Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার ২১ জুলাই ২০১৯, ০৬ শ্রাবণ ১৪২৬, ১৭ যিলক্বদ ১৪৪০ হিজরী।

কবি আল মাহমুদের চলে যাওয়া এবং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি

জামালউদ্দিন বারী | প্রকাশের সময় : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি আল মাহমুদ নিজের মৃত্যুর ক্ষণটিকে কবিতায় এভাবে প্রত্যাশা করেছিলেন, ‘কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রিশেষে শুভ শুক্রবারে/ অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে/ ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।’ কবির এই ইচ্ছাকে আল্লাহ কবুল করেছেন। শুক্রবার ভোরে না হলেও গত শুক্রবার ১৫ ফেব্রæয়ারী বসন্তের কুয়াশা ঢাকা রাতে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন। কবি আল মাহমুদের এ চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়ের যবনিকাপাত ঘটল। মৃত্যুর আগে বেশ কয়েক বছর ধরেই আল মাহমুদ বার্ধক্যজনিত অসুস্থ্যতা ও স্মৃতিভ্রষ্টতায় আক্রান্ত ছিলেন। তারো আগে থেকেই তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল। নিজের এই দৃষ্টিহীনতাকে (কানা) ব্যঙ্গ করে তিনি কবিতাও লিখেছেন। তবে চিরবিদায়ের আগে অসুস্থ্য হয়ে ইবনেসিনা হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সর্বদাই নিজের কাব্যচিন্তা, সময় ও স্বদেশ ভাবনাকে আগ্রহ ও আকুতি নিয়ে আগলে ধরতে সচেষ্ট ছিলেন। এই পাললিক বাংলার মানুষের বিশ্বাস ও ভালবাসার সাথে সর্বান্তকরণে একাত্ম হওয়া আল মাহমুদের ক্রনলজিক্যাল ইতিহাস যেন সংশয়- অবিশ্বাস ও বিশৃঙ্খলা থেকে একটি বিমূর্ত সত্যের পেছনে অটল আস্থায় অনড় দাঁড়িয়ে থাকা এবং নিয়তির অমোঘ সত্যকে আলিঙ্গণ করার মূর্ত ইতিহাস। আজকে আমরা যখন সমাজ বাস্তবতার সর্বত্র নষ্ট রাজনীতির কালো আঁচড় দেখতে পাচ্ছি, এমনকি আমাদের শিল্প-সাহিত্যেও তার করাল প্রভাব দেখা যাচ্ছে, তখন আল মাহমুদ সময়ের কঠিন বাস্তবতার গড্ডলিকা ¯্রােত অতিক্রম করে নিজেকে চিরায়ত সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে সমকালীন সতীর্থ লেখক-সাহিত্যিকদের নির্ভীক- সাহসি উচ্চারণের পথ দেখিয়ে গেছেন। আল মাহমুদ কোনো প্রথাবিরোধী , দ্রোহী বা উদ্ধত ধাঁচের কবি- লেখক বা চিন্তক ছিলেন না। তিনি তাঁর পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে পাওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং এর ঘাত-প্রতিঘাত সম্পর্কে খুবই সচেতন ছিলেন। নাগরিক জীবনের ঘোরপ্যাঁচ ও লৌকিক জৌলুস উপেক্ষা করে আল মাহমুদের লেখক-সত্তা ও কাব্যভাষার সাথে পাললিক মাটির সোঁদা গন্ধ ও শেকড়ের প্রতি দুলর্ক্সঘ টান সদা সক্রিয় ছিল। শেকড়ের সেই শক্তিকে আশ্রয় করেই তিনি নিজস্ব ঢঙ্গে ও নিজের অকৃত্রিম ঐশ্বর্যে নির্মান করেছেন একান্তই নিজস্ব কাব্য ভাষা ও সাংস্কৃতিক দর্শণ। যে যাই বলুন, আল মাহমুদকে কোনো নির্দিষ্ট বা একদেশদর্শী রাজনৈতিক ভাবাদর্শের সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ করে দেখানোর চেষ্টা ব্যর্থ হবে। সমাজ ও রাজনীতির কঠিন, রূঢ় বাস্তবতার ফাঁদ এড়িয়ে নিজের কমিটমেন্ট রক্ষা করে, স্বপ্ন ও অভীষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছতে শিল্পীকে কখনো সাহসী কখনো কুশলী ভূমিকা পালন করতে হয়। এক প্রবল বৈরী বাস্তবতাকে সামনে রেখে কোনো পক্ষের সাথে আপস না করেই আল মাহমুদ নিজের সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। তবে রাজনৈতিক পক্ষপাত ও বিরোধ-বৈরীতার বিতর্কে আল মাহমুদকে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয়েছে। এমনকি তার অসুস্থ্যতা ও মৃত্যুর পরও সেই বিতর্কের রেশ যথেষ্ট সক্রিয় দেখা গেছে। যেখানে একজন সাধারণ মাপের শিল্পী-সাহিত্যিকের মৃত্যু হলেও দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রীসহ প্রধান প্রধান রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে শোক জানাতে দেখা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে অসুস্থ শিল্পী-সাহিত্যিকদের চিকিৎসার ব্যয় বহনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদারনৈতিক অবস্থান দেখা গেলেও আল মাহমুদের মত বিরল, অদ্বিতীয় কবি প্রতিভার অসুস্থতা বা মৃত্যুর পর সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সাঁড়া বা উদ্যোগ না থাকায় আল মাহমুদের ভক্তদের হতাশ ও ক্ষুব্ধ করেছে। মৃত্যুর পর শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন বা ঢাকায় শহীদ বৃদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফন করতে বিড়ম্বনা বা অনুমতি না পাওয়ার সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর সেই ক্ষোভের বহি:প্রকাশ দেখা গেছে।
আল মাহমুদ কবিতায় স্বপ্ন বুনেছেন, দিন বদলের স্বপ্ন নিয়ে শুধু কলমই ধারণ করেননি। দেশ ও সময়ের প্রয়োজনে অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। দেশে দেশে সব বড় কবি-সাহিত্যিকের জীবনে এমন যুদ্ধযাত্রার ইতিহাস দেখা যায়। ঔপনিবেশিক শাসনের নিগড় থেকে মুক্তির জন্য কবি নজরুল ইসলাম কলম ও কবিতাকে হাতিয়ার বানিয়েছিলেন। সেই নজরুলও সময়ের প্রয়োজনে প্রথম মহাযুদ্ধের ডামাঢোলে শামিল হয়ে বাঙ্গালী পল্টনে যোগ দিয়েছিলেন। একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবজনক অধ্যায়। জাতির মুক্তির সংগ্রামে কবি আল মাহমুদ সারা জীবন কলমকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ধারণ করলেও মুক্তিযুদ্ধের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে নি:শব্দে গৃহত্যাগ করে ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ব্যক্তি আল মাহমুদ তার কমিটমেন্টের পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। সেখানে তার বন্ধুদের অনেকে শুধু পলায়ণপর মনোবৃত্তি গ্রহণই করেন নি, লাখো প্রাণের বিনিময়ে চুড়ান্ত বিজয়ের আগ পর্যন্ত কেউ কেউ অখন্ড পাকিস্তানের পক্ষেই নিজের অবস্থান নিশ্চিত করেছেন। পরবর্তিতে তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক-বাহকই শুধু নয়, যেন চেতনার সার্টিফিকেট বিতরণের সোল এজেন্সি নিয়ে বসেছিলেন। আল মাহমুদ এক সময় বাম রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আমাদের জাতীয় কবি নজরুলের মধ্যেও সাম্যবাদী চিন্তা-চেতনার যোগসুত্র সুস্পষ্ট। মেকি আধুনিকতা ও বিভ্রান্ত যৌবনের নানা অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়ে সৃষ্টিশীল জীবনের শেষ ধাপে এসে মহান কবি-সাহিত্যিকদের কেউ কেউ নিজের বিশ্বাসের কষ্টিপাথরে সত্যের ঘোষণা প্রকাশ করেছেন। কবি আল মাহমুদ তাদেরই একজন। এর জন্য তাকে অনেক অপবাদ গঞ্জনা, অবহেলা ও বৈরীতার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তার এক সময়ের সতীর্থ কবি-সাহিত্যিকরাই তাকে মৌলবাদী আখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজনের সুযোগে একপক্ষের বৈরীতার বিপরীতে আরেক পক্ষ নিজেদের পক্ষের লোক বলে সিলমোহর মারার চেষ্টা করেছে। তবে আল মাহমুদ শেষ পর্যন্ত একান্ত নিজের কক্ষপথেই পরিভ্রমন করেছেন। একজন কবি, যিনি নিজের কাল ও স্বদেশ চেতনাকে ধারণ করে এগিয়ে যেতে চান এবং ভাবিকালের কাছে নিজের কর্মের স্বাক্ষর রেখে যেতে চান, তাঁকে অবশ্যই বহুধা পথ অবলম্বন করতে হয়। তিনি মূলত কবি হিসেবে নিজের আত্মবিকাশের পথ সুগম করার জন্যই কৈশোরোত্তীর্ণ বয়েসে ব্রাহ্মনবাড়িয়ার সেই অজগ্রাম থেকে ঢাকায় পর্দাপণ করেছিলেন। সেন্ডেল পায়ে একটি টিনের বাক্স বগলদাবা করে ঢাকা শহরে পৌছানোর ইতিবৃত্ত তিনি তাঁর লেখায় দিয়েছেন। একজন সৃষ্টিশীল সামাজিক দায়বদ্ধ মানুষ হিসেবে তাঁর বক্তব্য তুলে ধরতে তিনি একাধারে কবিতা, ছড়া সাহিত্য, ছোটগল্প, উপন্যাস ও গদ্য সাহিত্যের আশ্রয় নিয়েছেন। সব ক্ষেত্রেই তাঁর সাফল্য ছাপিয়ে তিনি একজন মৌলিক কবি হিসেবেই বেঁচে থাকবেন। বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলন, একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধসহ এ জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতার সুদীর্ঘ সংগ্রামের সক্রিয় যোদ্ধা হিসেবে আল মাহমুদের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। তবে গত চার দশক ধরে দেশে যে ক্রমবর্ধনশীল বিভাজনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা চলছে, আল মাহমুদ এর নির্মম শিকার ছিলেন। গত বছর প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দাড়ি রেখেছি বলে মৌলবাদী হয়ে গেছি’। যিনি কৌশর বয়েসে ভাষা আন্দোলনের লিফলেটে কবিতা ছাপার কারণে পাকিস্তানী শাসকের চক্ষুশূল হয়েছিলেন, একাত্তুরে অস্ত্রহাতে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের কবিতা, গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন, প্রথম যৌবনে বামপন্থী রাজনৈতিক ভাবধারায় উজ্জীবিত ছিলেন, পরিনত বয়েসে এসে ইসলামি ভাবধারায় আল মাহমুদের আত্মনিবেদনের চিরায়ত প্রবণতাকে যারা মেনে নিতে পারেনি, তাদের পরিচয়, প্রবণতা ও সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ রয়েছে। বিশেষত: জামায়াত শিবিরের অনুষ্ঠানাদিতে তার উপস্থিতি প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে আল মাহমুদ আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমি সব সভা-সেমিনারেই যাওয়ার চেষ্টা করি। যেমন সমাজতন্ত্রের সেমিনারেও যাই. তেমনি জামায়াত-শিবিরের সেমিনারেও যাই। আর জামায়াত- শিবিরের সভাতে যাই বলে আমাকে রাজাকার বলা হয়, কিন্তু ওদের সভা-সেমিনারে গিয়ে আমি কী বলি সেটা শোনার জন্য কেউই যায় না। এখন মনে হয়, দেশের জন্য যুদ্ধ করে রাজাকার উপাধিটাই আমার প্রাপ্য।’ সাংবাদিক বিধান রিবেরুকে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বলেন, প্রগতিশীল লেখকদের মধ্যে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি,তারা পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে পুরস্কার নিয়েছেন, শেখ মুজিবের ৬ দফা সমর্থন করেননি, তাদের বেশীরভাগই শেখ মুজিবুর রহমানের সমালোচনা করতেন, তারাই এখন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বড় বড় কথা বলছেন।
সব ধর্ম-বর্ণ ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সম্মিলন ও সহাবস্থানই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সৌন্দর্য। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ও চেতনায় এই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আকাঙ্খা ছিল সবচেয়ে অগ্রগণ্য। সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে পরস্পর বৈরী ও বিভাজিত মানুষ নিয়ে কোনো জাতিরাষ্ট্র মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। যারা রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কারণে আল মাহমুদের মত কবিকে সামাজিকভাবে কোণঠাসা করতে চেয়েছেন, তাঁকে অস্বীকৃতি জানাতে ও রাজাকার বলে গালি দিতেও কুণ্ঠিত হননি, তারা আসলে কারা? নিশ্চয়ই বহুমত ও পথের সহাবস্থানমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তাদের প্রত্যাশা নয়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে কবি আল মাহমুদ সকলের কাছে পৌঁছতে চেয়েছেন। শেঁকড়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করা ও শক্তি সঞ্চয়ের মধ্য দিয়ে মাথা তুলে দাঁড়ানোর প্রেরণা মানুষ বড় কবি-লেখকদের কাছ থেকেই পেয়ে থাকে। ষাটের দশকের শেষদিকে প্রকাশিত কালের কলস কাব্যগ্রন্থে আল মাহমুদ প্রশ্ন রেখেছেন, ‘কতদূর এগুলো মানুষ!/ কিন্তু আমি ঘোর লাগা বর্ষণের মাঝে/ আজও উবু হয়ে আছি। ক্ষীরের মত গাঢ় মাটির নরমে / কোমল ধানের চারা রুয়ে দিতে গিয়ে ভাবলাম,/ এ মৃত্তিকা প্রিয়তমা কিষাণী আমার।’ এমন কাব্যভাষা মাটি ও মানুষের এক নিবিড় আত্মিক সম্পর্কের যোগসুত্র যে কবির লেখায় উঠে এসে কালোত্তীর্ণ হয়, সে কবিকে কোনো ক্ষীণ রাজনীতির বিভাজনে বিভাজিত ও গন্ডিবদ্ধ করে রাখা অসম্ভব। কতদূর এগুলো মানুষ? এই প্রশ্ন আজ গোটা মানব সভ্যতার। আমরা আসলে এগিয়ে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করে করে কেবল পিছিয়ে পড়ছি। যখন অলীক-বিভাজনের দেয়াল তুলে মুক্তি সংগ্রামীদের কোনঠাসা করে রাখা হয়, যখন মনুষত্বের পরিচয় অগ্রাহ্য করে একজন সৃষ্টিশীল মানুষকে রাজনৈতিক ভিলেনে পরিনত করা হয়, তখন জাতি এগুতে পারে না। মানবতা ও প্রগতিশীলতা মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়। আমাদের চলমান সমাজবাস্তবতা যেন সেই মুখ থুবড়ে পড়া সমাজেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। কবি জীবনান্দ দাস লিখেছিলেন, ‘যারা অন্ধ, সবচেয়ে বেশী আজ চোখে দ্যাখে তারা’। আর ভাষা সংগ্রামী-মুক্তিযোদ্ধা কবি আল মাহমুদকে তাদের কাছ থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীলতা ছবক ও গঞ্জনা শুনতে হয়েছে, যারা নাকি সুযোগ থাকা সত্বেও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি। তাদের অনেকে মুক্তিযুদ্ধের পর কবিতা লিখে, প্রগতিশীল রাজনৈতিক ভাবধারা ও ইসলাম বিদ্বেষী ভূমিকা নিয়ে আল মাহমুদের মত কবিকে মৌলবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল আখ্যা দিয়ে কোণঠাসা করার চেষ্টা করেছেন। ঠুনকো রাজনৈতিক বিভেদ ও ধর্মীয় ভাবাদর্শ পুঁজি করে স্বাধীনতার পর দেশের প্রগতিশীল লেখক-সাহিত্যিকদের বিভাজিত অবস্থান ও পারস্পরিক রেশারেশি জাতিকে কিছুই দিতে পারেনি। অথচ তাদের ঐক্য জাতীয় ঐক্যের ভিত্তি নিমার্ন করতে পারত। দেশে একশ্রেনীর রাজনৈতিক নেতা বলেন, সেক্যুলারিজম মানে ইসলাম বিদ্বেষ নয়, সব ধর্মের সমান সুযোগ নিশ্চিত করা। অথচ ইসলামের প্রতি আস্থা ও প্রাক্টিসিং মুসলমান হওয়ার কারণে, অথবা জামায়াত-বিএনপি’র রাজনীতির প্রতি অসুয়া প্রদর্শন না করার কারণে আল মাহমুদকে গালাগাল, নাজেহাল করা হয়েছে। ‘কতদূর এগুলো মানুষ’ কবিতায় এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়ার অর্ধশত বছর পর কবি আল মাহমুদ লোকান্তরিত হলেন। এই অর্ধ শতাব্দীতে দেশ, সমাজ ও সভ্যতা এগিয়েছে নাকি পিছিয়েছে এই বিতর্ক যথেষ্ট সক্রিয় রয়েছে।
পশ্চিমা পুঁজিবাদি অর্থনীতি দ্বারা নতুন বিশ্বব্যবস্থা চলছে মাৎস্যন্যায় পন্থায়। বড় মাছ যেমন ছোট মাছকে গিলে খায়, তেমনি ছোট অর্থনীতি ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোকে বড় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শক্তিগুলো গিলে খেতে চাইছে। এভাবেই গত শতাব্দীতে বহু ভাষা ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠির বিলুপ্তি ঘটেছে। বায়ান্ন সালে তরুন প্রজন্ম মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় এবং একাত্তুরে রাজনৈতিক স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের উদাহরণ সৃষ্টি করেও আমরা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে আত্মরক্ষা করতে পারছি না। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের লক্ষ্য হচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজকে অধীনস্থ করা। তিরিশের দশকে ইতালীয় কবি ও মার্ক্সবাদি দার্শনিক অ্যান্তোনিও গ্রামসি পুঁজিবাদী রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক আগ্রাসনের এই প্রবণতাকে কালচারাল হেজিমনি বলে সংজ্ঞায়িত করেছেন। সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার কথা বলতে গিয়ে মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদী সরকারের বাহিনীর হাতে বন্দি গ্রামসি জেলখানায় বসেই তার শ্রেষ্ঠ লেখাগুলো লিখেছিলেন। আমাদের পঞ্চাশের কবিদের অনেকেই মার্ক্সবাদী-মাওবাদী বাম রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশেষত: চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল রাজনৈতিক হাওয়া কবিতা ও শিল্প-সাহিত্যে লেগেছিল। তিতাস পাড়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করেই আমাদের তরুন কবি আল মাহমুদ তখন সেই নতুন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারাকে আবাহন করেছিলেন। কাব্য সাহিত্যে দুই বাংলায় সমান মর্যাদার আসন নিয়ে বেড়ে ওঠা আল মাহমুদ যখন আত্মজাগরণের মত করে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মীয় সংস্কৃতিকে কবিতা ও জীবন চলার উপজীব্য হিসেবে ঘোষণা করলেন তখনই একশ্রেণীর মানুষ তাঁকে অপাঙতেয় করে তুলতে উঠে পড়ে লাগল। এই প্রয়াস তাঁর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অপরাজনৈতিক হীনমন্যতার নোংরামীর পাশপাশি অগণিত ভক্ত-পাঠক ও গুণগ্রাহীর মধ্যে দুই বাংলার খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদদের কবি হিসেবে আল মাহমুদের ইতিবাচক গুরুত্ব তুলে ধরতে দেখা গেছে। এ থেকে আবারো প্রমাণিত হল, কবিদের কালোত্তীর্ণ সৃষ্টিই তাঁকে জনসাধারণ্যে ও বোদ্ধা শ্রেনীর মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে। কোনো রাজনৈতিক বৈরীতায় কাউকে দাবিয়ে রাখা বা রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে কোনো লেখক সাহিত্যিককে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা ফলপ্রসু হয় না। আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীল লেখক-সাহিত্যিকদের অনেকে যখন রাজনৈতিক বিবেচনায় আল মাহমুদকে মৌলবাদী, জামায়াতপন্থী আখ্যায়িত করে খারিজ করে দিতে চেয়েছেন, তখন পশ্চিমবঙ্গের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বা জয়গোস্বামীর মত বিখ্যাত লেখক-সাহিত্যিক আল মাহমুদকে উচ্চ মর্যাদা দিতে কুণ্ঠিত হননি। সুনীল বাবু বলেছিলেন, বাংলাদেশে দেড়খান কবি, একখান আল মাহমুদ আর আধখানা গুণ(নির্মলেন্দু গুণ)। আল মাহমুদের মৃত্যুর পর কলকাতার গণমাধ্যমে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় কবি জয় গোস্বামী বলেছেন, কবি আল মাহমুদের সাথে সাক্ষাতের ঘটনা তার কাছে তীর্থ দর্শনের মত। জয় গোস্বামী ও তার মেয়ের প্রিয় কবি আল মাহমুদ। প্রকৃত কবিরা কোনো নির্দিষ্ট কালের গন্ডিতে আবদ্ধ থাকেন না। তাঁদের কলমে সব প্রজন্ম, সব ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠির আকাঙ্খার উচ্চারণ মূর্ত হয়ে উঠে। লোক-লোকান্তরের কবি, কালের কলস, সোনালী কাবিনের কবি, উপমহাদেশের লেখক আল মাহমুদ বলতেন, দেশকালের উর্ধ্বে উঠেও কবির একটি দেশ থাকতে হয়। তথাকথিত সেক্যুলারিজমের ভন্ডামি ত্যাগ করে তিনি নিজের ধর্মবিশ্বাস এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে নিজের লেখায় আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন বলেই তিনি গণমানুষের প্রিয় কবি। লোকান্তরিত কবি আল মাহমুদের লেখাগুলো যতদিন যতবেশী পঠিত হতে থাকবে, তিনি ততই সমাদৃত ও অভিনন্দিত হতে থাকবেন। আমরা তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।

 



 

Show all comments
  • মামুন ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১:২৮ পিএম says : 0
    আপনার কলাম বরাবর ই ভাল লাগে,আজও অনেক ভাল লাগলো।
    Total Reply(0) Reply

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন