Inqilab Logo

ঢাকা সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২০, ১০ কার্তিক ১৪২৭, ০৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২ হিজরী

কাশ্মীরে ফের সংঘর্ষে দুই মুক্তিকামি নিহত

বহুদিনের সংঘাত, বহুদিনের ক্ষত

ইনকিলাব ডেস্ক | প্রকাশের সময় : ৫ মার্চ, ২০১৯, ৬:১১ পিএম

ভারতের নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত অন্তত দুই মুক্তিকামি নিহত হয়েছে বলে দাবি ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর। সামরিক কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের বরাতে করা প্রতিবেদনে এই মুক্তিকামি নিহতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় ভোররাতে জেলার ত্রাল এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে মুক্তিকামিদের গোলাগুলির শুরু হয়। যা এখনো অব্যাহত আছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, নিহত দুই মুক্তিকামি হিজবুল মুজাহিদিনের সদস্য। তাদের কাছ থেকে ইতোমধ্যে প্রচুর সংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।
ভারতের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, গত সোমবার স্থানীয় সময় রাত ৮টায় পুলওয়ামা জেলার ত্রাল এলাকায় মুক্তিকামিদের লুকিয়ে থাকার খবর জানতে পারে বাহিনী সদস্যরা। পরে একইদিন মধ্য রাতে এলাকায় তল্লাশি অভিযান শুরু করা হয়।
অভিযান চলাকালে সম্পূর্ণ এলাকা ঘিরে ফেলার পর প্রতিটি বাড়িতে তল্লাশি শুরু করেন জওয়ানরা। তখন পালানোর রাস্তা নেই বুঝতে পেরে এলাকার একটি বাড়ি থেকে জওয়ানদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ শুরু করে মুক্তিকামিরা। এ সময় আত্ম-রক্ষার্থে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা গুলি চালাতে বাধ্য হন বাহিনীর সদস্যরা। এতে বেশ কিছুক্ষণ নিরাপত্তা বাহিনী ও মুক্তিকামিদের মধ্যে গোলাগুলির পর সেই দুই মুক্তিকামির মৃত্যু হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ঘটনার পরপরই গোটা ত্রাল শহর জুড়ে মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত তা বন্ধ রাখা হবে।’
উল্লেখ্য, মুক্তিকামিবিরোধী এই অভিযানটিতে অংশ নেয় ভারতের ৪২ নম্বর রাষ্ট্রীয় রাইফেলস, সিআরপিএফ ১৮০ নম্বর ব্যাটালিয়নের জওয়ানরা এবং জম্মু কাশ্মীর পুলিশের স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ।
কাশ্মীরে বহুদিনের সংঘাত, বহুদিনের ক্ষত: ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পাকিস্তান থেকে আগত উপজাতিক যোদ্ধারা কাশ্মীর আক্রমণ করে৷ তখন কাশ্মীরের মহারাজা ভারতের সাথে সংযোজনের চুক্তি করেন, যা থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়৷ ১৯৪৮ সালে ভারত জাতিসংঘে কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে পর, ৪৭ ক্রমিক সংখ্যক প্রস্তাবটি গৃহীত হয়৷ ঐ প্রস্তাব অনুযায়ী গোটা কাশ্মীরে গণভোট অনুষ্ঠিত হবার কথা রয়েছে৷ কিন্তু পাকিস্তান প্রস্তাব অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে সৈন্যাপসারণ করতে অস্বীকার করে৷ অতঃপর কাশ্মীরকে দু’ভাগে ভাগ করা হয়৷ ১৯৫১ সালে ভারতীয় কাশ্মীরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ও ভারতের সঙ্গে সংযোজনকে সমর্থন করা হয়৷ অতঃপর ভারত বলে, আর গণভোট অনুষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই৷ জাতিসংঘ ও পাকিস্তানের মতে, গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক৷ ১৯৫৩ সালে কাশ্মীরের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ গণভোটের সমর্থক ছিলেন ও ভারতের সঙ্গে সংযোজনকে বিলম্বিত করার চেষ্টা করেন৷ ফলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ জম্মু-কাশ্মীরের নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের সংযোজনকে পাকা করেন৷ ১৯৫৭ সালে ভারতের সংবিধানে জম্মু-কাশ্মীরকে ভারতের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়৷ ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীন আকসাই চীন দখল করে৷ তার আগের বছর পাকিস্তান কাশ্মীরের ট্রান্স কারাকোরাম ট্র্যাক্ট এলাকাটি চীনকে প্রদান করে৷ ১৯৬৫ সালে কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে আবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়৷ কিন্তু যুদ্ধশেষে উভয় দেশের সেনা তাদের পুরোনো অবস্থানে ফিরে যায়৷ ১৯৭১-৭২ সালে আবার ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়৷ যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর সিমলা চুক্তি সম্পাদিত হয় ১৯৭২ সালে৷ যুদ্ধবিরতি রেখাকে লাইন অফ কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ রেখায় পরিণত করা হয় ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ সমাধান সম্পর্কে ঐকমত্য অর্জিত হয়৷ ১৯৮৪ সালে ভারত সিয়াচেন হিমবাহ নিজ নিয়ন্ত্রণে আনার পর পাকিস্তান তা একাধিকবার দখল করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হতে পারেনি৷ ১৯৮৭ সালে জম্মু-কাশ্মীরে বিতর্কিত নির্বাচনের পর রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়৷ ১৯৯০ সালে গওকাদল সেতুর কাছে ভারতীয় সিআরপি রক্ষীবাহিনী কাশ্মীরি বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালালে পর শতাধিক আন্দোলনকারী নিহত হন৷ প্রায় সমস্ত হিন্দু কাশ্মীর উপত্যকা ছেড়ে চলে যান৷ জম্মু-কাশ্মীরে সেনাবাহিনীকে আফসা বা আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়৷ ১৯৯৯ সালে কাশ্মীর ভ্যালিতে গোটা নব্বই-এর দশক ধরে অশান্তি চলে৷ ১৯৯৯ সালে আবার ভারত-পাকিস্তানের লড়াই হয়, এবার কারগিলে৷ এরপরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলাপ-আলোচনার যাবতীয় প্রচেষ্টা প্রথমে নতুন দিল্লির সংসদ ভবন ও পরে মুম্বই হামলার ফলে ব্যর্থ হয়৷ ২০১০ সালে ভারতীয় সেনার গুলি লেগে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর পর কাশ্মীর ভ্যালি উত্তেজনায় ফেটে পড়ে৷ বিক্ষোভ চলে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে, প্রাণ হারান অন্তত ১০০ জন৷ ২০১৩ সালে সংসদ ভবনের উপর হামলার মুখ্য অপরাধী আফজল গুরুকে ফাঁসি দেওয়া হয়৷ এর পর যে বিক্ষোভ চলে, তা-তে দু’জন প্রাণ হারায়৷ এই বছরই ভারত আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীদ্বয় মিলিত হয়ে উত্তেজনা উপশমের কথা বলেন৷ ২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ উপস্থিত থাকেন৷ কিন্তু এর পর নতুন দিল্লিতে পাকিস্তানি হাই কমিশনার কাশ্মীরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় ভারত আলাপ-আলোচনা স্থগিত রাখে৷ ২০১৬ সালে আজাদ কাশ্মীর ভিত্তিক হিজবুল মুজাহিদীন-এর অধিনায়ক বুরহান ওয়ানি-র মৃত্যুর পর কাশ্মীরে স্বাধীনতা সমর্থকরা আবার পথে নেমেছেন৷ এই আন্দোলনে এ পর্যন্ত অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও বিক্ষোভ অব্যাহত আছে৷ ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জম্মু-কাশ্মীরের পুলওয়ামা সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স (সিআরপিএফ)-এর গাড়িবহরে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে৷ এতে ৪২ জওয়ান নিহত হন৷ বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন জৈশ-ই-মোহাম্মদ হামলার দায় স্বীকার করেছে৷ এরপর ২৬ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান সীমান্তের ভেতরে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় ভারতীয় বিমান বাহিনী৷

 



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: কাশ্মীর


আরও
আরও পড়ুন
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ