Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৯, ৩০ আশ্বিন ১৪২৬, ১৫ সফর ১৪৪১ হিজরী

বিড়ি ফ্যাক্টরিতে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম

কুষ্টিয়া এস এম আলী আহসান পান্না | প্রকাশের সময় : ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

কুষ্টিয়ায় বিড়ি ফ্যাক্টরিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে দশ হাজার শিশু। এসব শিশুরা বিড়ি ফ্যাক্টরিতে কাজ করে বিভিন্ন রোগে ভূগছেন। কুষ্টিয়া শহরসহ জেলায় ১১টি বড় ফ্যাক্টরি ও ছোট্ট প্রায় অর্ধশতাধিক ফ্যাক্টরি রয়েছে। এসব ফ্যাক্টরিতে ঝুঁকিপূর্ণভাবে কাজ করছে শিশু শ্রমিকরা।
সূত্রমতে, কুষ্টিয়ায় প্রায় অর্ধশত বিড়ি ফ্যাক্টরি রয়েছে। যেখানে কাজ করেন শত শত শ্রমিক। এর মধ্যে শিশু শ্রমিকই বেশি। বড় ফ্যাক্টরিগুলো হলো : দৌলতপুরে আকিজ বিড়ি ফ্যাক্টরি ২টি, নাসির বিড়ি ইন্ডাস্ট্রিজ লি. ২টি, এন জামান ইন্ডাস্ট্রিজ লি., বনানী বিড়ি। ভেড়ামারায় সোনালী বিড়ি, মনোমোহন বিড়ি ফ্যাক্টরি ২টি, কালাম বিড়ি ফ্যাক্টরি, কুষ্টিয়া সদরে মুনসুর বিড়ি ফ্যাক্টরি।
এক হিসেবে কুষ্টিয়ার বিড়ি কারখানাগুলোতে মরণব্যাধির সঙ্গে যুদ্ধ করে প্রায় দশ হাজার শিশু ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাকে (আইএলও) দেয়া প্রতিশ্রুতি মতে ২০১৫ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রম পুরোপুরি নির্মূল করবে বাংলাদেশ। এ জন্য সরকার ৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দুই বছর মেয়াদে ২০১১-১৩ সালে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত শিশুদের পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। কিন্তু কুষ্টিয়া জেলায় দশ হাজার শিশু বিড়ির কারখানায় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করলেও এ জেলা রয়েছে এই প্রকল্পের আওতার বাইরে।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আল্লার দরগা এলাকার নাসির বিড়ি ফ্যাক্টরিতে গিয়ে দেখা গেছে। ওই ফ্যাক্টরিতে অনেক শিশু এ কাজে নিয়োজিত।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুষ্টিয়ার দৌলতপুরসহ কুষ্টিয়া শহরের বিড়ি কারখানার মেঝেতে অন্য শ্রমিকের সঙ্গে অনেক শিশু কাজ করছে। ওদের মধ্যে আট থেকে দশ বছরের শিশু রয়েছে। কারখানার মেঝেতে বসে কেউ খালি শলা তৈরির ঠোঙার ভেতর তামাকের গুঁড়া ভরছে, কেউ আগুন দিয়ে বিড়ির পলি-প্যাকেটের মুখ বন্ধ করছে, কেউবা আঠা দিয়ে প্যাকেটের মুখ লাগাচ্ছে। এই বয়সে হাতে কলম খাতা থাকার কথা থাকলেও কোমলমতি এসব শিশুর হাত রূপান্তর হচ্ছে বিড়ি শ্রমিকের হাতে। রাসেলের কাছে কাজের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে সে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ থাকে। পাশেই কাজ করছিল বড় ভাই মাসুদ। সে এই প্রতিবেদককে বলে, স্কুলে ঠিকমত না যাওয়ার কারণে বিড়ি তৈরির কাজে লাগানো হয়েছে। বাবা গ্রামে ট্রাক্টর চালায়, মা গৃহিণী। বাবা ও দুই ভাইয়ের সামান্য আয় দিয়ে তাদের সংসার চলে। শিশু রাসেল এ কাজ করে মাসে গড়ে ৮শ’ থেকে হাজার টাকা আয় করে। পাশেই কাজ করছিল অপর শিশু বাদল। সঙ্গে আছে বাবা-মা। বাদলকে তার বাবাই এ পেশায় এনেছেন। এখন দুই ভাই, মা ও বাবার বিড়ি তৈরির আয় দিয়ে সংসার চলছে। শিশু বাদলের মতে, অনেক দিন ধরেই এ কাজ করছে সে। প্রতিদিন সে প্রায় এক থেকে দেড় হাজার শলায় তামাক ভরতে পারে। বাদলসহ তার পরিবারের অন্য সদস্যদের বিড়ি তৈরিতে প্রতিদিন মজুরি পাচ্ছে দেড় শ’ থেকে ১৮০ টাকা। তা দিয়ে কোনো মতে মাস পার করলেও বাদলের স্কুলে যাওয়ার মতো টাকা থাকে না। ফলে স্কুলে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও শিশু বাদল যেতে পারছে না।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, একশ্রেণীর কার্ডধারী শ্রমিক রয়েছে। তারা বিড়ি কারখানার আশপাশের গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের কাজের টোপ দিয়ে বিড়ি ফ্যাক্টরিতে নিয়োজিত করছে। বিনিময়ে ওই কমিশন পাচ্ছে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে অনেক শিশুকে তামাক কারখানায় নিয়োজিত করছে।
বিড়ি তৈরির কাজে নিয়োজিত শিশুদের স্বাস্থ্যজনিত ক্ষতির বিষয়ে অধ্যাপক ফারুক বলেন, ধূমপান করলে স্বাস্থ্যে সাধারণত ফুসফুসে ক্যান্সার, লিভার, কিডনিসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়। বিড়ি কারখানার শ্রমিকরা একই ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়। তবে শিশু শ্রমিকদের ঘাতক বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ শিশুদের লিভার, ফুসফুস, কিডনি থাকে অপরিপকস্ফ। যে কারণে তাদের ক্ষতির আশঙ্কা বেশি।
আইএলও প্রকল্প স্বেচ্ছাসেবক আমানুর আমান বলেন, ওই সময় প্রকল্পের অধীনে কুষ্টিয়ার ছয়টি বিড়ি ফ্যাক্টরি থেকে ৩ হাজার ৪শ’ শিশুকে বের করে আনা সম্ভব হয়। এরমধ্যে ১০ বছরের নিচে শিশুদের স্কুলে পাঠানো হয়েছে এবং ১৬ বছরের উপরের শিশুদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অন্য কাজে লাগানো হয়েছে। তার মতে, ছয় বিড়ির কারখানাতে ৬ হাজার শিশু শ্রমিকের খোঁজ মিলেছে। এখন অবশ্য ১০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আইএলও প্রকল্প বন্ধ করে দেয়ায় বিড়ি কারখানায় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে যায়। অনেক শিশু ফের বিড়ি তৈরির কাজে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে কুষ্টিয়া জেলায় বিড়ি শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন