Inqilab Logo

ঢাকা, বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল ২০১৯, ১২ বৈশাখ ১৪২৬, ১৮ শাবান ১৪৪০ হিজরী।

যুদ্ধে কেউ জেতে না, এটা মনে রাখতে হবে ভারত ও পাকিস্তানকে

মোহাম্মদ আবু নোমান | প্রকাশের সময় : ৭ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

ভারতীয় পাইলট উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমান সারা ভারতের বীর হয়ে, বীরের সংবর্ধনা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। পাকিস্তানিদের কাছে ধরা পড়েও কাশ্মীরের শিশু-কিশোরদের হাতে মার খেয়ে, পাকিস্তানি মেজরের সাথে বসে আয়েশ করে চা পান করে চাক্ষুস দুনিয়ায় ভারতীয় বীর হলেন তিনি! ইতোপূর্বে এরকম ‘বীর’ ইন্ডিয়ান আর্মির বীরত্বেই(!) বাংলাদেশ বর্ডারে ফেলানির লাশ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিলো। পাকিস্তানে মিগ-২১ যুদ্ধবিমান নিয়ে হামলা চালাতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন অভিনন্দন। পাকিস্তান জেটের এয়ার টু এয়ার মিসাইল আঘাত করে অভিনন্দনের মিগে। এতে বিমান নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে রেডিও বার্তা দিয়েই ‘ইজেক্ট’ করে বিমানের ককপিট থেকে বাইরে চলে আসেন তিনি। অভিনন্দনকে নিয়ে প্যারাশুট ভেসে যায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের দিকে। তারপরই পাক সেনারা আটক করেন তাকে। এখানে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, তাদের নিজেদের অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে তৈরি মাল্টিরোল ফাইটার ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ দিয়েই পাল্টা প্রতিরোধ চালিয়ে ভারতীয় বিমান ভূপাতিত করা।
ভারত প্রথমত স্বীকারই করেনি তাদের বিমান বিধ্বস্ত হয়েছে, পাইলট নিখোঁজ রয়েছে। পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ও পাকিস্তানের দৈনিক ডন অনলাইনের ভিডিও প্রকাশ করায় ভারতের বড় বড় কথার বেলুন ফুস হয়ে যায়! ভিডিওতে ওই ব্যক্তি নিজের নাম অভিনন্দন ও বাড়ি দক্ষিণ ভারতে বলে উল্লেখ করেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘এখানে আমি সুচিকিৎসা পাচ্ছি...। ভারতেরও উচিত এমন পথ অনুসরণ করা।’ পাকিস্তানিদের সাথে আরাম-আয়েশ করে চা পানের দৃশ্য প্রকাশ না করলে ভারত বৈমানিক হারানোর কথা স্বীকার করতো কিনা বলা যায় না। শুধু তাই নয়, অভিনন্দন বর্তমানের বামা-মায়ের সাথে কথা বলেও পাকিস্তানি আর্মি আশ্বস্ত করেছেন, ‘আপনাদের ছেলে আমাদের জিম্মায় ভালো আছে এবং অতি শ্রীঘ্রই তাকে ভারতে ফেরত পাঠানো হবে।’ পাক প্রধানমন্ত্রীও ঘোষণা করেন, শান্তির পদক্ষেপ হিসেবে অভিনন্দনকে মুক্তি দিয়ে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হবে। এর আগে কার্গিল যুদ্ধের সময়ও আটক ভারতীয় পাইলট নচিকেতাকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল পাকিস্তান।
পাকিস্তান আক্রমণ করেছিলো দিনের আলোয়। আর ভারত রাতের আধারে কথিত জঙ্গি আস্তানা উড়িয়ে দিয়ে ৩০০ লাশ ফেলে দেয়ার খবর চাউর করে, যার কোন প্রমাণ সে বিশ্বমিডিয়াকে দেখাতে পারেনি। তাহলে কি ভারতীয় সেনাবাহিনী জঙ্গিদের লাশ সৎকার সেরে এসেছিলো, যা পাকিস্তান বা কাশ্মীরের কেউ টেরই পায়নি! খাইবার-পাখতুনওয়ারায় ভারতীয় হামলার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় বিমান ভূপাতিত হওয়ার পর পাকিস্তানিরাও যুদ্ধ-উন্মাদনায় ভালোভাবেই শরিক হয়েছে। করাচির রাজপথে মিষ্টি বিতরণের দৃশ্য খবরের কাগজের পাতায় এসেছে। তবে কোনো ধরনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা না করে পাক আর্মি পরিমিতি বোধের পরিচয় দিয়েছে। উপরন্তু, একজন পাইলটকে হাতে পাওয়ার পরও ইমরান খান নাটকীয়ভাবে ভারতের প্রতি সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বিশ্ব প্রচারমাধ্যমে কিছুটা সুবিধাজনক ইমেজ তৈরি করতে সক্ষম হন। এর সাথে হামলার জবাবে ভারতকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে ইমরান খান বলেন, আমরাও একই কাজ করতে পারি। ইলেকশনকে সামনে নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা থেকে যে লাভ মোদি করতে চেয়েছিল অভিনন্দন আটক তাতে ‘জল’ ঢেলে দিয়েছে। মোদী নির্বাচনকে সামনে রেখে নাটক করে সফল হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ইমরান খান মোদীর বানানো নাটকেই যে হিরো হয়ে যাবে, তা মোদী স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি।
পাকিস্তান ১৯৯০-এ তার দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘নিশান-ই-পাকিস্তান’-এ ভূষিত করেছিল ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইকে। পাকিস্তান এবং ভারতে কেউই হয়তো এ মুহূর্তে মনে করছে না, আপাতত দুই দেশের মধ্যে অতীতের সেই হৃদ্যতা আর ফিরে আসবে এবং কোনোরূপ সমঝোতা বা শান্তি আলোচনা সম্ভব! বিশেষ করে ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের যে প্রচন্ড ঢেউ বইছে, তাতে ভারতের কোনো রাজনীতিবিদের পক্ষে আর অদূর ভবিষ্যতে পাকিস্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের হাত প্রসারিত করার অবকাশ আছে কী? পুলওয়ামা ঘটনার পর আরএসএসের ছাত্রসংগঠন এবিভিপি হিংসাত্মক হয়ে উঠে। মেঘালয়ের রাজ্যপাল কাশ্মীরের সব পণ্য বর্জন ও কাশ্মীরের লোকদের যেখানেই পাওয়া যাবে, সেখানেই তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন। একটি রাজ্যের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থেকে এ ধরনের বক্তব্য দেওয়া কতখানি ধৃষ্টতা, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
পূর্বাপর ঘটনা বিশ্লেষণ না করেই যুদ্ধ উন্মাদনা উসকে দেয় ভারতীয় মিডিয়া। পুলওয়ামার ঘটনার পর থেকে সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া অধিকাংশ ভারতীয় প্রচারমাধ্যম বিশেষত মোদিপন্থী মিডিয়াগুলো পুরো দেশকে ধর্ম ও জাতিবাদী উত্তেজনায় মাতিয়ে তোলে। চলতি যুদ্ধাবস্থার দায় অনেকটা এসব প্রচারমাধ্যমের ওপরও বর্তায়, যার কথা স্বয়ং অভিনন্দনই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী খুবই পেশাদার।’ এ মন্তব্য করে ভারতীয় পাইলট আরও বলেন, ‘আমি দেখেছি, সেখানে শান্তি আছে। পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আমি সময় কাটিয়েছি এবং আমি খুব অভিভূত।’ তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভারতীয় গণমাধ্যম সব সময় সত্যকে এদিক-সেদিক করে প্রকাশ করে। খুব সামান্য বিষয়কেও তারা এমন উস্কানিমূলকভাবে উপস্থাপন করে, যাতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়।’ পুলওয়ামা হামলার জের ধরে সেভাবেই ক্ষমতাসীন দল বিজেপি সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তা নজিরবিহীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লাগাতার ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাশ্মীরের কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি না করার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে তারা। এতেই প্রমাণ হয়, মোদি পুলওয়ামার ঘটনা নিয়ে রাজনীতি করছেন। ভারতীয়দেরও এ মুহূর্তে এটা বুঝতে হবে, কাশ্মীরে আজাদির আন্দোলন চলছে প্রায় ৯০ বছর হলো। তাদের ৪৪ জন জওয়ান নিহত হওয়ার আগেও দশকের পর দশক ধরে সেখানে মানুষ মরছে। প্রায় ৭০ বছর ধরেই তো জঙ্গি মারা হচ্ছে, লাভ কি হয়েছে? ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে, যা করলে এই অঞ্চলে চিরস্থায়ী শান্তি আসে তাই করতে হবে। পাকিস্তানের বালাকোটের বনাঞ্চলে কোনো কল্পিত লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালালেই কাশ্মীরে শান্তি স্থাপিত হয়ে যাবে না। কেবল ২০১৮ সালে কাশ্মীরে প্রায় ৩০০ স্থানীয় গেরিলার পাশাপাশি ১৫০ জন ভারতীয় সৈনিকও মারা গেছে। আহত-নিহত বেসামরিক মানুষের সংখ্যাও অগণণ। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া এ ক্ষেত্রে গত দুই সপ্তাহজুড়ে ঠিক উল্টো ভূমিকায় ছিল। পুলওয়ামা আত্মঘাতী হামলাকে তারা সব অতীত পটভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করেই দেখাতে শুরু করে।
ভারতের উগ্রতা বিশেষত বিজেপির মুসলিম ও মুসলিম নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর নিয়ে বিজেপির উগ্রপন্থায় আজ এই উপমহাদেশের নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যা এই উপমহাদেশের মাথা ব্যাথার কারণ। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশলে এখনো পাকিস্তান এগিয়ে। পাকিস্তান যে ধীর-স্থিরতার পরিচয় দিয়েছে, ভারতকেও এই রকম পরিচয় দিয়ে শান্তির জন্য কাজ করে যেতে হবে। বরাবরই ভারত-পাকিস্তানের মুখোমুখি অবস্থানে উপমহাদেশে দীর্ঘমেয়াদী একটা অশান্তির ঢেউ জাগিয়ে যায়। হামলার প্রতিক্রিয়ায় ও পাল্টা আক্রমণে সার্জিক্যাল অ্যাটাক, এই বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার পথ ভারত ও পাকিস্তানকে খুঁজতে হবে। কাশ্মীর সমস্যা জিইয়ে রেখে কোনো পক্ষই লাভবান হতে পারবে না। কারণ, যুদ্ধ কোনো পিকনিক নয়। পৃথিবীর সব যুদ্ধই হচ্ছে ভুল হিসাবের ফল। যুদ্ধে কেউই জিতে না, জিতে শুধু অশান্তি ও সন্ত্রাসবাদ।
সুতরাং এই মুহূর্তে উভয় দেশের শান্তিপ্রিয় সচেতন জনগণের উচিত হবে, শান্তির পক্ষে সরব হওয়া। শতসহস্র কণ্ঠে আওয়াজ তোলা, যুদ্ধ নয়, শান্তি চাই। বিষয়টির রাস টানা সম্ভব না হলে গোটা দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা চাপের মধ্যে পড়তে পারে। উপমহাদেশ ভাগ হয়ে গঠিত ভারত ও পাকিস্তান কালক্রমে পরস্পরকে টার্গেট করেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছে। পারমাণবিক যুদ্ধকে যদি এ দুটি দেশের প্রত্যক্ষ করতে হয়, তাহলে তার ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা যেটা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে দেখা গেছে, তারও বহুগুণে ছাপিয়ে যাবে।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে মোদি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তার আমলে নতুন নতুন চাকরি সৃষ্টি হবে, ভারত সমৃদ্ধির শীর্ষে উঠবে। কিন্তু বর্তমান ভারতের পরিস্থিতি মোদির প্রতিশ্রুতির সম্পূর্ণ বিপরীত। সম্প্রতি জরিপে দেখা গেছে, বর্তমানে ভারতে বেকারত্বের হার ৬ দশমিক ১ শতাংশ। গত ৪৭ বছরের মধ্যে ভারতে এখন সবচেয়ে বেশি মানুষ বেকার। সম্প্রতি দেশটির বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হারও কমেছে। অসন্তোষ আছে ভারতের কৃষক সমাজের মধ্যে, দলিতরাও নিজেদের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার। ওদিকে সিবিআইয়ের সাবেক প্রধান অলোক ভার্মাকে জোর করে সরানো, নোট বাতিল নিয়ে ভোগান্তি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্ণরের পদত্যাগসহ মোদির অস্বস্তির তালিকা লিখতে গেলে বড় কিতাব হয়ে যাবে। এ হিসেবের পরও বিশ্বের সর্বাধিক হতদরিদ্র (প্রায় ১৮ কোটি, ২২% মানুষ দারিদ্রসীমার নীচে) অসহায় জনগণ কি মোদির নির্বাচনী স্ক্রিপ্টে থাকবে?
গত ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কাশ্মীরের পুলওয়ামা জেলায় ভারতের বিশেষায়িত নিরাপত্তা বাহিনী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) গাড়িবহরে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ৪৪ জওয়ান নিহত হন। এর জবাবে ১২টি যুদ্ধবিমান সীমান্ত অতিক্রম করে প্রায় ৬০ কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত ভূমিতে বোমা ফেলা মাত্রই ভারতজুড়ে একরূপ তৃপ্তি ও স্বস্তি নেমে আসে। বিজেপিকে মনে রাখতে হবে, তারা ক্ষমতায় আসার আগে কাশ্মীর তুলনামূলকভাবে অনেক শান্ত ছিল। ২০১৬ সালে কাশ্মীরে বিক্ষুব্ধ জনতার ওপর বন্দুকের প্যালেট ছুড়ে বহু তরুণকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেই ক্ষোভকে তারা কাজে লাগাবে, তাতে সন্দেহ নেই। আর তাতে ব্যবহার করা হচ্ছে আদিলের মতো অল্প বয়সী তরুণদের, যাদের মধ্যে ক্ষোভ আছে কিন্তু রাজনৈতিক জ্ঞান নেই। যে বালকটি এবার কাশ্মীরের পুলওয়ামায় আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছে, তাকে এক সময় ভারতীয় বাহিনীরা ধরে নিয়ে নির্যাতন করেছিল। তাই জেদের বশে সে এ কাজ করবে, এটাই স্বাভাবিক। সবকিছুরই একটা কার্যকারণ থাকে। কেন আদিলরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে সেটাই পৃথিবীকে বুঝতে হবে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভারত


আরও
আরও পড়ুন