Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০, ২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, ২০ যিলহজ ১৪৪১ হিজরী

১৮টি পণ্যের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে পাল্টে যাবে বুড়িমারী বন্দর

প্রকাশের সময় : ২৮ জানুয়ারি, ২০১৬, ১২:০০ এএম

মো. আইয়ুব আলী বসুনিয়া, বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে ফিরে : বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হলে কমবে পণ্যের মূল্য। উন্নত হবে এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থার। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দরের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। রাজস্ব আদায়ে এ বন্দর যুগান্তকারী পদক্ষেপ রাখলেও হঠাৎ ১৮টি পণ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করায় অর্ধেকের বেশি কমে এসেছে রাজস্ব আদায়। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে জমজমাট হবে ব্যবসা বাণিজ্য। এ ধারণা ব্যবসায়ীদের।
জানা গেছে, পণ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা ও পণ্য আমদানির উপর ট্যাক্স বেশি করায় এ বন্দর ছাড়ছে ব্যবসায়ীরা। অনেকে গুটিয়েছে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে বন্দরে শেড ঘর সংকটসহ নানাবিদ সমস্যা। আমদানি করা পণ্য পড়ে থাকছে খোলা আকাশের নি”ে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে উত্তরের সীমান্তবর্তী অবহেলিত জেলা লালনিরহাটে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার ও এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নে ১৯৮৬ সালে বুড়িমারীতে গড়ে উঠে স্থলবন্দর। বন্দরটি গড়ে উঠার পর পাল্টে যায় লালমনিরহাটসহ উত্তরের ৪ জেলা। ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে পণ্য দ্রুত আমদানি-রপ্তানি ক্ষেত্রে সুযোগ-সুবিধা থাকায় প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর রাজস্ব আদায়ে সুনাম বয়ে আনে বন্দরটি। বন্দর গড়ে উঠার পর সরকার রাজস্ব ভালো পেলেও বন্দর নানা সমস্যায় জর্জরিত।
বন্দর প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবছর ৮০ কোটি থেকে ১শ’ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হলেও ১৮টি পণ্য আমদানি নিষেধাজ্ঞা থাকায় রাজস্ব কমে এসেছে অর্ধেকেরও কম। তার পরিবর্তে বছরে আয় হচ্ছে ৩০ কোটি টাকা। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করলে ফিরে আসবে পূর্বের রাজস্ব। ভারত-নেপাল ও ভুটার থেকে আমদানি করা পণ্য এনে খোলা আকাশের নিচে লোড-আন লোড করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ঝড় বৃষ্টিতে নষ্ট হয়ে পড়ছে আমদানি করা পণ্য। কর্মকর্তাদের নেই আবাসিক, রয়েছে বিদ্যুতের সমস্যার। ১৮টি পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা জারির পর এ বন্দর বন্ধের পথে। বন্দরকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের গড়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুখ থুবড়ে পড়েছে। একজ্য লোকসানের মুখে ব্যবসায়ীরা। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু করলেও বন্দর অচলের পথে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে তারা। বন্ধ রয়েছে ডৃপ্লস বোর্ড, নিউজ প্রিন্ট পেপার, ক্রাফ পেপার, সুতা কটন, জুস, মিল্ক পাউডার, টোব্যাকো, আলু পটেটো, রেডিও টিভি’র পার্স, ক্রাফস্ পার্স, ফোরমিকা শিট, ক্রামাইক ওয়ে, সেনেটারি ওয়ে, মারবেল স্লফসহ ১৮ পণ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে পাল্টে যাবে বুড়িমারী স্থলবন্দরের চিত্র।
বন্ধ পণ্যের উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও রাজস্ব প্রত্যাহার দাবি স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীদের। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে ফিরে আসবে বন্দরের চিত্র। সরকার পাবে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব।
তবে চীনের সাথে এ বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি চালু হলে পাল্টে যাবে চিত্র। বুড়িমারী দিয়ে ২শ’ থেকে আড়াইশ’ কিলোমিটার দূরত্ব চীন। এ বন্দর দিয়ে চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হলে ফিরে আসবে বন্দরের চিরাচরিত রূপ। উন্নত হবে লালমনিরহাট, রংপুর, নিলফামারীসহ গোটা উত্তরাঞ্চলের চিত্র। সমস্যা সমাধানের পত্র প্রেরণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাস্টমস্ এ কর্মকতারা। ওদিকে বুড়িমারী স্থলবন্দরে পণ্য পরিবহনে ট্রাকে পুলিশ ও শ্রমিককের বেপরোয়া চাঁদাবাজী ও মহাসড়কে ভাঙ্গাচুরা রাস্তার কারণে আমদানিকারকরা এ বন্দর থেকে ফিরিয়ে নিচ্ছে মুখ। লালমনিরহাট-বুড়িমারী ১ শত কিলোমিটার ভাঙ্গাচুরা মহাসড়ক পণ্যবোঝাই ট্রাকপথে বিকল হয়ে পড়ায় আটকা পড়ছে পণ্য বোঝাই ট্রাক এছাড়াও বন্দর থেকে গন্তব্যস্থলে আমদানি করা পণ্য ট্রাক বের হলেই পুলিশ, শ্রমিক ও রাজনৈাতিক দলের নেতাকর্মীদের বেপরোয়া চাঁদাবাজী প্রভাব পড়ছে পণ্যের উপর।
বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে প্রতিদিন ৩শ’ থেকে ৪শ’ পণ্য বোঝাই ট্রাক চলাচল করে। লালমনিরহাট থেকে বুড়িমারী ১ শত কিলোমিটার মহাসড়কে পণ্য বোঝাই ট্রাকপ্রতি সড়কে গুণতে হচ্ছে চাঁদার টাকা। ১শ’ কিলোমিটার মহাসড়কে প্রতি ট্রাকে চাঁদা দিতে হচ্ছে ১৫ স্থানে। শুধু বুড়িমারী থেকে পাটগ্রাম কলেজ মোড় ১০ কিলোমিটার অতিক্রম করতে ৮ স্থানে গুণতে হচ্ছে চাঁদার টাকা। এ চাঁদাবাজীর সাথে জড়িত পাটগ্রামের শ্রমিক সংগঠন, পুলিশ, রাজনৈতিক দল নেতারা। বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে পণ্যবোঝাই একটি ট্রাক গন্তব্যস্থলের উদ্দেশ্যে বের হলে প্রথমে ২শ’ টাকা দিতে হয় বন্দর শ্রমিকদের। চাঁদা দিতে হয় ৫০ টাকা বন্দর কাস্টমস্ গেইট পাসে। বুড়িমারী ট্রাক শাখায় প্রতিট্রাকে ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা। পাটগ্রাম মোড় ট্রাফিক পুলিশ ৫শ’ টাকা। পৌর ট্রাস্ট প্রতিট্রাকে ২০ টাকা। পাটগ্রামে বাইপাস মোড়ে ট্রাক শ্রমিক দালাল অফিসে ২শ’ টাকা, বড়খাতা মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ প্রতিট্রাকে ২শ’ টাকা, লালমনিরহাট মিশন মোড় সামনে পুরাতন বাস স্ট্যান্ড ৩শ’ টাকা, মোস্তফি সড়কে ২শ’ টাকা হিসেবে চাঁদা গুণতে হচ্ছে ট্রাকপ্রতি। লালমনিরহাট জেলা ছাড়াও ট্রাক ঢাকা পৌঁছাইতে অন্যান্য জেলায় গুণতে হচ্ছে চাঁদার টাকা। টাকা না দিলে ট্রাক-ড্রাইভারদের করা হয় নানান হয়রানিী এ অভিযোগ ট্রাক ড্রাইভারদের। ট্রাকে চাদাবাজীঁর কারণে আমদানি করা পণ্যের উপর পড়ছে প্রভাব। বেড়ে যাচ্ছে আমদানি করা পণ্যর মূল্য। বেপরোয়া চাঁদাবাজীর কারণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে আমদানিকারকরা। আমদানিকারকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে। ইতিমধ্যে অনেকে ব্যবসায়ী চলে গেছে অন্য বন্দরে। শুধু চাঁদাবাজীর কারণে নয় এছাড়াও রয়েছে লালমনিরহাট-বুড়িমারী ১শ’ কিলোমিটার ভাঙ্গাচুড়া মহাসড়ক।
বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে পণ্য বোঝাই ট্রাক আমদানি-রপ্তানি করার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্ব ১শ’ কিলোমিটার মহাসড়ক। এ সড়ক দিয়ে চলাচলের একমাত্র পথ। এ চলাচলের একমাত্র পথ মহাসড়কটি খানা খন্দরে ভরপুর। বুড়িমারী স্থলবন্দর থেকে পণ্য বোঝাই ট্রাক বের হলেই কখনো পথে হয়ে পড়ছে বিকল আবার কখনো হয়ে যাচ্ছে উল্টে। লোকসানে পড়ছে ব্যবসায়ীরা। সঠিক সময়ে গন্তব্যস্থলে পৌঁছাচ্ছে না পণ্য বোঝাই ট্রাক। পণ্য পরিবহনে লোকসানের কারণে ক্ষতির মুখে আমদানিকারকরা। পুলিশের বিরুদ্ধে পরিবহনে চাঁদাবাজীর অভিযোগ অস্বীকার করলেও শ্রমিক সেক্টরে ট্রাকে বেপরোয়া চাঁদাবাজীর ঘটনা স্বীকার করে লালমনিরহাট পুলিশ সুপার বলেন পরিবহনে চাঁদাবাজী বন্দে আবারো দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যবসায়ীদের দাবি পরিবহনে চাঁদাবাজী বন্ধ ও লালমনিরহাট-বুড়িমারী মহাসড়ক দ্রুত সংস্কার করলে এ বন্দরে জমে উঠবে ব্যবসা-বাণিজ্য সরকারের বাড়বে রাজস্ব। বুড়িমারী স্থলবন্দরের ব্যবসা-বাণিজ্য ঝিমিয়ে পড়ায় বেকার হয়ে পড়েছে বন্দরের ১০ হাজার শ্রমিক। কাজ না থাকায় শ্রমিকগুলোর সংসারে চলছে দুর্দিন। কষ্টে দিন কাটছে শ্রমিকদের। শ্রমিকদের দাবি বন্দরের ব্যবসা বাণিজ্যর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শ্রমিকরা গড়ে তুলবে বৃহত্তর আন্দোলন। লোড-আনলোড শ্রমিকদের কাজ না থাকায় অনেকে নানান অপরাধমূলক কাজের সাথে পড়ছে জড়িয়ে পড়ছে। তারা ব্যবসা-বাণিজ্য চালু সময়ে প্রতিদিন ৫শ’ ট্রাক থেকে ৭শ’ ট্রাক লোড-আনলোড করতো।
ব্যস্ত সময় কাটাতো বন্দরের শ্রমিকরা। কাজ করতো দিন-রাত। এখন নেই ব্যস্ত সময়। পুরো দমে বন্দর ব্যবসা-বাণিজ্য চালু থাকাকালীন সময়ে একেক জন শ্রমিক ৫শ’ টাকা থেকে ৭শ’ টাকা আয় করে চালাতো পরিবারগুলোর সংসার। এমনকি পরিবারের মহিলারাও কাজ করতো শ্রমিকের। বন্দরে কাজ করতো ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মহিলা কাজ করতো শ্রমিকের শ্রমিকদের দাবি বুড়িমারী স্থলবন্দর ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্ভবনাময় বন্দর।
আমদানিকারক ও সিএন্ডএফ মো. সায়েদুজ্জামান বলেন, ১৮টি পণ্যর উপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে সড়ক সংস্কার এবং চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু হলে পাল্টে যাবে এ বন্দরের চিত্র। বুড়িমারী স্থলবন্দরের কাস্টমস সহকারী কমিশনার মো. এনামুল হক বলেন, বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিভিন্ন সস্যার সমাধান ব্যাপারে উপর অবহতি করা হয়েছে। সমস্যাগুলো সমাধান হলেই বেড়ে যাবে এ বন্দরে ব্যবসা-বাণিজ্য।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ১৮টি পণ্যের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হলে পাল্টে যাবে বুড়িমারী বন্দর
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
গত​ ৭ দিনের সর্বাধিক পঠিত সংবাদ