Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার ১৬ জুন ২০১৯, ২ আষাঢ় ১৪২৬, ১২ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

দখল দূষণে মৃতপ্রায় নারদ

মো. আজিজুল হক টুকু : | প্রকাশের সময় : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

প্রকৃতির স্বাভাবিক জীবন যাত্রায় প্রাণ সঞ্চার করে নদী। ভাটির বাংলাদেশে জালের মত বিস্তার করে থাকা নদীগুলোর তীরে তীরে গড়ে উঠেছে অনেক সভ্যতা আর জনপদ। কিন্তু স্বার্থবাদী মানুষের লোভী থাবায় প্রাণ সঞ্চার করা নদীগুলো আজ মৃত প্রায়। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা মত নাটোরের নারদ নদও একসময় ছিল খরস্রোতা। চলত পালতোলা নৌকা আর ছোট ছোট স্টিমার। অথচ বর্তমানে কলকারখানার দূষিত বর্জ্য, দখল আর ভরাটের কারণে নারদ নদ বর্তমানে পরিণত হয়েছে সরু খালে।

অন্যদিকে নদটি খননের নামে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে। খননের মাটি পাড়ে ফেলে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে বহু অবৈধ স্থাপনা। এ অবস্থায় নাটোরবাসী এই নদ পুনরুদ্ধারের জন্য অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দূষিত বর্জ্য ফেলা বন্ধ করে তা সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে অনেক দিন ধরেই। নদ সংস্কারের জন্য অনেক বেসরকারি সংস্থা নদের পাড়ের মানুষদের নিয়ে উঠান বৈঠক-মানববন্ধনের মত অনেক সামাজিক আন্দোলন চালিয়ে আসলেও অজানা কারণে তা ফলপ্রসূতা পাচ্ছেনা। অন্যদিকে নাটোরের বড় বড় কয়েকটি শিল্প কারখানার দূষিত বর্জ্যের দুর্গন্ধে নদপাড়ের মানুষের জীবন অতিষ্ঠ। এছাড়া চারঘাট স্কুইসগেট দিয়ে পানি প্রবেশ করতে না পারায় নারদ নদ এখন একটি মরা খালে পরিণত।

নারদ নদ নিয়ে লেখা বইয়ের লেখক মাহবুব সিদ্দিকী বলেছেন, ঐতিহাসিক বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন যে, নারদ বাংলাদেশের প্রাচীনতম একটি নদ। নারদ নদের দু’তীরে অবস্থিত নাটোর শহর থেকে একসময় রাজশাহী অঞ্চলের শাসনকার্য নিয়ন্ত্রিত হতো। ১৮২১ সালে পদ্মা নদীতে বন্যায় ব্যাপক জলস্ফীতি হলে উৎসমুখে বালি ও পলি জমে নারদ স্রোতহীন হয়ে পড়ে। সেবারের বন্যায় দীর্ঘদিন নাটোর জলাবদ্ধ হয়ে থাকায় রাজশাহী অঞ্চলের সদর দফতর নাটোর থেকে রাজশাহীতে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ১৮২৫ সালে স্থানান্তর করা শেষ হয়। ১৮২১ সাল থেকেই নারদ নদের রাজশাহী অঞ্চলের প্রবাহটি মরা নদে পরিণত হতে শুরু করে। রাজশাহী জেলার চারঘাটে পদ্মা নদী থেকে বড়াল নদীর জন্ম হয় এবং বড়াল থেকে জন্ম হয় মুসাখাঁ নদীর। নাটোর সদর উপজেলার পাইকপাড়ায় মুসাখাঁ নদী থেকে নারদ আবার পদ্মার সঙ্গে যুক্ত হয়। ১৯৮৪ সালে চারঘাটে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি সুইসগেট তৈরি করার পর পরই নারদ মৃত নদে পরিণত হতে শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে পানি না থাকায় নদতীর ভরাট করে শুরু হয় দখল প্রক্রিয়া। গড়ে তোলা হয় স্থায়ী ও অস্থায়ী বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো। এতে কমতে থাকে নারদ নদের আয়তন। নাটোরের ৪৫ কি:মি: দৈর্ঘ্যের স্রোতস্বিনী নারদ নদ অবৈধ দখলদারদের কবলে পড়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড ও এলজিইডির তথ্য মতে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন সদর উপজেলার হাশিমপুর, সাধুপাড়া, মোহনপুর, পীরগঞ্জ ও কসবা গ্রামে নারদের ওপর ছোট ছোট বেশ কয়েকটি কালভার্ট রয়েছে। এখন কোনো কালভার্ট দিয়েই আর পানি চলাচল করতে পারছে না। সদর উপজেলার কাফুরিয়া ইউনিয়নের লোটাবাড়িয়া গ্রামে নারদের ওপর মাটি ফেলে রাস্তা তৈরি করেছেন স্থানীয় লোকজন। নারদে পানি ঢোকার পথে চারঘাটে সুইসগেটের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ৩৭টি প্রতিবন্ধক রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, নারদ নদ পুনঃখননের জন্য একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠনো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে নারদ নদে পানির প্রবাহ অব্যাহত রাখা সম্ভব।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শাহরিয়াজ জানান, নাটোর পৌর এলাকার ছয় কি:মি: মধ্যে অবৈধ দখলকারীদের তালিকা প্রস্তুত করতে পানি উন্নয়ন বোর্ড নাটোরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক একটি তালিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে। অল্পদিনের মধ্যে অবৈধ দখলদারদেরও উচ্ছেদ করা হবে।

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ