Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৬ মার্চ ২০১৯, ১২ চৈত্র ১৪২৫, ১৮ রজব ১৪৪০ হিজরী।

খাস জমিতে মৃত্যুকূপ!

চট্টগ্রামে অগ্নিকান্ডে ৮ জনের মৃত্যু, ২শ’ বসতঘর ছাই, খোলা আকাশের নিচে মানুষের আহাজারি

রফিকুল ইসলাম সেলিম | প্রকাশের সময় : ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০২ এএম

কর্ণফুলীর তীরে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর পর তাদের চলে যেতে বলা হয়। তারাও যেতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু বাধ সাধেন অবৈধ দখলদার বস্তির মালিকেরা। অনেকটা জোর করেই বাসিন্দাদের আটকে রাখা হয়। আর এরমধ্যেই ঘটলো ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনা। বন্দরনগরীর চাক্তাই বেড়ার মার্কেট এলাকার বস্তিতে গতকাল রোববার ভোরে এ আগুনে একই পরিবারের ৪ জনসহ ৮ জন মারা গেছে। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে বস্তির দুই শতাধিক আধা পাকা ও টিনের বসতঘর। সর্বস্ব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে কয়েক হাজার মানুষ।
স্বজন আর সহায়-সম্বল হারানো মানুষের আহাজারিতে এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, খালের জমি দখল করে বস্তির নামে মৃত্যুকূপ তৈরি করেছিল দখলদারেরা। চোর-বাটপারের উৎপাতে ঘরে তালা দিয়েই ঘুমাতে হতো তাদের। এ মৃত্যুকূপ থেকে বাসিন্দাদের অনেকেই পালিয়ে জীবন বাঁচালেও সহায়-সম্বল কিছুই বাঁচাতে পারেননি। অগ্নিকান্ডকে রহস্যজনক বলছেন বাসিন্দারা। তাদের ধারণা, দখলদারদের বিরোধে কোন পক্ষ আগুন লাগিয়ে দিতে পারে। অগ্নিকান্ডের সময় কিছু মুখোশধারীকে এলাকা থেকে পালাতেও দেখেন কেউ কেউ।
নিহতরা হলেন রহিমা আক্তার (৫০), তার মেয়ে নাজমা আক্তার (১৪) ও নাসরিন আক্তার (৪) এবং ছেলে জাকির হোসেন বাবু (৯), আয়েশা আক্তার (৩৭), তার ভাগ্নে সোহাগ (১৮), হাসিনা আক্তার (৩৯) ও অজ্ঞাত একজন। পুলিশ জানায়, তার লাশ পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়ায় শনাক্ত করা যাচ্ছে না। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ভোর সোয়া ৩টা নাগাদ বস্তির সাত্তার কলোনীর মুখে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হয়। এরপর মুহূর্তে আগুন পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট থেকে ১০টি গাড়ি ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। টানা এক ঘণ্টার প্রচেষ্টায় সোয়া ৪টা নাগাদ আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। অগ্নিকান্ডের কারণ জানা যায়নি উল্লেখ করে ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলেন, গ্যাস সিলিন্ডার, বিদ্যুতের খোলা তার কিংবা মশার কয়েল থেকে অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত হতে পারে। তবে এটি পরিকল্পিত নাশকতা কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাকলিয়া থানার ওসি প্রণব কুমার চৌধুরী জানান, অগ্নিকান্ডের সময় বাসিন্দারা ঘুমিয়ে ছিল। এ কারণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। বস্তিবাসীর অভিযোগ প্রসঙ্গে অগ্নিকান্ডের নেপথ্যে অন্য কোন ঘটনা আছে কিনা তা তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
অনেককে বাঁচিয়ে অঙ্গার রহিমা
আগুন লাগার কিছুক্ষণের মধ্যেই রহিমা আক্তারের ঘুম ভেঙে যায়। বস্তির বাসিন্দা পারভীন, সালমা ও খুরশিদা বলেন, আগুন লাগার সাথে সাথে চিৎকার শুরু করেন রহিমা। তিনি সবাইকে ঘর থেকে বের হয়ে আসতে বলেন। তার ডাকে সাড়া দিয়ে আমরা ছেলে-মেয়েদের নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাই। কিন্তু রহিমা তার সন্তানদের নিয়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছেন। বস্তির গলির মুখেই সাত্তার কলোনীতে রহিমার বাসা। ১৮শ’ টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে ৪ ছেলে-মেয়েকে নিয়ে থাকতেন তিনি। তাদের মধ্যে মেয়ে নাসরিন (১১) কোনমতে প্রাণে বাঁচলেও ২ মেয়ে ১ ছেলেসহ পুড়ে কয়লা হয়ে যান তিনি। স্বামী সুরুজ আলী দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যান। সংসারের হাল ধরেন রহিমা। বস্তির মুখে একটি মুদি দোকান ছিল তার। ওই দোকান চালিয়ে সংসার চালাতেন রহিমা। মাসহ ভাই-বোনদের হারিয়ে আহাজারি করছিলেন নাসরিন। তার কান্না আর আহাজারিতে প্রতিবেশীদের চোখেও অশ্রু।
ঘরের দরজায় ছিল তালা
বস্তির বাসিন্দা রুমা আক্তার জানান, বেশিরভাগ ঘরে রাতে তালা দেয়া ছিল। চোর ও নেশাখোরদের উৎপাতে বাসিন্দারা রাতে ঘুমানোর সময় ভেতর থেকে তালা দিয়ে ঘুমান। হঠাৎ অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ঘুম থেকে উঠে হতবিহ্বল বাসিন্দাদের অনেকে চাবি খুঁজে পাচ্ছিলেন না। নুর বেগম বলেন, ঘরের চালে আগুন চারিদিকে আগুনের লেলিহান শিখা ছেলে-মেয়ে আর নিজের জীবন নিয়ে কোনমতে রক্ষা পেয়েছি। ঘরে থাকা সহায়-সম্বল সবকিছুই ছাই হয়ে গেছে। বস্তির গলি এতটাই সরু ছিল যে কোন মালামাল সরানো যায়নি। পারভীন আক্তার বলেন, কোলের শিশু নিয়ে দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হয়ে জীবন বাঁচিয়েছি। বাসায় থাকা টাকা-পয়সা সবই গেছে। সালমা বেগম কাজ করেন মাছের আড়তে। ১০ বছর ধরে আয়ের একটি অংশ জমিয়ে লাখ টাকা করেছিলেন। ঘরে থাকা সহায়-সম্বলের সাথে পুরো টাকাটাও ছাই হয়ে গেছে। বস্তির বাসিন্দাদের বেশিরভাগই দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার বিভিন্ন উপজেলার বাসিন্দা। তারা মূলত চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে শ্রমিক ও মাছের আড়তে কাজ করেন। নারীদের বেশিরভাগই গার্মেন্টস কর্মী।
খাস জমিতে অবৈধ স্থাপনা
রাজখালী খালের পাশে খাস জমিতে গড়ে তোলা হয় এ বস্তি। এসব বস্তির মূল মালিক ৫ জন। মোট ১০৮ জনের একটি সিন্ডিকেট খাস জমি দখল করে সেখানে বসতঘর তৈরি করেছে বলে জানান স্থানীয়রা। গ্যাস না থাকলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল বস্তিতে। বস্তির বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ বলেন, প্রতিটি কক্ষের ভাড়া দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। কর্ণফুলী নদীর তীরে উচ্ছেদ অভিযান শুরুর পর ভাড়াটিয়াদের অনেকেই বাসা ছেড়ে চলে যেতে চাইলেও মালিকরা যেতে দেয়নি। ঘোষণা ছাড়া চলে গেলে দুই মাসের অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে বলেও হুমকি দেয় মালিক পক্ষ। ভাড়াটিয়া আবুল হোসেন জানান, জেলা প্রশাসনের লোকজন এ বস্তিও উচ্ছেদ হবে জানায়। এ আতঙ্কে আমরা চলে যেতে চাই। কিন্তু বাড়িওয়ালারা আমাদের জিম্মি করে রাখে। তারা বলেন, উচ্চ আদালতে মামলা আছে, কোন সমস্যা হবে না। তবে থানার ওসি প্রণব কুমার চৌধুরী এমন কোন অভিযোগ পাননি বলে জানান। স্থানীয়রা জানায়, দখলদাররা সরকারি দলের লোক হওয়ায় নিরাপদেই আছেন।
৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি
অগ্নিকান্ডের খবর পেয়ে সেখানে ছুটে যান সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন ও পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম। তারা শোকাহত পরিবারের সান্ত¦না দেন এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দেন। তার আগে সেখানে যান চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন। তিনি তাৎক্ষণিক নিহতদের দাফন-কাফনের জন্য ২০ হাজার টাকা করে সাহায্য দেন। অগ্নিকান্ডের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মাশহুদ-উল কবিরকে আহ্বায়ক এবং ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক আলী আকবরকে সদস্য সচিব করে ৪ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, তদন্তে অগ্নিকান্ডের আসল কারণ বের হয়ে আসবে। প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: অগ্নিকান্ড


আরও
আরও পড়ুন