী নদীতে খয়রা, লাল চান্দা, পাবদা, সরপুঁটি, তিতপুঁটি, মায়াসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব ছিল। দূষণের কারণে বর্তমানে নদীতে এখন আর এসব মাছ পাওয়া যায় না। এভাবে দূষণ চলমান থাকলে নদী থেকে চলাপুঁটি, টেংরা, ফলই, ভেদা, শিং, মাগুর, কই, বেলে, মহাশোল, গজার, বোয়াল, লাল খলিশা, বাইম ও গোরকুতে মাছও বিলুপ্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কেপিএম কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযোগের পর একটি ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে কেপিএমে। তবে এ ইটিপি খুব একটা কার্যকর বা যুগোপযোগী নয়। কেপিএমে নতুন একটি আধুনিক ইটিপি স্থাপনের জন্য এরই মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল করপোরেশনে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন পেলে তরল বর্জ্য নদীতে না ফেলে পরিশোধন করা সম্ভব হবে।

যদিও পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, ২০১৫ সালে জরিমানা করার পর থেকে কেপিএমে ইটিপি স্থাপনের কোনো নথি পরিবেশ অধিদপ্তরে নেই। নিয়ম অনুযায়ী কোনো কারখানায় ইটিপি স্থাপন করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন প্রয়োজন। পরিবেশের নির্দেশনা অনুসারে এ-সংক্রান্ত বিষয়ে অনুমোদন দেয়া হয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কেপিএম কর্তৃপক্ষ বর্জ্য পরিশোধনে ইটিপি স্থাপনে কোনো উদ্যোগের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানায়নি।
কেপিএমের ডেপুটি ম্যানেজার (প্রশাসন) চিৎ সুই মারমা বলেন, কর্ণফুলীর দূষণ এড়াতে আমরা ইটিপি স্থাপন করেছি। কিন্তু স্থাপিত ইটিপি যুগোপযোগী নয়। বর্তমানে কেপিএমকে একটি আধুনিক কারখানায় রূপান্তরের চেষ্টা করা হচ্ছে। সেটি বাস্তবায়িত হলে কেপিএমের বর্জ্য পরিশোধন প্রক্রিয়াও আধুনিক করা হবে।

অন্যদিকে পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক বদরুল হুদা বলেন, ২০১৫ সালে জরিমানা করার পর কেপিএম কর্তৃপক্ষের ইটিপি স্থাপনের বিষয়ে কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। সে সময় এ নিয়ে গঠিত পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থায়ী কমিটি জরিমানার টাকায় ইটিপি ব্যবস্থাপনা কার্যকর করে অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছিল। এরপর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তারা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ইটিপি অনুমোদনের বিষয়ে কোনো ছাড়পত্র নেয়নি। যদি তারা ছাড়পত্র না নিয়ে কারখানা পরিচালনা করে, তবে সেটি অবৈধ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ