Inqilab Logo

ঢাকা, মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০১৯, ১১ আষাঢ় ১৪২৬, ২১ শাওয়াল ১৪৪০ হিজরী।

ভাসা ভাসা ভালোবাসা

অ য়ে জু ল হ ক | প্রকাশের সময় : ৮ মার্চ, ২০১৯, ১২:০৯ এএম

বহুদিন পর যখন স্বপ্নের ঘোরে রাতুল কে দেখে লাফ দিয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে শিরিন। সাথে সাথেই আবিরের ঝাঝালো কন্ঠ, ব্যাঙের মতো লাফ দিয়ে উঠে বসলে যে! কী হয়েছে? 

- না, কিছু হয়নি।
- কিছু হয়নি তো লাফ দিয়ে ওঠার মানে কী!
- আসলে.....
- হ্যাঁ, কী আসলে!
শিরিন তো তো করতে করতে বলে, তোমাকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখলাম। এবার আবির লাফ দিয়ে ওঠে। চোখমুখ বড় করে বলে কী দেখলে! দুঃস্বপ্ন?
- দেখলাম কারা যেন তোমাকে আচ্ছা মতো পেটাচ্ছে।
- তারপর!
- এম্বুলেন্স আসতেই ঘুম ভেঙে গেল।
আবির ধড়ফড় করে বিছানা ছেড়ে লাইট জ্বালায়। কাপা গলায় শিরিন কে বলে, একটু পানি দাও। গলা শুকিয়ে আসছে।শিরিন নামতে নামতে ভাবে, অল্পতে থেকে বাচা গেল। সান্ত্বনা দেয়,‘ স্বপ্ন তো স্বপ্নই। রাতুল কী আর আসছে... ’
শিরিনের কথা শুনে আবির এক ঢোক পানি খেয়েই থেমে যায় ‹ রাতুল মানে! তোমার সেই সাবেক প্রেমিক? ‹
শিরিন কেপে ওঠে।বলতে বলতে কী বলে ফেললো! নিজেকে স্বাভাবিক করে বলে, সে কী আর আছে! কবেই তো মরে গেছে।
- রাতুল মরে গেছে! খুশি হবার বদলে আঁতকে ওঠে আবির।
- হ্যাঁ, সে কবেই।
- ইস ছেলেটা মরে গেল! চলে গেল। আক্ষেপ নিয়েই বিছানায় আসে। ইস মরে গেল।
- বাদ দাও।
আবির বাদ দেয়না সেই স্বপ্ন প্রসঙ্গ তোলে, দেখলে রাতুল আমাকে পেটাচ্ছে?
- হু। আরও অনেক মানুষ।
- তারপর?
- ওই যে এম্বুলেন্স.....
- অন্যকিছু দেখতে পারলে না?
- কী করবো বলো। স্বপ্ন তো আর আমার কথা শোনে না। শিরিনের কথা শেষ না হতেই আবিরের নাক ডাকা শুরু। ইদানিং মানুষের নাক ডাকার পরিমাণ বেড়ে গেছে। ছোট ছোট বাচ্চা পর্যন্ত নাক ডাকে। আবির তো চলি­শ ছোয়া পুরুষ। সারারাত রাতুল চোখের সামনে ভাসে। ঘুম আসেনা। এতোদিন পর কেন আসলো ছেলেটা! পরদিন বান্ধবী পুষ্পকে ফোন করে রাতুলের নাম্বার নেয়। পুস্প মজা করে বলে, কিরে বছর না গড়াতে স্বামী -স্ত্রীর ভালোবাসায় ফাটল?
- না।
- তো?
- তো আর কী ভাসা ভাসা ভালোবাসায় ভাসাচ্ছি। চলছি।
রাতুল কে ফোন দিতেই সেই পুরানো গলাটা ভেসে ওঠে। ‘ আমি জানতাম তুমি যেমন জীবনে আমাকে ভুলতে পারবে না, আমিও পারবো না ’
শিরিন অনেকক্ষন চুপ থাকে। আশেপাশে কতো গুলো কুকুর ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে। ‘রাতুল।’ - হ্যাঁ।
- একটা ভুল বুঝাবুঝি আমাদের সব স্বপ্ন শেষ করে দিতে পারেনা।
- অনেক কথা। চলো একদিন ঘুরতে যাই।
- কোথায়?
- কোন এক নিরিবিলি পরিবেশে।
- আচ্ছা।
দুদিন বাদে খুব আদর যন্তে স্বামীকে অফিসে পাঠাতে ব্যস্ত শিরিন। সাধারণত এমন হয় না। যাওয়ার সময় কিছু একটা দিতে বললে যে খ্যাক করে ওঠে। আজ সেই মেয়েটা নিজ গরজে সব এগিয়ে দিচ্ছে। অফিসে এসে কাজে মন বসাতে পারেনা। শরীরের ভেতর কেমন একটা ম্যাজমেজে ভাব। দুপুরের দিকে সহকর্মী জুলমত কে বলে, আমি বেরোচ্ছি। আপনি একটু সামলে নেবেন।
- কী হয়েছে?
জুলমতের প্রশ্নে আবিরের রাগ হয়। রাগ চেপে বলে, কিছু হয়নি।
- তাহলে!
- খুশিতে, ঠেলায় আনন্দে ঘোরতে যাই। রাস্তায় বেরিয়ে সি.এন.জি দেখে দাড় করায়। যাবি?
- কোথায় যাবেন?
- আশেপাশে দেখার মতো ভালো যে কোন জায়গা।
ড্রাইভার সোৎসাহে বলে, উঠে পড়েন। দুইশো টাকার ভাড়ায় যেখানে নামিয়ে দেয় সেটা একটা রিসোর্ট। গেটে বড় করে লেখা- বাংলা রিসোর্ট এন্ড পিকনিক কর্নার। পরিবেশ সুন্দর। সমস্যা - বাংলা ইংলিশ মিলিয়ে একেবারে ছ্যাড়াব্যাড়া করে ফেলেছে। রিসোর্টে পিকনিক করতে এসেছে বহুগ্রুপ। গাছের নিচে, বিভিন্ন কর্নারে জোড়া জোড়া মানুষ। আবির ঘুরতে থাকে। ঘুরতে ঘুরতে থমকে দাঁড়ায়। একেবারে রাতুলের মতো দেখতে একজন। মোবাইলে কথা বলছে। আবির দ্রুত পায়ে হেটে একেবারে লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। অবাক বিস্ময় নিয়ে প্রশ্ন করে,কে আপনি? রাতুল চোখ মেলে আবির কে দেখে। ওর বউকে এখানে আসতে নিষেধ করা খুব জরুরী। পার্কে একঝাঁক মানুষ। বড় কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।
- আমাকে চিনতে পারছেন না?
- না।
- আমি রাতুল।
- কোন রাতুল?
- কেন আপনার শ্বশুর বাড়ির পাশের গ্রামের রাতুল। আবির ভয়ার্ত চোখে রাতুলের দিকে তাকায়। তাকিয়ে থাকে।
- আপনি ভয় পাচ্ছেন মনে হয়?
- পুরানো লাশ দেখলে তো ভয় পাওয়ার ই কথা। আর সে যদি জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে দাঁড়ায়! সেদিন স্বপ্নে আজ বাস্তবে....
- কী যা তা বলছেন! কে লাশ? কিসের লাশ!
- তুমি, বহু আগেই মরে গেছো। মরে গেছ, কিন্তু পিছু ছাড়ছ না।
রাতুল উত্তেজিত হয়ে ওঠে। তাকে বলছে লাশ! বহুদিন আগের পুরাতন লাশ!
- দেখুন আর একটা বাজে কথা বলবেন না। আপনাকে উল্টো লাশ বানিয়ে ছাড়বো।
- সেটাও জানি। তারপর এম্বুলেন্স আসবে। কথা শেষ করেই আবির ধডাম করে পড়ে যায়। পার্কের লোকজন দৌড়ে আসে। তার আগে রাতুল দৌড়ে পালায়। পার্কের কাছাকাছি এসে শিরিন রাতুল কে ফোন দেয়। হঠাৎ করে ফোন টা বন্ধ হয়ে গেল। এক বার, অনেকবার। নাহ ফোন টা বন্ধ। মানে কি! অজানা আশংকায় বুকটা কেপে ওঠে। রাতুলের কোন বিপদ হলো না তো? জটলা দেখে এগিয়ে যায় শিরিন। রাজিন কে পড়ে থাকতে দেখে চিৎকার করে, এই আমার স্বামীর কী হয়েছে? কেউ শব্দ করেনা, জানেনা। শিরিন বসে পড়ে। আবিরের মুখের কাছে মুখ নিয়ে ভাসা ভাসা কান্নার সুর তোলে, আবির আই লাভ ইউ। প্লিজ চোখ খোল। ওপেন ইউর আই। সামাঝতে হ্যায় কি ম্যায় তুমসে কিতনা পেয়ার কারতি হু। আবির চোখ খোলে। পিটপিটিয়ে তাকায়। বিড়বিড় করে বলে, স্বাধীনতার মাসে বাংলা ভালোবাসি। দেশ ভালোবাসি। মানুষ ভালোবাসি। তুমি এখানে কি মনে করে কিভাবে আসলে গো! সব কেমন ভাসা ভাসা লাগছে।



 

দৈনিক ইনকিলাব সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো বক্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো। কর্তৃপক্ষ যেকোনো ধরণের আপত্তিকর মন্তব্য মডারেশনের ক্ষমতা রাখেন।

ঘটনাপ্রবাহ: ভালোবাসা


আরও
আরও পড়ুন