Inqilab Logo

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯, ০৮ চৈত্র ১৪২৫, ১৪ রজব ১৪৪০ হিজরী।

মাদকের মূল হোতাদের রেহাই দেয়া যাবে না

কামরুল হাসান দর্পণ | প্রকাশের সময় : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৬ এএম

আমরা কথায় কথায় তরুণ সমাজকে দেশের ভবিষ্যত কাণ্ডারি বলি। আগামীতে তারাই দেশকে নেতৃত্ব দেবে, এগিয়ে নেবে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কোন তরুণ সমাজকে দেশের ভবিষ্যত বলব? যারা মাদকের কড়াল গ্রাসে দিন দিন ক্ষয়ে যাচ্ছে, ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তাদের? যদি তাই হয়, তবে দেশের সামনে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই। গত কয়েক দিন ধরে পত্র-পত্রিকায় দেখা গেছে যারা মাদক সম্রাট হিসেবে পরিচিত, তাদের মধ্যে শতাধিক আত্মসমর্পণ করেছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের মঞ্চে প্রথমে আসেন ইয়াবার গডফাদার বলে পরিচিত সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির ছোট ভাই। এরপর আসেন তার আরও তিন ভাই, ফুফাতো, মামাতো, চাচাতো ভাই-ভাগনেসহ ১২ জন। ফটো সাংবাদিকরা তাদের ছবি তুলতে গেলে একজন হুমকি দিয়ে বলেন, আত্মসমর্পনের পর তোদের মজা দেখাব। ইয়াবা ব্যবসায়ীর হাত অনেক লম্বা। বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের একজন সাবেক সংসদ সদস্যের পরিবারের এক ডজন সদস্য ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। যে দেশে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকে, সে দেশের তরুণ সমাজ ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হবে, এমন ভাবা বাতুলতা ছাড়া কিছুই নয়। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, যেসব ইয়াবা গডফাদার আত্মসমর্পণ করেছে, তারা কোনো না কোনোভাবে জেল থেকে বের হয়ে আসবে এবং পুনরায় সদর্পে মাদক ব্যবসা করবে। এই আত্মসমর্পণকে যদি বলা হয়, তাদেরকে ‘দায়মুক্তি’ দেয়া হয়েছে তবে বেশি বলা হবে না। নিশ্চিতভাবেই ধরে নেয়া যায়, মাদক ব্যবসায় তাদের পুনরায় আবির্ভাব ঘটবে। তখন কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে? সরকারই বা কী করবে? অবশ্য সর্ষের মধ্যে ভূত বসবাস করলে, কোনো কালেই ভূত তাড়ানো যায় না। তাই দেশের ভবিষ্যত তরুণ সমাজের সামনে মাদকের নীল ছোঁবলের হাতছানি ছাড়া কিছুই নেই। দেশে তরুণ ও যুবসমাজে মাদক কী হারে ছড়িয়েছে, একটি পরিসংখ্যান দেখলেই তা বোঝা যাবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের এক গড় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যুবকরা বেশি মাদকাসক্ত হচ্ছে। মাদকসেবীদের শতকরা ৬০.৭৮ ভাগই এসএসসি পাস করা। ২০ থেকে ৪০ বছরের মাদকসেবীর সংখ্যা শতকরা ৮১.৩৭ ভাগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকের কারণে তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আপনার, আমার, সবার সন্তানই অনিরাপদ। এ থেকেই বোঝা যায় দেশের তরুণ প্রজন্মের গন্তব্য কোন দিকে। এ বুঝটা কি দেশের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন না?
দুই.
বর্তমান সরকারের বিগত আমলে বেশ কয়েকজন এমপি ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠে। কক্সবাজারের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি এবং তার পরিবার সংশ্লিষ্ট লোকজন ইয়াবার চোরাচালানের সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি ওপেন সিক্রেট এবং তার আত্মীয় স্বজনদের আত্মসমর্পনের মধ্য দিয়ে তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যশোরের একজন এমপি’র প্রতিষ্ঠান থেকে এনার্জি ড্রিংকের নামে অবৈধভাবে বিয়ার উৎপাদন করার কথাও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। মাদকের মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি বিস্তার ঘটেছে ইয়াবার। বলা হয়, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত দেশের সর্বত্র মহামারী রূপে ছড়িয়ে পড়েছে নীরব এই ঘাতক। ইয়াবার সর্বনাশা থাবায় লাখো পরিবারের সন্তানের জীবন এখন বিপন্ন। এমন সন্তানদের অভিভাবকদের কান্না এখন ঘরে ঘরে। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গোচরেই ইয়াবার প্রসার ঘটছে। একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, এমপি, রাজনৈতিক নেতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্যর সমন্বয়ে গঠিত শক্তিশালী সিন্ডিকেট ইয়াবা ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। এদের কারণে কোনোভাবেই এই আগ্রাসন ঠেকানো যাচ্ছে না। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার নতুন কিছু না হলেও উল্লেখিত প্রতিবেদনে এই বিস্তারের ভয়াবহতা এবং এর প্রভাব দেখে মেক্সিকোর কথা মনে পড়ে গেল। মেক্সিকোতে মাদক চোরাকারবারি সিন্ডিকেট এতটা শক্তিশালী যে, তাদের দমন করতে সরকারকে রীতিমতো ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনী নামাতে হয়েছে। মাদক সিন্ডিকেট কবলিত এলাকা মুক্ত করতে ২০০৬ সাল থেকে সেনাবাহিনী এই যুদ্ধ চালিয়ে আসছে। ২০০৬ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ১ লাখ ২০ হাজারের বেশি লোক নিহত এবং ২৭ হাজার লোক নিখোঁজ হয়েছে। আমাদের দেশে টেকনাফ এলাকাটি এখন ইয়াবা ও মাদকের নিরাপদ রুট হিসেবে আলাদাভাবে চিহ্নিত হয়েছে। টেকনাফের ১১টি পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবা ঢুকছে। বাংলাদেশে ইয়াবা চোরাচালানের জন্য মিয়ানমার ৩৭টি কারখানা খুলেছে। শুধু মিয়ানমার থেকে চোরাচালানের মাধ্যমেই নয়, দেশেও ইয়াবা তৈরির কারখানা গড়ে ওঠার সংবাদ প্রত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। একটি দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মিয়ানমার থেকে আসা ইয়াবার ব্যবহার ৬ বছরে বেড়েছে ৪৫ হাজার শতাংশ। এই মাদক উদ্ধার বেড়েছে ৪৬ গুণেরও বেশি। এ চিত্র উদ্বেগ, উৎকণ্ঠার। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, সর্বনাশা মাদক ইয়াবা কিভাবে যুবসমাজকে গ্রাস করে চলেছে এবং ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, যদি এখন থেকেই মাদক ও মাদক সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং নির্মূলের উদ্যোগ না নেয়া হয়, তবে একটা সময় যদি মেলিমহকোর মতো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, তবে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে যেভাবে মাদকের বিস্তার লাভ করছে, এ অবস্থা চলতে থাকলে পারিবারিক ও সামাজিক শৃঙ্খলা বলে কিছু থাকবে না। ইতোমধ্যে এর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্যণীয় হয়ে উঠেছে। মাদকাসক্তদের কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি লেগে আছে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। এমনকি খুনোখুনির ঘটনাও ঘটছে। মাদকাসক্ত সন্তানের কারণে পিতা-মাতার আহাজারি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে মাদকাসক্তরা চুরি, ছিনতাই, রাহাজানির পথ বেছে নিচ্ছে। আবার মাদক চোরাকারবারিদের মধ্যে মাদকের বাজার দখল ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে খুন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা অনেকটা নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাদক চোরকারবারি ও মাদকের প্রসারের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর একশ্রেণীর সদস্যর জড়িয়ে পড়ার খবরও আমরা জানি। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে রাজধানীজুড়ে ৪৯টি স্পটে মাদকের হাট বসার খবর ইতোমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আর মাদক চোরাচালানের সাথে কতিপয় রাজনৈতিক নেতা, এমপি ও প্রভাবশালীর জড়িত থাকার বিষয়টি এখন সবারই জানা ।
তিন.
সব ধরনের অপকর্মের অন্যতম উৎস মাদক। মাদকের নেশা মানুষকে ন্যায়-নীতির পথ থেকে বিচ্যুত করে। পরিবার ও সমাজে যে অশান্তির বীজ বপিত হয়, তার মূলে গেলে দেখা যাবে, সেখানে মাদক ও মাদকাসক্তের ভূমিকা রয়েছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে পারিবারিক শৃঙ্খলা ভেঙ্গে যাওয়া, যুবসমাজের বিপথগামী হওয়ার পেছনে মূল কারণ হয়ে রয়েছে মাদক। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাজ্যে পারিবারিক প্রথা আশঙ্কাজনক হারে ভেঙ্গে যাওয়া এবং অধিক হারে যুবসমাজের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার কারণ হিসেবে মাদককে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ নিয়ে সরকার প্রধানকে উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখা গেছে। মাদক থেকে যুবসমাজকে রক্ষা করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে মুসলমানসহ বিভিন্ন ধর্মবিশেষজ্ঞদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। পার্শ্ববর্তী ভারতও বহুসংকটে নিমজ্জিত হয়ে নৈতিকভাবে একটি দুর্বল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেখানে সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। নারীরা নির্যাতিত হচ্ছে, অপরাধ বাড়ছে। এসব সংকটের মধ্যে মাদক ও মাাদকাসক্তি অন্যতম কারণ হয়ে রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কয়েক বছর আগে দেশের যুবসমাজকে মাদকের হাত থেকে রক্ষার জন্য মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। ক্ষমতায় আসার পর তিনি রেডিও এবং টেলিভিশনে ‘মন কি বাত’ বা মনের কথা নামে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের ছাত্র-ছাত্রী ও তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা শুরু করেন। এই ধারাবাহিকতায় তিনি মাদকের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজকে সচেতন হওয়ার জন্য আহ্বান জানান। তরুণদের সামনে মাদককে তিনি ‘থ্রি ডি’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। এই থ্রি ডি হচ্ছে ডার্কনেস বা অন্ধকার, ড্রেসট্রাকশন বা ধ্বংস এবং ডেভাস্টেশন বা বিপর্যয়। মাদকাসক্তির সমস্যায় আক্রান্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকারের কথা ব্যক্ত করে তখন মোদি বলেন, দেশের মাদকাসক্ত যুব সম্প্রদায়ের জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে ২৪ ঘন্টার একটি হেল্প লাইন চালু করা হবে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, যাদের জীবনে কোনো লক্ষ্য থাকে না, তাদেরই মাদক আকর্ষণ করে। যুব সম্প্রদায়কে লক্ষ্যস্থির করে এগোতে হবে, ঠিক যেভাবে খেলোয়াড়রা এগোয়। মোদির এ আহ্বান তরুণদের মন ছুঁয়ে যায়। তারা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ে। তার সাথে কথা বলার সময় তরুণ-তরুণীরা শপথ করে তারা কখনো মাদক স্পর্শ করবে না এবং মাদকাসক্তকে মাদকমুক্ত করতে ও মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করবে। রাষ্ট্রের অভিভাবক যখন তরুণদের সাথে আন্তরিকতা ও মমতা নিয়ে কথা বলেন, তখন তা কতটা ত্বরিৎ কাজ করে, মোদির এ উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়। কোনো রাষ্ট্রনায়ক এভাবে তরুণদের সাথে কথা বললে মাদকের প্রতি তরুণদের আকর্ষণের পরিবর্তে ঘৃণা জন্মানোই স্বাভাবিক। এতে শুধু তরুণ সমাজ মাদকমুক্তই হয় না, মাদক চোরাচালান ও চোরাকারবারি নির্মূলের বিষয়টিও সহজ হয়ে যায়। মূল কথা হচ্ছে, মাদক ও এর বিস্তার রোধে রাষ্ট্রের মূল অভিভাবককেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হয়। মাদকাসক্ত ও তরুণ সমাজকে উদ্দীপ্ত করে তুলতে এবং লক্ষ্য স্থিরে রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা পালন করতে হয়। দুঃখের বিষয়, মাদকের ছোবলে ক্ষয়ে যাওয়া আমাদের তরুণদের মাদকের হাত থেকে বাঁচাতে এবং নিরাসক্ত করতে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের ভয়াবহতা এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নে জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। দুঃখের বিষয়, এমন কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বরং কোনো কোনো রাজনৈতিক নেতা, এমপিকে মাদক চোরাচালানের সাথে জড়িত থাকার কথা আমাদের দেখতে হয়, শুনতে হয়। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় আর কি হতে পারে! আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে প্রায়ই টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তিনি যদি মাদক নির্মূলে এবং মাদকাসক্তি থেকে বিরত থাকতে তরুণদের সাথে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলতেন, তবে তরুণরা যেমন উদ্দীপ্ত হতো, তেমনি মাদকের যে ব্যাপকতা, তা অনেকটাই কমে যেত। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া এখন সময়ে দাবীতে পরিণত হয়েছে।
চার.
কয়েক মাস আগে মাদক চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দেশজুড়ে অভিযান শুরু করে। বন্ধুকযুদ্ধে অনেকে মারাও পড়ে। এ নিয়ে সমালোচনাও হয়। অভিযোগ উঠে, মাদকের মূল হোতাদের পরিবর্তে এর বহনকারী এবং খুচরা বিক্রেতারা এতে মারা পড়ছে। মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। এখন তাদের আত্মসমর্পনের মাধ্যমে এক ধরনের দায়মুক্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে যে ভবিষ্যতে কোনো কাজ হবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। বরং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই শ্রেয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকের মূল উৎস এবং এর সাথে কারা জড়িত, তাদের ধরতে হবে। তা নাহলে ভাসমান মাদক ব্যবসায়ী বা বহনকারীদের হত্যা করে কোনো লাভ হবে না। এক্ষেত্রে মূল হোতারা যত প্রভাবশালী হোক বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। কোনো ধরনের অনুকম্পা নয়। সরকার জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি দমনে যেভাবে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে, ঠিক একইভাবে যদি মাদক ও মাদক চোরাকারবারি দমনে জিরো টলারেন্স দেখায়, তবে দেশ থেকে মাদক নির্মূল করা অসম্ভব কাজ নয়। দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এবং দেশের ভবিষ্যত যাদের উপর নির্ভর করছে, সেই যুবসমাজকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে এ ধরনের পদক্ষেপের বিকল্প নেই। প্রয়োজনে মাদক নির্মূলে বিশেষ বাহিনী গঠন করতে হবে। যাদের কাজ হবে মাদক চোরাচালান ও চোরাকারবারিদের নির্মূলে বিশেষ কৌশল অবলম্বন করা। মাদক চোরাচালানের সাথে যে দলের এবং যত প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকুক না কেন, তাদেরকে ছাড় দেয়া যাবে না। এ ধরনের উদ্যোগ নিলে দেশের কোটি কোটি তরুণকে ভয়াবহ বিপর্যয়, ধ্বংস ও অন্ধকারের দিকে ধাবিত হওয়া থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। মাদকের বিস্তার যে ভয়াবহ রূপ লাভ করেছে, তাতে মাদককে এখন ‘মূল সমস্যা’ হিসেবে ঘোষণা করা অপরিহার্য। মাদক ও মাদকচক্র নির্মূল করার ক্ষেত্রে মাদক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক সংগঠন এবং সমাজের অভিভাবক শ্রেণীকে এগিয়ে আসতে হবে। মাদকের হাত থেকে ছেলেমেয়েদের রক্ষা করতে মা-বাবাদের অনেক বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। ছোটবেলা থেকেই তাদের শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। সাধারণত প্যারেন্টিং গাইডেন্সের মাধ্যমে ৫ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানকে আদরে-ভালোবাসায় রাখতে হয়। ১০ বছর বয়স থেকে শৃঙ্খলাপরায়ণতার ওপর জোর দিতে হয়। আর ১৬ বছর হয়ে গেলে তাদের সাথে বন্ধুর মতো মিশতে হয়। এই বয়ঃসন্ধির সময়েই তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। তারা কোথায় যায়, কাদের সাথে মেশে, এ ব্যাপারে সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখা অত্যাবশ্যক। সন্তানের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি না করে তাদের ভালো লাগা ও সমস্যা নিয়ে কথা বলতে হবে। তাদের লক্ষ্য স্থির রাখতে উৎসাহ ও অনুপ্রাণিত করতে হবে। সন্তানদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, অনুশাসন ও চিন্তা-চেতনার বিকাশে মনোযোগী হতে হবে। অভিভাবকরা সন্তানের প্রতি এ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে তাদেরকে হতাশা যেমন গ্রাস করবে না, তেমনি হাতাশা বা ফ্যান্টাসির কারণে মাদক স্পর্শ করবে না। যুবসমাজকেও বুঝতে হবে মাদক জীবনরক্ষা করে না, জীবন ক্ষয় করে, ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এটা এক ধরনের আত্মহত্যার শামিল।
darpan.journalist @gmail.com



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন