Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯, ০৩ ভাদ্র ১৪২৬, ১৬ যিলহজ ১৪৪০ হিজরী।

আবাসিক অনিশ্চয়তায় ঢাবির নবীন শিক্ষার্থীরা

নুর হোসেন ইমন : | প্রকাশের সময় : ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ২:২৩ এএম

বিস্তৃত ক্যাম্পাস, সুপরিকল্পিত ও উন্নত আবাসন ব্যবস্থা নিয়ে ১৯২১ সালে যাত্রা শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শতভাগ আবাসন সুবিধা ও উন্নত ব্যবস্থাপনার কারণে সে সময়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাতি লাভ করলেও শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে এসে প্রতিষ্ঠানটি মারাত্মক আবাসিক সংকটের সম্মুখিন হয়েছে। ৮৭৭ শিক্ষার্থী নিয়ে পথচলা শুরু হলেও বর্তমানে তা ৩৮ হাজার ছাড়িয়েছে। শিক্ষার্থী বৃদ্ধির সাথে সাথে বিভিন্ন সময় নতুন হল ও ভবন নির্মাণ করা হলেও তা শিক্ষার্থী অনুপাতে অপ্রতুল। বর্তমানে আবাসিক হলে অর্ধেক শিক্ষার্থীরও থাকার ব্যবস্থা নেই। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে ১ম বর্ষ স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে ৭ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী। ছাত্র হলে সাধারণত ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের বৈধভাবে সিট দেয়া হয়না। যার ফলে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যেতে সরকারদলীয় ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে হলে উঠেন তারা। এ সিট সমস্যাকে কেন্দ্র করেই হলগুলোতে তৈরী হয়েছে গণরুম ও গেস্টরুমের সংস্কৃতি।
বিশ^বিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ভর্তি অফিসের তথ্যমতে, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন ইউনিটে ১ম বর্ষ স্নাতক শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে ৭ হাজার ১২৮ জন শিক্ষার্থী। ১৩টি অনুষদ, ৮২টি বিভাগ ও ৯টি ইনস্টিটিউটে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৩৮ হাজার । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ায় প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে কোন না কোন আবাসিক হলের সাথে সংযুক্ত থাকতে হয়। প্রশাসনিক ভবন সূত্রে জানা যায়, শিক্ষার্থী অনুপাতে সিট সংখ্যা কম থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলের প্রভোস্টদের সমন্বয়ে গঠিত ‘প্রভোস্ট কমিটি’ ২০০৩ সালের এক বৈঠকে ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের হলে সিট না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সভায় এ সিদ্ধান্তের অনুমোদন দেয়া হয়। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ি ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীরা হলে অনাবাসিক কার্ড পায়, আর ২য় ও ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের দেয়া হয় দ্বৈতাবাসিক কার্ড। তবে বিভিন্ন সময় নতুন হল নির্মাণের পর ও ছাত্রী হলগুলোতে বিশেষ বিবেচনায় ১ম বর্ষেও আবাসিক কার্ড পাওয়ার নজির আছে।
দেশের সবচেয়ে প্রাচীন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আসে গ্রামের মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর রাজধানী শহরে মেস বা বাসা বাড়া করে পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া তাদের অধিকাংশের পক্ষে সম্ভব হয়না। ফলে তাদের বাধ্য হয়ে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সাথে সংযোগের মাধ্যমে হলে উঠতে হয়। যার ফলে বিভিন্ন হলে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য সৃষ্টি হয়েছে গণরুম। এসব গণরুমে ঘিঞ্জি পরিবেশে ৪ জনের জায়গায় সারিবদ্ধভাবে ঘুমাতে হয় ১৫ থেকে ২০ জনকে। এসব রুমে পড়ার জন্য নেই কোন টেবিলের ব্যবস্থা। ফলে প্রথম বর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের থাকার একটু ভালো জায়গা করে নেয়াই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাড়ায়।
বিশ^বিদ্যালয় আবাসন সংকট নিরসনে গতবছরের ১ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ছাত্রীর থাকার ব্যবস্থা নিয়ে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে রোকেয়া হলে ৭ই মার্চ নামে একটি নতুন ভবন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিভিন্ন হলের তথ্য অনুযায়ি, বর্তমানে আবাসিক হল ও হোস্টেলগুলোতে মোট ১৪ হাজার ৩শ ১৩টি আসন রয়েছে। বিভিন্ন হলে সরকারী ছাত্র সংগঠনের ছত্রছায়ায় অছাত্র ও বহিরাগতরা এসব আসনের বড় একটি অংশ দখল করে রেখেছে। ফলে ক্যাম্পাসের বাইরে বিভিন্ন মেস বা বাসা বাড়ীতে থেকে ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে অর্ধেকের বেশি নিয়মিত শিক্ষার্থীকে। ক্যাম্পাস থেকে দূরে অবস্থান করা এসব শিক্ষার্থীকে প্রতিদিনই বিভিন্ন রকমের ভোগন্তিতে পড়তে হচ্ছে। এ সমস্যায় সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। আবাসন অসুবিধায় তাদের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে তৈরী হচ্ছে শঙ্কা। এমন পরিস্থিতীতে প্রথম বর্ষ থেকেই বৈধ সিট দেয়ার দাবি অভিভাবক ও বাম ছাত্র সংগঠনের নেতাদের। ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ফয়েজ উল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, গত ২৮ বছর ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন নেই। ফলে এ সময়ের মধ্যে প্রশাসন বিভিন্ন ধরণের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সিট না দেয়ার সিদ্ধান্তও এরকম অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত যা আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সিটের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তাই আমাদের দাবি থাকবে প্রশাসন যেন প্রথম বর্ষ থেকেই শিক্ষার্থীদের হলে বৈধ সিটের ব্যবস্থা করে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি প্রফেসর ড. মো. আখতারুজ্জামান প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের আবাসন অসুবিধা নিয়ে বলেন, প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর গ্রাম থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ঢাকায় থাকার মত কোন জায়গা থাকেনা। ফলে হল কর্তৃপক্ষ তাদের কয়েকটি রুমে (গণরুমে) থাকতে দেয়। শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিরসনে প্রভোস্টগণ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকেন। এ বিষয়ে তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে ডাকসু নির্বাচন হয়ে গেলে এসব সমস্যা কমে আসবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আবাসন সমস্যা নিরসনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষকে সামনে রেখে কয়েকটি প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে। রাজধানীর পূর্বাচলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের জন্য ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে ৫২ একর জমির বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করছেন কর্তৃপক্ষ। তবে শিক্ষার্থীদের দাবি সরকারী ছাত্র সংগঠনের ছত্র-ছায়ায় হলে অবস্থানরত বহিরাগত উচ্ছেদ, আবাসিক হলের সংখ্যা বৃদ্ধি ও আসনের সুষ্ঠু বন্টনের মাধ্যমে আবাসন সংকট থেকে নিস্তার পাওয়া সম্ভব। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. কে এম সাইফুল ইসলাম খান এ বিষয়ে বলেন, আমরা হলে ৬ মাস পর পর সিট বরাদ্ধের জন্য আবেদন আহবান করি। শিক্ষার্থীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আমরা সিনিয়রিটির মাধ্যমে সিট বরাদ্ধ দিয়ে থাকি। তবে দীর্ঘদিনযাবত ছেলেদের হলগুলোতে সিট বরাদ্ধের ক্ষেত্রে নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে বলে স্বীকার করেন তিনি। এবং ডাকসু নির্বাচনকে সামনে রেখে বিষয়গুলো এখন আবার ঘুছিয়ে আনা হচ্ছে বলেও জানান। জগন্নাথ হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. অসীম সরকার বলেন, আমরা হলে সিনিয়রিটির ভিত্তিতে সিট বন্টন করে থাকি। ৪র্থ বর্ষ থেকে আমরা শিক্ষার্থীদের সিঙ্গেল সিট দেয়ার চেষ্টা করি। তবে আমাদের হলে ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীরাও উঠছে। আমরা অনেক সময় সুযোগ হলে ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থীদের সাথে ২য় বা ১ম বর্ষের শিক্ষার্থীদের যৌথভাবে একটি সিট দিয়ে দেই।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ