Inqilab Logo

ঢাকা, রোববার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭ আশ্বিন ১৪২৬, ২২ মুহাররম ১৪৪১ হিজরী

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাকে জাতীয় নীতিমালার অন্তর্ভুক্ত করতে হবে

| প্রকাশের সময় : ৭ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৪ এএম

সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নে গুরুত্ব কমিয়ে রেলপথ উন্নয়নে নজর দেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। গত মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির(একনেক) বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নির্দেশনা দেন। গত ১০ বছরে দেশের সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নে প্রচুর কাজ হয়েছে যা’ পর্যাপ্ত বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এবং নির্মীয়মান পায়রা সমুদ্রবন্দরসহ অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোতে উচ্চগতির রেলব্যবস্থা গড়ে তোলা হলে তা দেশের পরিবহন ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে বলে প্রধানমন্ত্রী যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তা খুবই সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। মূলত ইনকিলাব দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অবহেলিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত রেলপথ বিভাগের সামগ্রিক উন্নয়নে নজর দেয়ার কথা বলে আসছে। সেই সাথে সড়ক-মহাসড়ক উন্নয়নে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়, মাননিয়ন্ত্রণ তথা দুর্নীতি বন্ধের কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দিয়ে আসছে, যদিও এ ক্ষেত্রে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। সড়ক-মহাসড়ক নির্মান, উন্নয়ন ও রক্ষনাবেক্ষণে অস্বাভাবিক ব্যয়ভার বহন করার পরও এসব সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনা, প্রাণহানি, বিশৃঙ্খলা, চাঁদাবাজি ও জনদুর্ভোগ কমানোর কোনো প্রয়াসই সফল হয়নি। পক্ষান্তরে রেলপথের নেটওয়ার্ক বহু পুরনো হলেও পরিবর্তিত বাস্তবতায় রেলের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন, আধুনিকায়ন ও রক্ষনাবেক্ষণের অভাবে এর সামাজিক-অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অধরাই রয়ে গেছে। অথচ শিল্পোন্নত দেশগুলো তো বটেই, প্রতিবেশী ভারত ও চীনের মত দ্রুত অগ্রসরমান অর্থনীতির দেশ তাদের বাণিজ্য ও গণপরিবহণের লক্ষ্য অর্জনে রেলের উপর যে ভাবে গুরুত্ব দিয়েছে তা থেকে বাংলাদেশের শিক্ষনীয় আছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ভারত ও চীনের চেয়েও এখানে রেলপথ অধিক গুরুত্ব পাওয়ার দাবী রাখে।
গত দু’তিন দশকে একদিকে দেশের যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন খাত একচেটিয়াভাবেই সড়ক-মহাসড়ক নির্মান, উন্নয়ন ও সড়ক পরিবহন খাতের উপর কেন্দ্রীভ’ত ছিল। এক সময় দেখা গেল, বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়ে বাংলাদেশে সড়ক-মহাসড়ক ও সেতু নির্মান করা হয়। বিশ্ববাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চারলেনের সড়ক নির্মানে যেখানে ভারতে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয় ১১ থেকে ১৩ লাখ ডলার, চীনে ব্যয় হয় ১৩ থেকে ১৬ লাখ ডলার, সেখানে বাংলাদেশে ব্যয় হয় ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ ডলার পর্যন্ত। এমনকি ইউরোপ আমেরিকায়ও সড়ক নির্মানের ব্যয় বাংলাদেশের অর্ধেকের কম। বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যয়ে সর্বনিম্ন মানের রাস্তা ও অবকাঠামো নির্মিত হয় বাংলাদেশে। এর মানে হচ্ছে, সড়ক-মহাসড়ক ও যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মানের নামে সংশ্লিষ্ট দফতর ও বিভাগের কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও ইঞ্জিনিয়ারদের সমন্বিত লুণ্ঠনের ধারা অব্যহত রয়েছে। একদিকে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, উন্নয়ন, রক্ষণাবেক্ষনে অস্বাভাবিক উচ্চব্যয়, অন্যদিকে গণপরিবহণ আমদানী থেকে শুরু করে লাইসেন্সিং, রুটপারমিট, ভাড়া আদায়সহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় বছরে শত শত কোটি টাকার চাঁদাবাজি, ঘুষ-দুর্নীতি, অপচয় ও লুটপাটের যে মহোৎসব চলছে, রেলের উন্নয়নের ফলে সে ক্ষেত্রে লুটপাট, অনিয়ম ও জনদুর্ভোগ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। বিশেষত রাজধানী ঢাকার সাথে আশপাশের জেলা ও শহরগুলোর সাথে হাইস্পীড মেট্টোরেলসহ একটি সমন্বিত রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এমনকি দেশের সবগুলো বিভাগীয় শহর এবং জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় জনপদগুলোকে রেল ও নৌযোগাযোগের একটি সমন্বিত নেটওয়ার্কে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিতে হবে।
রেলের উপর নজর দেয়ার পাশাপাশি গণপরিবহণে একটি জাতীয় গ্রিড গড়ে তোলার কথা ভাবছে সরকার। অনেক দেরিতে হলেও এ উদ্যোগ ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক। সড়ক-মহাসড়ক নির্মানে অধিক গুরুত্ব দিয়ে জনগণের রাজস্ব থেকে ইতিমধ্যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। সেই সাথে এ খাতে হাজার হাজার একর অতি মূল্যবান আবাদী জমি অনাবাদি খাতে চলে গেছে। পক্ষান্তরে রেলের প্রতি অবহেলা ও দায়িত্বহীনতার কারণে সারাদেশে রেলের হাজার হাজার একর জমি প্রভাবশালীদের দ্বারা বেদখল বা বেহাত হয়ে গেছে। এখন রেলপথের উপর বাড়তি নজর বা রেলের যুগোপযোগী উন্নয়নের ক্ষেত্রে প্রথমেই রেলের বেহাত হওয়া জমি উদ্ধারের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। গণপরিবহণে কথিত জাতীয় গ্রিড গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সড়ক, রেল ও নৌপথের সমন্বিত উন্নয়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীবহুল বাংলাদেশে এক সময় নৌপথই ছিল সবচেয়ে কার্যকর ও সুলভ। উজানে ভারতের বাঁধ নির্মান ও পানি প্রত্যাহার এবং দেশে নদনদীগুলো উপর অবাধ দখলদারিত্ব, ভরাট ও দূষণের কবলে পড়ে গত চার দশকে হাজার হাজার কিলোমিটার নৌপথ বিলীন হয়ে গেছে। এখন গণপরিবহণের জাতীয় গ্রিড তথা সমন্বিত গণপরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে হাজার হাজার কিলোমিটার নৌপথের নাব্য ফিরিয়ে আনতে যথাশীঘ্র ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। রেলের উন্নয়ন এবং গণপরিবহণে জাতীয় গ্রিড গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা যেন শুধু কথার কথা বা প্রস্তাবনার মধ্যেই থেমে না থাকে। এই নির্দেশন জাতীয় নীতিমালাকে অন্তর্ভুক্ত করুক।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: প্রধানমন্ত্রী

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

আরও
আরও পড়ুন