Inqilab Logo

ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৬ আশ্বিন ১৪২৬, ২১ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

পানি দূষণের লাগাম টানতে হবে

| প্রকাশের সময় : ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

বাংলাদেশের নদনদীগুলো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। এসব নদনদীর মাধ্যমেই হাজার বছর ধরে এ দেশকে সুজলা-সুফলা সৌন্দর্যের মহিমা দান করেছে। নদীবাহিত পলিমাটি দিয়ে গড়ে ওঠা এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের অস্তিত্বের সাথে নদনদীর অস্তিত্ব নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। তবে গত চার দশকে দেশে নগরায়ন, শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের হাত ধরে নদনদী, খাল-বিল, হ্রদ-পুকুর থেকে শুরু করে ওয়াসার পরিশোধিত পানি সরবরাহ লাইন পর্যন্ত পানির প্রতিটি উৎসই ভয়াবহ দূষণের শিকার হয়ে পড়েছে। দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ নদনদী দখল ও দূষণের শিকার হয়ে প্রতিবেশ-পরিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্যের উপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ঢাকা শহরের চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু নদীর প্রবাহ এখন ক্রমাগত দখলবাজিতে সংর্কীণ হয়ে পড়েছে। নদীর উপর যথেচ্ছ নাগরিক বর্জ্য ডাম্পিং করে এবং শত শত শিল্পকারখানার ভারী তরল বর্জ্য ফেলার কারণে এসব নদীর পানি বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে গেছে। দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহর ও শিল্পাঞ্চল ঘেঁষে প্রবাহিত নদীগুলোর প্রায় একই অবস্থা বিরাজমান। এসব নদীর দখল ও দূষণমুক্তি ছাড়া আগামী দিনের সমৃদ্ধ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।
অনবরত দখল ও দূষণে বিপর্যস্ত নদনদী ও জলাভূমিগুলোর অস্তিত্ব সংকট সম্পর্কে জনমনে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা গেলেও নদনদী দখল ও দূষণমুক্তির বাস্তব পদক্ষেপ এবং সাফল্যের হার খুবই হতাশাজনক। আমাদের বেশির ভাগ নদনদী চীনের তিব্বত, নেপাল ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আন্তর্জাতিক বা যৌথ নদী হিসেবে এসব নদীর উপর কোনো দেশের একক কর্তৃত্ব বা নিয়ন্ত্রণ খাটে না। কিন্তু মূলত ভারত আন্তর্জাতিক নদী আইন এবং কনভেনশন অগ্রাহ্য করে যৌথ নদীর উপর ক্রমবর্ধমান হারে বাঁধ নির্মাণ, পানি প্রত্যাহার, পানিবিদ্যুত উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে চলেছে। ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুধু বাংলাদেশেই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়নি, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশাল এলাকার জনজীবন ও স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ভারতীয় পরিবেশবাদীদের তরফ থেকেও এখন ফারাক্কা ভেঙ্গে দেয়ার দাবি উঠেছে। একইভাবে তিস্তা নদীর উপর গজলডোবা বাঁধের কারণে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল এলাকা মারাত্মক পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। দেশের বৃহত্তম তিস্তা সেচ প্রকল্প এখন পানির অভাবে অকেজো হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এসব হচ্ছে যৌথনদীর উপর ভারতের পানি আগ্রাসনের কুফল। উজানের বাঁধ ও পানি প্রত্যাহার ছাড়াও বাংলাদেশের নদ-নদীগুলোর বর্তমান করুণ অবস্থার জন্য মূলত দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিস্ক্রিয়তা ও নজরদারির ব্যর্থতা দায়ী।
শিল্প দূষণের বিষ ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত আমাদের দেশের সব নদীই এক সময় স্বচ্ছ পানির স্রোত ধারায় নানা প্রজাতির অনেক মাছ, জলজ প্রাণপ্রার্চুয্যে পরিপূর্ণ ছিল। সুপেয় পানির প্রধান উৎসও ছিল নদীগুলো। ঢাকার চারপাশে চারটি নদী এখনো প্রবাহমান থাকলেও এসব নদীর পানি এখন আর কোনো কাজেই আসে না। এমনকি উন্নত প্রযুক্তির উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেশিনে পরিশোধিত করেও ভয়াবহ দূষণকবলিত এসব নদীর পানিকে নিরাপদ করা সম্ভব হয় না। বুড়িগঙ্গার দূষণের জন্য হাজারি বাগের টেনারি শিল্পের রাসায়নিক তরল পদার্থকে দায়ী করা হয়েছে দশকের পর দশক ধরে। বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করতে টেনারিশিল্প স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে সাভারে চামড়াশিল্প নগরী স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয়ার পরও তা বাস্তবায়নে দেড় দশক সময় পার হয়ে গেছে। এ সময়ে বুড়িগঙ্গার পাশাপাশি ঢাকার চারপাশের সব নদনদীর বিশাল অংশ দখল ও দূষিত হয়ে গেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, যশোরসহ সর্বত্রই নদী দখল ও দূষণের এক বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় নেমেছে প্রভাবশালী মহল। নদী দখল ও দূষণমুক্ত করতে উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময়ে রুল, গাইডলাইন ও নির্দেশনা জারি করলেও এসব নির্দেশনার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। ঢাকা শহর ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম দূষিত ও বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় স্থান পেয়েছে। যে তৈরী পোশাক ও টেক্সটাইল খাতের উপর ভর করে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি মজবুত হচ্ছে, এ খাতের হাজার হাজার ডাইং ও টেক্সটাইল কারখানা থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ লিটার তরল রাসায়নিক। বাধাহীনভাবে সরাসরি নদীতে মিশে যাচ্ছে। গতকাল পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নদীতে বর্জ্য ফেলার বর্তমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০২১ সাল নাগাদ বছরে ২০ হাজার ৩০০ কোটি লিটার অপরিশোধিত রাসায়নিক মিশ্রিত তরল বর্জ্য নদীতে পড়বে। যে কোনো দেশের নদী, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য এ এক ভয়াবহ বাস্তবতা। নদনদী সুরক্ষায় নদী কমিশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ব্যর্থতা সুচিহ্নিত। সম্প্রতি হাইকোর্ট এ সম্পর্কে আবারো সুস্পষ্ট মতামত নির্দেশনা জারি করেছে। আদালত নদীকে একটি জীবন্ত সত্ত্বা বা লিগ্যাল পারসন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নদী রক্ষায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনা জারি করেছে। প্রতিটা নদনদীর পানি থেকে শুরু করে ভূগর্ভস্থ পানির নিরাপত্তা এবং ওয়াসার পানির লাইনের সুরক্ষার পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। ডাইং কারখানাসহ সব শিল্প কারখানায় ইটিপি বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: পানি

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন